Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ

এসএসসি-’২৬ এর ফল বিপর্যয়ের আসল কারণ কি? শুধুই শিক্ষকের ব্যর্থতা?

এসএসসি-’২৬ এর ফল বিপর্যয়ের আসল কারণ কি? শুধুই শিক্ষকের ব্যর্থতা?

 

মনিরুল হক,

     এবারের এসএসসি ফলাফল প্রকাশের পর থেকে একটা প্রশ্ন সবার মুখে মুখে ঘুরছেঃ কেন এত খারাপ ফল হলো? পরিসংখ্যান বলছে, এবার পাসের হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরও যেখানে পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ, সেখানে এবার প্রায় ছয় শতাংশ পয়েন্ট কমে যাওয়াটা নিছক কাকতালীয় কিছু নয়। স্বাভাবিকভাবেই এই ফলাফল প্রকাশের পর সবচেয়ে সহজ কাজটাই সবাই করছেন, দায় চাপাচ্ছেন শিক্ষক আর প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে।

 

আমি নিজে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি, প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে ঢুকি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের খাতা দেখি। তাই এই আলোচনায় দাঁড়িয়ে সৎভাবেই বলতে চাই, এই ফল বিপর্যয়ের পুরো দায়টা শুধু আমাদের শিক্ষক সমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা সহজ সমাধান, কিন্তু পুরোপুরি সত্যি নয়।

 

গত দুই বছরে আমি নিজের চোখে একটা পরিবর্তন দেখেছি, যেটা নিয়ে খুব বেশি কেউ কথা বলছেন না। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই গণআন্দোলনের পর থেকে, যে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল, শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় একটা লক্ষণীয় বদল এসেছে। যদিও এই আন্দোলনে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে আমাদের দেশ ও জাতির জন্য তথাপি কিছু শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রাসী মানসিকতা পরিলক্ষিত হয় যা শ্রেণিকক্ষ ও প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি বগুড়াতে প্রধান শিক্ষককে রুমে আটকে রেখে উনার মটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা সামান্য শাসন করার জন্য/  এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, কোনো গবেষণার সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন যা দেখি, তাতে এই বদলটা উপেক্ষা করার উপায় নেই।

 

আগে যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কথা মোটামুটি মেনে নিত, এখন সেই জায়গা থেকে তারা অনেকটাই সরে এসেছে। শিক্ষককে যে সম্মানটুকু আগে স্বাভাবিকভাবেই দেওয়া হতো, তা এখন অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ক্লাসে মনোযোগ কমেছে, অনেকের আচরণে একধরনের আগ্রাসী ভাব লক্ষ্য করা যায়। বাড়ির কাজ দিলে তা করে না, ক্লাসে পড়া ধরলে পড়া পারে না, আর পড়া না পারার জন্য কোনো জবাবদিহিতাও যেন আর কার্যকর নয়। শাসন বলতে যে জিনিসটা এক সময় কাজ করত, তার প্রভাব এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

 

এটা শুধু শহরের বড় স্কুলের চিত্র নয়। আমি নিজে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে কাজ করি, আর সেখানেও একই ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ে। দুই তিন বছর আগেও এই বয়সী শিক্ষার্থীরা আমরা যা বলতাম মোটামুটি তাই শুনত। এখন কেন জানি তারা শুনতে চায় না। এই “কেন জানি না শোনা” আসলে একটা বড় সংকেত, যেটা আমরা এখনো ঠিকভাবে পড়তে পারছি না।


তবে এখানে থেমে গেলে অর্ধেক কথা বলা হবে। এই মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে আমরা শিক্ষকরাও ঠিকমতো তাল মেলাতে পারিনি, এটাও সত্যি। যে শিক্ষার্থী আগের মতো নেই, তার সঙ্গে পুরনো পদ্ধতিতেই ক্লাস চালিয়ে যাওয়াটা কাজ করবে না। তাদের বদলে যাওয়া মানসিকতাকে মেনে নিয়ে, সেই বাস্তবতার মধ্যে থেকেই তাদের সঙ্গী করে শেখানোর যে কাজ, সেখানে আমরা অনেক শিক্ষকই পিছিয়ে আছি। ফলে শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, আর সেই দূরত্বও এই ফল বিপর্যয়ের একটা বড় কারণ।


এখন প্রশ্ন হলো, সমাধান কী? সহজ একটা পথ আছে, পাসের হার বাড়িয়ে দেওয়া, খাতা একটু উদারভাবে দেখা, ফলাফলটাকে কাগজে কলমে ভালো দেখানো। কিন্তু তাতে সমস্যাটা মিটবে না, বরং প্রতি বছর একই সংকট নতুন করে ফিরে আসবে। আসল কাজটা হলো, শিক্ষার্থীদের এই বদলে যাওয়া মানসিকতাকে বোঝা, আর সেই বোঝাপড়া থেকে শ্রেণিকক্ষে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এমন কিছু উদ্যোগ দরকার যা শুধু পড়াশোনার চাপ বাড়ায় না, বরং শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকের সেই হারিয়ে যাওয়া আস্থার জায়গাটা আবার তৈরি করে।


