Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

হালাল রুজি অর্জনের জন্য রাসূল (সা.) এর নিদের্শনা


                                                                   হালাল রুজি অর্জনের জন্য রাসূল (সা.) এর নিদের্শনা

                                                                                      ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস


রুজি বা রিজিক বলা হয় এমন বস্তুকে, যা কোনো প্রাণী আহার্যরুপে গ্রহণ করে, যা তার দৈহিক শক্তি সঞ্চার করে, প্রবৃদ্ধি সাধন করে। আল্লাহ তা‘য়ালা পৃথিবীর সকল প্রাণীকূলকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের রিজিকের ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। আল্লাহ তা‘য়ালা যতটুকু সময়ের একজন মানুষকে পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন, তার হায়াত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার সকল রিজিকের ব্যবস্থা করেন। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি তাদের স্থায়ী, অস্থায়ী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে।’ [সুরা আল-হুদ: ৬] সমাজের একশ্রেনীর মানুষ প্রতারণা, সূদী কারবার, মওজুদারি, ওযনে ঠকানো, নেশাজতীয় দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয়. চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটতরাজ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জবর দখল ইত্যাদি অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্থের পাহাড় বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে তা উপভোগ করে, তখন তা তার জন্য হারাম রিজিক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। আল্লাহ তা‘য়ালা হালাল রুজি উপার্জনের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ কর, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ [সুরা আল-বাকারা: ১৬৮]


রাসূল (সা.) এর জীবনেই রয়েছে মানব জাতির জন্য সর্বত্তম আদর্শ। মানুষের চরিত্রগঠন, সুবিচার প্রতিষ্ঠা, ইনসাফপূর্ণ বৈষম্যহীন একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুমহান লক্ষ্য। রাসূল (সা.) কর্তৃক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষেরা ফিরে পায় তাদের সত্যিকারের মানবিক মর্যাদা। রাসূল (সা.) একটি ধ্বংসস্তুপ থেকে, একটি পুঁতিগন্ধময় আস্তাকুড় থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও মানবিক মুল্যবোধকে তুলে এনে এক সুষম ও নৈতিক সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন। রাসূল (সা.) মানুষকে হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জনের জন্য যেমন বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান করেছেন। তেমনি হারাম উপার্জনের ভয়াবহ পরিনতির ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ লাভের জন্য হালাল জীবিকা অর্জনের প্রচেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একান্ত অবশ্যক। এ প্রবন্ধে ব্যক্তি জীবনকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করতে আয়-রোজগার তথা হালাল রুজি অর্জনের জন্য রাসূল সা. এর নিদের্শনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।


হালাল রিজিক অন্বেষণ: হালাল পথে উপার্জন করা, অর্থাৎ বৈধ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। হালাল রুজি অর্জন সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হালাল রিজিক তালাশ করা অন্য ফরজের পর ফরজ।’ [আল মুজামুল কাবির] এই হাদীসে বলা হয়েছে, হালাল রুজি অর্জন শুধু একটি ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং ফরজ নামাজের মতোই একটি আবশ্যকীয় কর্তব্য। আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষের জন্য যে ইবাদতগুলো ফরজ করেছেন, সেগুলো পালনের পাশাপাশি হালাল রিজিক অর্জন করাও আবশ্যক। কারণ, হালাল রিজিক ছাড়া মানুষের দৈহিক পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, মানুষের মৌলিক অধিকার। এগুলোর যোগান দিতে মানুষকে বেছে নিতে হয় সম্পদ উপার্জনের নানাবিধ পন্থা। উপার্জনের মাধ্যম ব্যতীত কোন ব্যক্তির পক্ষেই উপর্যুক্ত মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মানুষকে মহান আল্লাহ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদের যাবতীয় মৌলিক অধিকারও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে লক্ষ্যে তিনি পৃথিবীর সব সৃষ্টিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের (ব্যবহারের জন্য) তৈরী করেছেন।’ [সূরা আল-বাকারা: ২৯]


