Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:৫৪ অপরাহ্ণ

সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬ সংশোধিত বিধিমালা

মানুষের জীবনের একটি অবধারিত সত্য হলো বার্ধক্য। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় শারীরিক শক্তির পাশাপাশি আর্থিক সচ্ছলতাও অনেক সময় কমে যায়। প্রবীণ বয়সে দেশের নাগরিকদের একটি টেকসই এবং সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী-এর আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার চালু করেছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বা ইউনিভার্সাল পেনশন স্কিম। এটি এমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা দেশের সকল স্তরের মানুষের শেষ জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

আপনি যদি নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তবে এখনই সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সরকারের এই চমৎকার উদ্যোগের বিস্তারিত নিয়মকানুন, আইনি দিক এবং আপনার জন্য প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে 

সর্বজনীন পেনশন বিধিমালা পিডিএফ-এখানে ক্লিক করুন

এ ক্লিক করে আজই সম্পূর্ণ গাইডলাইনটি পড়ে নিন। আপনার একটি মাত্র ক্লিক এবং সঠিক তথ্য জানা আপনার ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে সেরা বিনিয়োগ হতে পারে!


































































































































































































































































































সর্বজনীন পেনশন স্কিম কী?

সর্বজনীন পেনশন স্কিম হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যেখানে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী (বা তদূর্ধ্ব) যেকোনো নাগরিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক চাঁদা জমা দিয়ে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

এই স্কিমটি সফলভাবে পরিচালনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ-এর অধীনে গঠন করা হয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। মূলত, দেশের আপামর জনসাধারণকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে তাদের জমানো অর্থ সুষ্ঠুভাবে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পেনশন ম্যানেজমেন্ট

পেনশনের যোগ্যতা ও সাধারণ শর্তাবলী

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্তাবলি রয়েছে, যা প্রত্যেক আবেদনকারীকে পূরণ করতে হবে:

  • বয়সসীমা: আবেদনকারীর বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হবে। তবে বিশেষ বিবেচনায় ৫০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকরাও এতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, সেক্ষেত্রে তাদের একটানা ১০ বছর চাঁদা প্রদান করতে হবে।

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): এই স্কিমে পেনশন নিবন্ধন করার জন্য আবেদনকারীর অবশ্যই একটি বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের মাধ্যমেও নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

  • আজীবন পেনশন: একজন চাঁদাদাতা ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, অর্থাৎ আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন।

  • ন্যূনতম চাঁদা প্রদানের মেয়াদ: পেনশন সুবিধা পাওয়ার জন্য চাঁদাদাতাকে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা প্রদান করতে হবে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতাভুক্ত স্কিমসমূহ

বাংলাদেশের মানুষের পেশা, সামাজিক অবস্থান এবং আয়ের ভিন্নতা বিবেচনা করে সরকার মোট ৫টি ভিন্ন ভিন্ন স্কিম চালু করেছে। নিচে স্কিমগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রবাস স্কিম (প্রবাসীদের জন্য)

দেশের বাইরে কর্মরত লক্ষ লক্ষ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য চালু করা হয়েছে প্রবাস স্কিম। এর মাধ্যমে দেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি প্রবাসীরা দেশে ফিরে একটি নিশ্চিত আয়ের উৎস পাবেন। প্রবাসীরা বিদেশি মুদ্রায় চাঁদা জমা দেবেন এবং মেয়াদ শেষে দেশীয় মুদ্রায় পেনশন পাবেন।

২. প্রগতি স্কিম (বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য)

দেশের বৃহৎ একটি অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এই বেসরকারি চাকরিজীবী-দের অবসর জীবনের কথা মাথায় রেখে প্রগতি স্কিম প্রণয়ন করা হয়েছে। এখানে চাকরিজীবী নিজে এবং চাইলে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও যৌথভাবে চাঁদা প্রদান করতে পারবে।

৩. সুরক্ষা স্কিম (স্বকর্মে নিয়োজিতদের জন্য)

কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সার বা অনানুষ্ঠানিক খাত-এ জড়িত সকল নাগরিকের জন্য রয়েছে সুরক্ষা স্কিম। যাদের আয়ের কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই, তারা এই স্কিমের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারবেন।

৪. সমতা স্কিম (স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য)

দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী বা নিম্ন আয়ের নাগরিক-দের জন্য তৈরি করা হয়েছে সমতা স্কিম। এই স্কিমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, এখানে চাঁদাদাতা যে পরিমাণ চাঁদা দেবেন, সরকার ঠিক সমপরিমাণ অর্থ সরকারি অনুদান হিসেবে তার অ্যাকাউন্টে জমা করবে। এটি মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বিশাল আশীর্বাদ।

৫. প্রত্যয় স্কিম (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য)

সকল স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে প্রত্যয় স্কিম। এটি এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীদের জন্য একটি যুগোপযোগী পেনশন ব্যবস্থা।

চাঁদার হার ও মাসিক চাঁদা জমা দেওয়ার নিয়ম

পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করা। প্রতিটি স্কিমের জন্য আলাদা আলাদা চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। চাঁদা মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে জমা দেওয়া যায়।

স্কিমের নাম

কাদের জন্য প্রযোজ্য

মাসিক চাঁদার পরিমাণ (টাকায়)

প্রবাস স্কিম

প্রবাসী বাংলাদেশী

৫,০০০ / ৭,৫০০ / ১০,০০০

প্রগতি স্কিম

বেসরকারি চাকরিজীবী

২,০০০ / ৩,০০০ / ৫,০০০

সুরক্ষা স্কিম

অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী

১,০০০ / ২,০০০ / ৩,০০০ / ৫,০০০

সমতা স্কিম

নিম্ন আয়ের মানুষ

১,০০০ (চাঁদাদাতা ৫০০ + সরকার ৫০০)

গুরুত্বপূর্ণ নোট:

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা জমা দিতে ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট হারে বিলম্ব ফি বা জরিমানা আরোপ করা হবে। তবে কেউ যদি যৌক্তিক কারণে চাঁদা দিতে না পারেন, তবে নির্দিষ্ট সময় পর বিলম্ব ফিসহ বকেয়া পরিশোধ করে স্কিমটি সচল রাখার সুযোগ রয়েছে।

কীভাবে অনলাইনে পেনশন নিবন্ধন করবেন?

সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজড করা হয়েছে, যাতে ঘরে বসেই মানুষ অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করতে পারে। নিচে ধাপে ধাপে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আলোচনা করা হলো:

১. ওয়েবসাইটে প্রবেশ: প্রথমে আপনার মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে সরাসরি upension.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। ২. নিবন্ধন শুরু: ওয়েবসাইটের হোমপেজ থেকে "পেনশনার রেজিস্ট্রেশন" বা নিবন্ধন বাটনে ক্লিক করুন। ৩. তথ্য প্রদান: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, জন্ম তারিখ এবং সচল মোবাইল নম্বর প্রদান করুন। ৪. ওটিপি ভেরিফিকেশন: আপনার দেওয়া মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি (OTP) আসবে, সেটি নির্দিষ্ট বক্সে বসিয়ে ভেরিফাই করুন। ৫. স্কিম নির্বাচন: আপনার পেশা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্কিম (প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা বা প্রত্যয়) নির্বাচন করুন এবং মাসিক চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করুন। ৬. ব্যাংক ও নমিনি তথ্য: আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য এবং নমিনির তথ্য (NID সহ) নির্ভুলভাবে প্রদান করুন। ৭. পেনশনার আইডি প্রাপ্তি: সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করে সাবমিট করার পর সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ইউনিক পেনশনার আইডি তৈরি হবে।

এই আইডিটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ ভবিষ্যতে চাঁদা জমা দেওয়া বা পেনশন উত্তোলন-এর সময় এটি প্রয়োজন হবে।