এই লেখাটা কোনো গবেষণাপত্র নয়, একজন সাধারণ শিক্ষকের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ খুঁজতে গেলে সংখ্যার বাইরেও শ্রেণিকক্ষের এই বদলে যাওয়া বাস্তবতাটা আমাদের দেখতে হবে। নইলে আগামী বছরও আমরা একই প্রশ্ন নিয়ে বসব, কেন এত খারাপ ফল হলো, অথচ উত্তরটা হয়তো আমাদের চোখের সামনেই ছিল।


এই সংকট থেকে উত্তরণ একদিনে হবে না, আর কোনো একটা একক পদক্ষেপে হবে না। তবে কয়েকটা স্তরে ভাগ করে দেখলে পথটা পরিষ্কার হয়। যেমনটা নিন্মে আলোচনা করা হলো।


শ্রেণিকক্ষ পর্যায়েঃ

১. আগে সম্পর্ক, তারপর শাসন। শিক্ষার্থী যখন অনুভব করে শিক্ষক তাকে বোঝার চেষ্টা করছেন, তখনই শাসন কার্যকর হয়। শুধু নিয়ম চাপিয়ে দিলে উল্টো প্রতিরোধ বাড়ে।

২. মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে অংশগ্রহণমূলক পাঠদান। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যতটা সম্ভব কম পড়ে পরীক্ষায় বসার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা ভাঙতে হলে আলোচনাভিত্তিক ও প্রয়োগভিত্তিক পাঠদান দরকার, যেখানে শিক্ষার্থী কেবল শোনে না, নিজে চিন্তা করতে বাধ্য হয়।

৩. ধারাবাহিক মূল্যায়ন, একবারের পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমানো। ছোট ছোট নিয়মিত মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে সারা বছর সম্পৃক্ত রাখে, শেষ মুহূর্তের চাপ আর মুখস্থবিদ্যা দুটোই কমায়।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েঃ

৪. অভিভাবক সংযোগ জোরদার করা। শুধু রেজাল্ট খারাপ হলে অভিভাবককে ডাকা নয়, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, যাতে বাড়ি আর স্কুলের প্রত্যাশা একই দিকে থাকে।

৫. কাউন্সেলিং বা গাইডেন্স সাপোর্ট। বড় সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেক সময় শোনার মতো একজন মানুষ দরকার হয়, যিনি শাসক নন। প্রতিষ্ঠানে এই জায়গাটা তৈরি করা গেলে আগ্রাসী আচরণের পেছনের কারণও বোঝা সহজ হয়।

৬. সহশিক্ষা কার্যক্রম আর নেতৃত্বের সুযোগ। ক্লাব, বিতর্ক, প্রজেক্টভিত্তিক কাজ, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মতো জায়গায় শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দিলে তাদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি হয়, যা শুধু নিয়ম মানার চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।

৭. শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ। বদলে যাওয়া শিক্ষার্থী মানসিকতা নিয়ে কাজ করার মতো প্রশিক্ষণ এখন অনেক শিক্ষকেরই নেই। এই জায়গায় বিনিয়োগ ছাড়া শুধু আন্তরিকতা দিয়ে সমস্যাটা সামলানো কঠিন।

দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়েঃ

৮. মূল বিষয়গুলোতে ভিত মজবুত করা। ইংরেজি আর গণিতে দুর্বলতা এবারের ফল বিপর্যয়ের একটা বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। এই দুর্বলতা এসএসসিতে এসে ধরা পড়লে অনেক দেরি হয়ে যায়, তাই মাধ্যমিকের শুরু থেকেই এই বিষয়গুলোতে বাড়তি নজর দরকার।

৯. মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে সৎ আলোচনা। খাতা উদারভাবে দেখে পাসের হার বাড়ানো সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু আসল সমস্যা ঢেকে রাখে। ফলাফলকে বাস্তবসম্মত রেখেই শিক্ষার মান নিয়ে খোলামেলা কথা বলাটা কঠিন, তবু জরুরি।

মূল সুরটা একটাই। শাসন দিয়ে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটা আরও শাসন দিয়ে কমবে না। সম্পর্ক, ধৈর্য আর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা দিয়েই এই উত্তরণ সম্ভব।

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া।

০১৭২২ ২৭৩২৭২

[email protected]

 

মন্তব্য করুন