হালাল পেশাকে গুরুত্ব প্রদান করা: হালাল রিজিক আল্লাহর তা‘য়ালার বিশেষ নিয়ামাত, এই নিয়ামতের প্রতি অবহেলা করা ঠিক নয়। যখন কারও রিজিক কোনো হালাল পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তখন সে পেশাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজ পেশাকে কখনও ছোট করে দেখা যাবে না। আল্লাহর দান এই পেশাকে কে বিনা কারণে ত্যাগ করা ঠিক নয়। তবে যদি নিজ থেকেই ওই পেশা বন্ধ না হয়ে যায় বা তা বহাল রাখা বিভিন্ন পেরেশানির কারণ হয় বা শরিয়তসম্মত কোনো কারণ থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে পেশা পরিবর্তন করা যাবে। বিনা কারণে পরিবর্তন বা পেশার ব্যাপারে গাফিলতি করা ঠিক নয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যাকে কোনো বস্তুর মাধ্যমে রিজিক প্রদান করা হয়, সে যেন তা আঁকড়ে ধরে রাখে।’ [কানজুল উম্মাল]


নিজের প্রাপ্তির ওপর সন্তুষ্ট থাকা: আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদের জন্য যে রিজিক বরাদ্দ রেখেছেন, তাতে আমাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কে আমার থেকে পাঁচটি বিশেষ নসিহত গ্রহণ করবে, এরপর সে অনুযায়ী নিজে আমল করবে বা যে আমল করবে, তাকে শেখাবে?’ আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, ‘আমি প্রস্তুত হে আল্লাহর রাসুল (সা.)।’ রাসুল (সা.) আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাত ধরে গুণে গুণে পাঁচটি উপদেশ দিলেন। এর অন্যতম একটি হলো, ‘তুমি হারাম বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক ইবাদতগোজার বান্দা হয়ে যাবে। আল্লাহ তোমার ভাগ্যে যে রিজিক রেখেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে তুমি সবার মাঝে সবচেয়ে অধিক ধনী হয়ে যাবে।’ [আত-তিরমিযি]

হালাল রিজিক অন্বেষণ ইবাদত: হালালভাবে রিজিকের অন্বেষণ করা ফরজ ইবাদতের তুল্য। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে; যেন সফল হও।’ [সুরা আল-জুমা: ১০] এ আয়াতে কারীমায় মহান আল্লাহ তা‘য়ালা নামাজ সম্পন্ন করার পর হালাল রিজিক তালাশের নির্দেশ দিয়েছেন। হালাল রিজিক সন্ধানের একটি উপায় হলো, ব্যবসার মাধ্যমে রিজিক সন্ধান করা। সুদ মুক্ত সঠিক পন্থায় ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।’ [সুরা বাকারা: ২৭৫] 


মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আরো বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা পবিত্র খাদ্যদ্রব্য থেকে আহার কর, যা কিছু আমি তোমাদের রিজিক হিসেবে প্রদান করেছি। আর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত কর।’ [সুরা আল-বাকারা: ১৭২] এ আয়াতে করীমায় হারাম খাদ্য ভক্ষণ করতে যেমন নিষেধ করা হয়েছে, তেমনি হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করার পর আল্লাাহর শুকরিয়া আদায় করতে অনুপ্রণিত করা হয়েছে। হালাল খাদ্য গ্রহণের ফলে মানব মনে এক প্রকার আলো সৃষ্টি হয়, যা অন্যায়ের প্রতি ঘৃণাবোধ সৃষ্টি করে এবং সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করে, ইবাদত-বন্দেগীতে মনোযোগ আসে, পাপের কাজে ভয় আসে এবং দো‘য়া কবুল হয়। এ জন্যই আল্লাহ তা‘য়ালা সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘হে রাসূলগণ! তোমরা হালাল খাদ্য গ্রহণ কর এবং নেক আমল কর।’ [সূরা আল-মু‘মিন: ৫১] 