নমিনি সুবিধা, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ও মুনাফা

সর্বজনীন পেনশন স্কিম শুধুমাত্র চাঁদাদাতার জন্যই নয়, তার অবর্তমানে তার পরিবারের জন্যও সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

  • নমিনি সুবিধা: স্কিম চলাকালীন সময়ে যদি চাঁদাদাতা মারা যান, তবে তার মনোনীত নমিনি বা নমিনিরা জমাকৃত অর্থ এবং তার উপর অর্জিত মুনাফা ফেরত পাবেন। আর যদি চাঁদাদাতা ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যান, তবে অবশিষ্ট সময়কালের (৭৫ বছর পর্যন্ত) মাসিক পেনশন তার নমিনি পাবেন। এটি একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী নমিনি সুবিধা

  • পেনশন ফান্ড ও বিনিয়োগ: চাঁদাদাতাদের জমাকৃত অর্থ দিয়ে একটি বিশাল পেনশন ফান্ড গঠন করা হবে। এই ফান্ডটি অত্যন্ত নিরাপদ ও লাভজনক সরকারি বন্ড এবং অন্যান্য লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশ পেনশন ম্যানেজমেন্ট

  • মুনাফা বা লভ্যাংশ: বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ চাঁদাদাতাদের অ্যাকাউন্টে আনুপাতিক হারে জমা হবে। ফলশ্রুতিতে, পেনশনের পরিমাণ সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাবে। আপনি কত টাকা চাঁদা দিলে ভবিষ্যতে কত টাকা পেনশন পাবেন, তা খুব সহজেই ওয়েবসাইটের পেনশন ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে হিসাব করে নিতে পারবেন।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী

স্কিমটি সম্পর্কে আরও কিছু বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন:

স্কিম পরিবর্তন

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মাঝপথে স্কিম পরিবর্তন করা যাবে কি না। হ্যাঁ, পেশা বা আয়ের পরিবর্তন হলে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে স্কিম পরিবর্তন এবং চাঁদার পরিমাণ কমানো বা বাড়ানোর সুযোগ এই নীতিমালায় রাখা হয়েছে।

জমানো অর্থের উপর ঋণ বা উত্তোলন

মেয়াদ পূর্তির আগে সাধারণত সম্পূর্ণ পেনশন উত্তোলন করা যায় না। তবে চাঁদাদাতা চাইলে নিজের চিকিৎসার জন্য বা বাড়ি নির্মাণের মতো জরুরি প্রয়োজনে জমা করা অর্থের সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন, যা পরবর্তীতে কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সাথে সমন্বয়

যাঁরা বর্তমানে বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার মতো অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত সুবিধাদি পাচ্ছেন, তাঁরাও চাইলে এই সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হতে পারবেন। তবে শর্ত হলো, এই স্কিমে যুক্ত হলে তাঁদেরকে বিদ্যমান ভাতা ত্যাগ করতে হবে।

পরিশেষ

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সর্বজনীন পেনশন স্কিম একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও প্রতিটি নাগরিকের শেষ জীবনের গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করবে এই স্কিম। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী, অনানুষ্ঠানিক খাত-এর কর্মী এবং নিম্ন আয়ের নাগরিক-দের জন্য এটি একটি আশীর্বাদ।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ-এর এই সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় আপনার জমানো অর্থ থাকবে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই আর দেরি না করে, আজই upension.gov.bd-তে ভিজিট করুন এবং নিজের জন্য উপযুক্ত স্কিমটি বেছে নিন।

পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, স্কিম সংক্রান্ত যেকোনো আইনি জটিলতা বা বিস্তারিত ধারাগুলো বুঝতে সর্বজনীন পেনশন বিধিমালা পিডিএফ লিংকে ক্লিক করে অফিসিয়াল রুলস বা বিধিমালাটি সংগ্রহ করে রাখুন।

আপনার আজকের ছোট একটি সঞ্চয়, কালকের নিরাপদ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি!


মন্তব্য করুন

ব্লগ