সহকারী শিক্ষক
২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
স্বাভাবিক পাঠদান ও দাপ্তরিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও পাবনার অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়া। জেলার মোট ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬১৬টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা বিদ্যালয় পরিচালনায় জটিলতার পাশাপাশি সাধারণ পাঠদান কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এদিকে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় জেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। গত ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এসব নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫২২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। বাকি ৬১৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে সাঁথিয়া, সুজানগর, চাটমোহর ও বেড়া উপজেলায়। সাঁথিয়ার ১৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৪টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ। সুজানগরের ১৪৫টির মধ্যে ৫২টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য ৯৩টি। চাটমোহরের ১৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য ৯০টি। আর বেড়ার ১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য রয়েছে ৭৪টি।
এছাড়া পাবনা সদরের ১৮৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৪টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন, শূন্য রয়েছে ৭১টি পদ। ভাঙ্গুড়ার ৯৯টির মধ্যে ৪৫টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য ৫৪টি। ঈশ্বরদীর ১০০টির মধ্যে ৫১টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য ৪৯টি। ফরিদপুরের ৮৪টির মধ্যে ৩৬টিতে আছেন, শূন্য ৪৮টি। আর আটঘরিয়ার ৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, শূন্য রয়েছে ৪১টি পদ।
জেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের জ্যেষ্ঠ দাবি করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দাবিতে মামলা করেছেন। এসব মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে আছে বলে জানান তারা। তবে যেসব জেলায় এ ধরনের মামলা নেই, সেসব এলাকায় শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষকরা জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে অন্য সহকর্মীরা তা সহজভাবে নেন না। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। দাপ্তরিক কাজেও নানা জটিলতা দেখা দেয়। প্রধান শিক্ষক না থাকায় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। প্রধান শিক্ষক ছাড়া লিডারশিপ ট্রেনিংও দেওয়া হয় না। যার জন্য প্রশাসনিক কাজ স্থবির হয়েছে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি, দুই বছর আগে বিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য বছরে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হলেও গত দুই বছর ধরে অনেক ক্ষেত্রে তা কমে ১৫ হাজার টাকায় নেমেছে। এতে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আনুষাঙ্গিক খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাবনা সদরের দাশপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতিয়ার হোসেন বলেন, একটা বিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন প্রধান শিক্ষক। বাড়ির যদি অভিভাবকই না থাকেন তাহলে ওই বাড়িটির কি অবস্থা হবে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার কোন পরিবেশই থাকে না। যারযার মত সে সে খেয়ালখুশি মত পাঠদান করে দায়সারাভাবে কাজ করে চলে যায়। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদন্নোতি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। এই গ্রামের নাম দাশপাড়া হলেও বিদ্যালয়ের নাম দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে। এই জটিলতা ঠিক করতে প্রধান শিক্ষক ছাড়া সম্ভব নয়। নাম সংশোধনের কাজ করতেও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
পাবনা জেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। বর্তমান বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিষয়টি অনেকটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি।
১৩
১৮ মন্তব্য