সর্বোত্তম হালাল রিজিক: কোন ব্যক্তির নিজের হাতে উপার্জিত ফল-ফসল তার জন্য সর্বোত্তম রিজিক বা খাবার। এর চেয়ে উত্তম আহার্য আর কিছুই নাই। একজন ব্যক্তি কৃষিকাজের মাধ্যমে পরিশ্রম করে যে ফল-ফসল উৎপাদন করে তা আহার্য হিসাবে গ্রহনের মজাই আলাদা। হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিজের উপার্জিত আহার্য সর্বোত্তম। তোমাদের সন্তানও নিজ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।’ [সুনানে ইবনে মাজাহ] সাঈদ ইবনু উমায়ের (রা.) তার চাচা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হল কোন প্রকার উপার্জন উত্তম। তিনি বললেন, ‘হাতের কাজ এবং হালাল ব্যবসার উপার্জন।’ [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব]


আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক নবী ছাগল চরাতেন।’ সাহাবীরা বললেন, ‘আপনিও কি এমনটি করতেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি মক্কাবাসীর ছাগল কয়েক কিরাত (আরবের পরিমাপ বিশেষ) দ্বারা চরিয়েছি।’ [আল জামিউস সহীহ] মিকদাদ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) তার নিজের হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।’ [সহীহুল বুখারী] মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার জমি আছে, সে নিজেই চাষ করবে।’ [সহীহুল বুখারী] অন্য হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, ‘যে কোনো মুসলমান কোনো গাছ রোপণ করবে বা খেত-খামার করবে, তার থেকে কোনো পশু-পাখি খাবে বা মানুষ বা প্রাণী খাবে, তা দ্বারা সে সদকার সওয়াব পাবে।’ [সহীহুল বুখারী]


হালাল উপার্জন জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম: হালাল উপার্জন ও হালাল রিজিক গ্রহনের মাধ্যমেই জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হালাল রিজিক ভক্ষণ করল, আর সুন্নত মতে আমল করল এবং মানুষ তার কষ্ট থেকে নিরাপদ রইল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ ধরনের লোক বর্তমানে অনেক।’ তিনি বললেন, ‘আমার পরে তা কয়েক যুগ পাওয়া যাবে।’ [আত-তিরমিযি] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসুল (সা.) এর দরবারে নোমান বিন কাউকাল (রা.) এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি বলেন, যদি আমি ফরজ নামাজ আদায় করি, হারামকে হারাম মনে করি ও হালালকে হালাল মনে করি, তাহলে কি জান্নাতে যাব?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ যাবে।’ [সহীহ মুসলিম]


হারাম রিজিক বর্জনের নির্দেশ: হারাম রিজিক বর্জনের নির্দেশ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর সুন্দরভাবে ইবাদত করো। কেন না, কোনো আত্মা তার রিজিক পরিপূর্ণ হওয়া ছাড়া ইন্তেকাল করবে না, যদিও তাতে দেরি হয়। তাই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর সুন্দরভাবে তালাশ করো। তোমরা হালালকে গ্রহণ করো ও হারামকে বর্জন করো।’ [সুনানে ইবনে মাজাহ] আবু বকর (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঐ শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে।’ [মিশকাত] ওমর বিন খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের দিন কতিপয় লোক নিহত হলে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল যে, অমুক শহীদ হয়েছে, অমুক শহীদ হয়েছে, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কক্ষনও নয়! আমি তাকে অবশ্যই জাহান্নামে দেখেছি এ কারণে যে, একটি ঢিলা জামা অথবা একটি চাঁদর সে আত্মসাৎ করেছিল। অতঃপর তিনি (সা.) আমাকে বলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি গিয়ে মানুষের মাঝে এ ঘোষণা দাও যে, মু‘মিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অতঃপর আমি গিয়ে জনসমক্ষে এ ঘোষণা দিলাম।’ [সহীহ মুসলিম]

