১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
প্রযুক্তির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াব কীভাবে
একজন শিক্ষার্থীকে যদি প্রশ্ন করা হয়—“তুমি কম্পিউটার চালাতে পারো?” সে হয়তো গর্বের সঙ্গে বলবে, “জি স্যার, পারি।” কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়—“কম্পিউটার দিয়ে তুমি কী তৈরি করতে পারো?” তখন উত্তরটি হয়তো একটু থমকে যাবে। এখানেই আমাদের প্রযুক্তিশিক্ষার বড় প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে—আমরা কি শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী বানাচ্ছি, নাকি স্রষ্টা?
বর্তমান পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা, যোগাযোগ—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির উপস্থিতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, Internet of Things, Cloud Computing ও Data Science এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এগুলোই আগামী দিনের বাস্তবতা। তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি।
কিন্তু প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে কীভাবে?
প্রথমত, প্রযুক্তিকে পরীক্ষার বিষয় না বানিয়ে জীবনের বিষয় করতে হবে। আমরা কোনো বিষয় পড়াতে গিয়ে প্রায়ই বলি, “এটা পরীক্ষায় আসবে।” ফলে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়, জন্ম নেয় মুখস্থবিদ্যা। ICT ক্লাসে যদি শুধু সংজ্ঞা বা প্রোগ্রামিংয়ের নিয়ম শেখানো হয়, শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় নম্বর পাবে; কিন্তু প্রযুক্তিকে ভালোবাসবে না।
বরং শিক্ষক প্রশ্ন করতে পারেন—“তোমার মোবাইল কীভাবে তোমার কথা বুঝতে পারে?” “Google কীভাবে কয়েক সেকেন্ডে তথ্য খুঁজে দেয়?” “AI কীভাবে মানুষের ভাষা বুঝতে শেখে?” এমন প্রশ্ন শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল তৈরি করে। আর কৌতূহলই জ্ঞানের প্রথম সিঁড়ি।
দ্বিতীয়ত, করে শেখার সুযোগ দিতে হবে। শুধু বলা নয়—শিক্ষার্থীকে দিয়ে কিছু তৈরি করাতে হবে। Python দিয়ে Grade Calculator, একটি ছোট Website, Online Quiz, QR Code Project কিংবা Sensor ব্যবহার করে Smart Device তৈরি করা যেতে পারে। একটি ছোট Project-ও শিক্ষার্থীর মনে বড় আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিকে স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গ্রামের রাস্তা বর্ষায় ডুবে যায়—Sensor দিয়ে কি পানির উচ্চতা মাপা যায়? কৃষকের জমিতে কখন পানি প্রয়োজন—মাটির আর্দ্রতা মেপে কি তা জানানো যায়? বাজারে Parking-এর সমস্যা—IoT দিয়ে কি Smart Parking System তৈরি করা যায়?
যখন শিক্ষার্থী বুঝবে যে প্রযুক্তি শুধু বড় শহর বা বিদেশের বিষয় নয়, তার নিজের গ্রামের সমস্যার সমাধানেও প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে, তখন প্রযুক্তি তার কাছে বইয়ের একটি অধ্যায় থাকবে না; হয়ে উঠবে বাস্তব জীবনের হাতিয়ার।
এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে সব প্রশ্নের উত্তর জানা মানুষ না হয়ে উত্তর খুঁজে পাওয়ার পথপ্রদর্শক হতে হবে। শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, ভুল করতে এবং আবার চেষ্টা করতে দিতে হবে।
আমরা এমন শিক্ষার্থী চাই না, যে শুধু Facebook চালাতে জানে; আমরা চাই সে প্রশ্ন করুক—“Facebook-এর মতো একটি Platform কীভাবে তৈরি হয়?” আমরা এমন শিক্ষার্থী চাই না, যে শুধু AI-এর উত্তর কপি করে; আমরা চাই সে AI-এর উত্তর যাচাই করুক এবং নিজের চিন্তা দিয়ে আরও ভালো কিছু তৈরি করুক।
কারণ আগামী দিনের পৃথিবীতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতারাই এগিয়ে থাকবে।
আজ শ্রেণিকক্ষের একটি ছোট্ট কম্পিউটারের সামনে বসে যে শিক্ষার্থী একটি ছোট Code লিখছে, হয়তো একদিন সেই শিক্ষার্থীই তৈরি করবে এমন কোনো প্রযুক্তি, যা বদলে দেবে মানুষের জীবন।
তাই প্রযুক্তিশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীর হাতে একটি কম্পিউটার তুলে দেওয়া নয়; বরং তার মনে কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিস্রষ্টার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা।
কারণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে তৈরি হয়ে আসবে না—ভবিষ্যৎ আমাদেরই তৈরি করতে হবে।
১৪
২১ মন্তব্য