আবু যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিন শ্রেণীর লোকের সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.)! এমন ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কারা? রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার পুনরুল্লেখ করে বললেন, (ক) টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধানকারী (খ) মিথ্যা শপথে পণ্য বিক্রয়কারী (গ) উপকারের খোটা দানকারী ব্যক্তি।’ [সহীহ মুসলিম]


ঠকবাজির মাধ্যমে উপার্জনে না করা: ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেন-দেনের ক্ষেত্রে পরিমাণ ও ওযনে ঠকানোর মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন জঘন্য কাজ। আল্লাহ তা‘য়ালা এহেন কারবারীর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় হুঁশিয়ার বাণী নাযিল করেছেন। তিনি বলেন, ‘যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ। এরা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন মেপে দেয় তখন কম করে দেয়।’ [সূরা আল-মুতাফফিফিন: ১-৩] এ ধরনের কর্মকান্ড তারাই করে থাকে, যারা অত্যধিক ধূর্ত। এভাবে তারা মানুষকে ঠকিয়ে অসৎ পন্থায় আয় করে। অথচ এই অন্যায়কর্ম সম্পাদনের কারণে পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখনই কোন জনগোষ্ঠী মাপ ও ওযনে কম দেয়, তখনই তাদেরকে দুর্ভিক্ষ, খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি ও অত্যাচারী শাসকের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়।’ [সহীহুল বুখারী]


সূদী কারবারির মাধ্যমে উপার্জন না করা: সুদকে আল্লাহ তা‘য়ালা হারাম ঘোষণা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সূদ ভক্ষণকারী, সূদদাতা, সূদের লেখক ও সাক্ষীকে অভিসম্পাত করেছেন। [সহীহ মুসলিম] সূদ খেলে আখেরাতে আল্লাহর আযাব বা শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। ‘হযরত ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন কোন জনপদে ব্যভিচার ও সূদ ব্যাপকতা লাভ করে তখন সেখানকার বাসিন্দারা নিজেদের জন্য আল্লাহর আযাব বৈধ (অবধারিত) করে নেয়।’ [মুস্তাদরাকে হাকেম] ‘হযরত আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘সুদের তিয়াত্তরটি স্তর রয়েছে। সর্বনিম্নটি হলো নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারের সমতুল্য।’ [মুস্তাদরাকে হাকেম]


সূদখোদ জান্নাতের নিয়ামত ভোগ করতে পারবে না ‘হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- আল্লাহ তা‘য়ালা চার ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং তাদেরকে জান্নাতের নিয়ামত ভোগ করার সুয়োগও দেবেন না এরা হলো (ক) মদখোর, (খ) সুদখোর, (গ) (অণ্যায়ভাবে) ইয়াতিমের মাল ভক্ষণকারী (ঘ) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।’ [ইবনে মাযাহ] রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘সূদের একটি মাত্র দিরহাম ছত্রিশবার ব্যভিচার করার চাইতেও জঘন্য।’ [মিশকাত]

প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন না করা: ব্যবসা বা লেন-দেনের ক্ষেত্রে প্রতানণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা হারাম। যেমন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশানো, উৎকৃষ্ট মালের সাথে নিম্নমানের মাল মিলানো, অতিরিক্ত গ্রহণ করা, এক জিনিস নির্ধারণ করে জোরপূর্বক অন্যটি দিয়ে দেয়া ইত্যাদি। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ধোঁকা দিল সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ [সহীহ মুসলিম] বাস ও রেল স্টেশন এবং লঞ্চঘাটে কুলিদের উৎপীড়ন ও মালামাল উঠানো-নামানো নিয়ে দর কষাকষি এবং অতিরিক্ত আদায় ঠকবাজির শামিল। দ্রব্যের কোন দোষ-ত্রুটি থাকলে ক্রেতার সম্মুখে তা প্রকাশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হবে এবং তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। কোন প্রকার গোপনীয়তার আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) পণ্যে ভেজাল দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। 


আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, ‘একদা নবী করীম (সা.) কোন এক খাদ্যস্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যস্তূপে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে দেখলেন তার হাত ভিজে গেছে। তিনি বললেন, হে খাদ্যের মালিক! ব্যাপার কি? উত্তরে খাদ্যের মালিক বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), বৃষ্টিতে এটি ভিজে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তাহলে ভেজা অংশটা শস্যের উপরে রাখলে না কেন? যাতে ক্রেতারা তা দেখে ক্রয় করতে পারে। নিশ্চয়ই যে প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়।’ [মুসলিম] রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘ক্রেতা বিক্রেতা যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, ততক্ষণ তাদের চুক্তি ভঙ্গ করার ঐচ্ছিকতা থাকবে। যদি তারা উভয়েই সততা অবলম্বন করে ও পণ্যের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে, তাহলে তাদের পারস্পরিক এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি তারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং পণ্যের দোষ গোপন করে তাহলে তাদের এ ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত শেষ হয়ে যাবে।’ [সহীহুল বুখারী]


উৎকোচ বা ঘুষ গ্রহন না করা: বর্তমানে ঘুষ-উৎকোচ গোটা দেশকে জাহেলিয়াতের প্রগাঢ় অমানিশায় নিক্ষেপ করেছে। এমন বহু নজীর রয়েছে যে, কোন ব্যক্তির প্রাপ্য আদায়ে আবশ্যকিভাবে ঘুষের লেন-দেন করতে হচ্ছে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন থেকে শুরু করে সকল পর্যায়েও ব্যাপক হারে প্রকাশ্যেই ঘুষের লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু তারা যদি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অমিয় বাণীর দিকে লক্ষ্য করত, তবে কখনই অভিশপ্ত এই পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করত না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারীকে।’ [মুসনাদে আহমাদ]


চুরি, ডাকাতির মাধ্যমে উপার্জন না করা:  এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটতরাজ ইত্যাকার কর্মকান্ড করে থাকে। গভীর রাতে রাস্তায় গাছ ফেলে ডাকাতি করার মত ঘটনাও ঘটে। যারা চুরি, ছিনতাই, লুটতরাজ ও ডাকাতির মাধ্যমে উপার্জন করে তারা ঈমান  হারা হয়ে যায়। অথচ তাদের ঈমান হারানোর কথা অন্তকরণে সামান্যতমও জাগ্রত হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চোর যখন চুরি করে তখন তার ঈমান থাকে না। ডাকাত যখন জনসমক্ষে ডাকাতি করে তখন তার ঈমান থাকে না।’ [সহীহুল বুখারী] অর্থাৎ তার ঈমান এ অবস্থা থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।


জবর দখল ও আত্মসাৎ এর মাধ্যমে উপার্জন না করা: যারা জবর দখল ও আত্মসাৎ এর মাধ্যমে উপার্জন করে, তাদের জন্য পরকালে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মসাৎ করবে, সে কিয়ামত দিবসে আত্মসাৎকৃত বস্তু নিয়েই সে হাজির হবে।’ [সূরা আলে ইমরান: ১৬১] রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল ও আত্মসাৎ সস্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,  ‘যাকে আমরা কোন কাজে নিযুক্ত করলাম, আর সে একটি সুতা বা তদুর্ধ্ব কিছু গোপন করল সেটা আত্মাসাৎ হিসাবে বিবেচিত। যা নিয়ে সে কিয়ামত দিবসে হাজির হবে। [সহীহ মুসলিম]


আত্মসাৎ, খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা ভয়ংকর অপরাধ। যারা দুনিয়ায় এগুলোর সঙ্গে জড়িত হবে, তাদের হাশরের ময়দানে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য এক-একটি পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং বলা হবে, এটা অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।’ [সহীহুল বুখারী] সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারো জমির কোনো অংশ জুলুম করে কেড়ে নেয়, কিয়ামতের দিন ওই জমিনের সাত স্তর তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। [সহীহুল বুখারী] আরেক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সামান্য পরিমাণ জমিও দখল করবে, কেয়ামতের দিন তাকে সাত স্তর জমিনের নিচ পর্যন্ত ধসিয়ে দেওয়া হবে।’। [সহীহুল বুখারী] 


সন্ত্রাস, দস্যুতা, ছিনতাই, লুন্ঠন, অপহরণ করা কবীরা গুনাহ্গুলোর মধ্যে অন্যতম। এ অপরাধের শাস্তির কথা উল্লেখ করে মহান আল¬াহ্ তা‘য়ালা বলেন: ‘যারা আল্ল¬াহ তা‘য়ালা ও তদীয় রাসূল এর সাথে যুদ্ধ কিংবা প্রকাশ্য শত্রুতা পোষণ করে অথবা আল্ল¬াহ তা‘য়ালা ও তদীয় রাসূল এর বিধি-বিধানের উপর হঠকারিতা দেখায় এবং ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি ও ত্রাস সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ফাঁসী দেয়া হবে অথবা এক দিকের হাত এবং অপর দিকের পা কেটে ফেলা হবে অথবা অন্য এলাকার জেলে বন্দী করে রাখা হবে, যতক্ষণ না তারা খাঁটি তাওবা করে নেয়। ’ (সূরা আল-মায়েদা: ৩৩]


জুয়া ও বাজির মাধ্যমে উপার্জন না করা: ক্রিকেট, ফুটবল বা যে কোন খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরা হারাম কাজ। বাজিতে জেতা অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করাও হারাম। জুয়ায় অংশগ্রহণকারী জান্নাতে যাবে না। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ‘হে মু‘মিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা, ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রপ্ত হও।’ [সূরা আল-মায়েদা: ৯০] আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘য়ালা মদ, জুয়া ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন।’ [বায়হাকী] আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে যাবে না। ’ [মিশকাত]


পণ্য বিক্রয়ে অধিক কসম না করা: আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কসম করলে পণ্য বিক্রয় হয় কিন্তু তাতে বরকত থাকে না।’ [সহীহ মুসলিম] আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। রাবী বলেন, রাসূল (সা.) এটা তিনবার বললেন। আবু যার (রা.) বলেন, তারা ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল (সা.)? তিনি বললেন, টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধানকারী, উপকার করে খোটা দানকারী, মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারী।’ [সহীহ মুসলিম]


ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ না করা: আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেন, ‘যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের সম্পদ গ্রাস করে, তারা তো তাদের উদরে আগুন ভক্ষণ করল।’ [সূরা আস-নিসা: ১০] আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা (২) যাদু (৩) আল্লাহ তা‘য়ালা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মু’মিনাদের অপবাদ দেয়া। [সহীহুল বুখারী]


এতিম সন্তান লালন-পালনকারীর মর্যাদা অনেক। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘বিধবা ও গরিবদের জন্য চেষ্টা-সাধনাকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর এবং যে ব্যক্তি দিনে রোজা রাখে ও রাতে (নফল) নামাজে লিপ্ত থাকে তার সমতুল্য।’ [আদাবুল মুফরাদ] যে ব্যক্তি নিজ খরচে কোনো এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে জান্নাতে তার অবস্থান হবে নবী করিম (সা.) এর পাশাপাশি। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমি এবং এতিমের ভরণপোষণকারী বেহেশতে এই দুইটি মধ্যমা ও তর্জনি আঙুলের মতো একত্রে থাকব।’ [আদাবুল মুফরাদ] 


মজুতদারির মাধ্যমে উপার্জন না করা:  মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় পণ্য খাদ্য মওজুদ করে মুনাফা লাভ করে অর্থ উপার্জন করা নিষেধ। মুনাফাখোররা নির্ধারিত সময় ব্যবসায়ী বেচাকেনা বন্ধ রাখে যাতে বাজার মূল্য চড়া হয় ও চাহিদা েেড় যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন খাদ্য গুদামজাত করে রাখল, তাহলে সে অবশ্যই আল্লাহ থেকে মুক্ত, আর আল্লাহ ও তার থেকে মুক্ত।’ [মিশকাত] রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘যে গুদামজাত করে সে পাপী।’ [সহীহ মুসলিম] নবী (সা.) আরো বলেন, ‘পণ্য আমদানীকারক রিযিকিপ্রাপ্ত আর মজুদদার অভিশপ্ত।’ [ইবনু মাজাহ]


হারাম কাজের মাধ্যমে উপার্জন না করা: গান-বাজনার উপকরণ বিক্রি করা, ভাস্কর্য, ছবি নির্মাণ করা, সেলুনে দাড়ি কামিয়ে অর্থ উপার্জন করা, নেশাজতীয় দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করা, মদ, কুকুর-শূকর বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করে অর্থের পাহাড় বানানো এসব হারাম উপার্জনের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম। আবু ওমামা (রা.) বলেন, রাসূল  (সা.) বলেছেন, তোমরা গায়িকা নর্তকীদের বিক্রয় কর না, তাদের ক্রয় কর না, তাদের গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র শিখিয়ে দিয়ো না, তাদের উপার্জন হারাম।’ [ইবনে মাজাহ]

যাকাতের সম্পদ গোপন না করা: নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও যাকাত আদায় না করে সে সম্পদ ভোগ করা অপরাধ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে সম্প্রদায় তাদের সম্পদের যাকাত প্রদান করে না, তাদেরকে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণও করা হত না, যদি প্রাণীকুল না থাকত।’ [ইবনু মাজাহ] রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘স্বর্ণ-রূপার মালিক যারা তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তা পাত বানানো হবে, অতঃপর তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তার পার্শ্বদেশ, কপাল ও পিঠে সেকা দেওয়া হবে।’ [সুরা আত-তাওবা: ৩৫] অনুরূপভাবে পশু-সম্পদ, অর্থসম্পদ, ওশর ইত্যাদির যাকাত আদায় না করে সে সম্পদ কাছে রাখলে পরকালে শাস্তি দেওয়া হবে।


সমাপনী: রুজি বা রিজিক উপার্জনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষকে দিয়েছেন পূর্ণ স্বাধীনতা, যা তার ইখতিয়ারভুক্ত একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। ফলে প্রত্যেকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, মেধা, শ্রম ও সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যেমে উপার্জন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রয়াস চালায়। সমাজের স্বল্প সংখক মানুষ আজ বৈধ্য পন্থায় উপার্জন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রয়াস চালায়। সমাজের একশ্রেনীর মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেন-দেনের ক্ষেত্রে প্রতারণা, সূদী কারবার, মওজুদারি, ওযনে ঠকানো, নেশাজতীয় দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করে উপার্জন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রয়াস চালায়। আবার একশ্রেনীর মানুষ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটতরাজ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জবর দখল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল ও আত্মসাৎ ইত্যাদি অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে অর্থের পাহাড় বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। 


যখন কোনো ব্যক্তি অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে তা উপভোগ করে, তখন তা তার জন্য হারাম রিজিক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হারাম দ্বারা যে সমস্ত দেহ গঠিত হয়েছে জাহান্নামই তার জন্য অধিক উপযোগী।’ [আত-তিরমিযী] রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘কিয়ামত দিবসে কোন বান্দা তার পা সরাতে পারবে না যতক্ষণ তার বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, কোথায় তা নিঃশেষ করেছে; তার জ্ঞান সম্পর্কে, যাতে সে কি কাজ করেছে; তার সম্পদ সম্পর্কে, কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে ও তা কোথায় ব্যয় করেছে; তার দেহ সম্পর্কে, কিসে তা জীর্ণ করেছে।’ [আত-তিরমিযী] আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিদের্শনা মোতাবেক সকল হারাম উপার্জন পরিহার করে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হালাল রুজি অর্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।


লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা। 


মন্তব্য করুন