Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ

কাগজের তৈরি কলম কি আসলেই পরিবেশবান্ধব


জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের বিকল্প হিসেবে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ বা পরিবেশবান্ধব পণ্যের জোয়ার এসেছে। শপিং ব্যাগ, থালা-বাসন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের কলম তৈরিতেও এখন ব্যবহার করা হচ্ছে কাগজ। বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে ‘পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম’ বা ‘বীজযুক্ত কলম’।

আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় মনে হলেও পরিবেশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মনে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে- কলমগুলো কি আসলেই পরিবেশের জন্য শতভাগ নিরাপদ?

জানা গেছে, একটি প্রচলিত প্লাস্টিক কলমের তুলনায় কাগজের কলম পরিবেশের ক্ষতি অনেকখানি কমালেও, গঠনগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি পুরোপুরি ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত নয়।

সাধারণ একটি প্লাস্টিক কলম শতভাগ অপচনশীল। এটি মাটিতে মিশে যেতে ৪৫০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত সময় নেয়। সেই তুলনায় কাগজের কলমের বাইরের খোলস বা মূল বডিটি তৈরি হয় পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ, খবরের কাগজ বা ক্রাফট পেপার দিয়ে, যা মাটিতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিশে যায়।

পরিবেশবাদীদের মতে, এর ফলে কলম থেকে তৈরি হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বিপত্তিটা বাধছে কলমের ভেতরের মূল অংশে, যা সাধারণ ক্রেতাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

কাগজের কলম পরিবেশবান্ধব দাবি করা হলেও এর ভেতরের রিফিল, নিব (শিষ) এবং পেছনের প্লাগটি কিন্তু প্রচলিত প্লাস্টিক ও ধাতু দিয়েই তৈরি হচ্ছে। কলমের কালি যে নলের ভেতর থাকে, সেটি তৈরিতে উচ্চ ঘনত্বের ‘পলিপ্রোপিলিন’ প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। এই ক্ষুদ্র অংশটি শত শত বছর প্রকৃতিতে টিকে থাকে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর রিসাইকেলের অযোগ্যতা। সাধারণত বোতল বা শক্ত প্লাস্টিক রিসাইকেল করা গেলেও কলমের রিফিল রিসাইকেল করা যায় না। কারণ এর ভেতরে লেগে থাকা রাসায়নিক কালি রিসাইকেল প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে এটি সরাসরি ল্যান্ডফিলে বা ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে জমা হয়।

বাস্তবে এই কলমগুলোর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা কেমন, তা জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী রেদওয়ান আহমদের সঙ্গে।

রেদওয়ান বলেন, ‘আমি বীজযুক্ত কাগজের কলম কয়েকবার ব্যবহার করেছি। ব্যবহার শেষে মাটিতে পুঁতে দিলে গাছ বের হয় ভাবনাটা দারুণ। কিন্তু ব্যবহারের সময় একটু হাত ঘামলে বা পানির ফোঁটা লাগলেই কাগজের বডিটা নরম হয়ে যায়। আর লেখার সময় প্লাস্টিক কলমের মতো অতটা শক্ত গ্রিপ পাওয়া যায় না। তাছাড়া, এটা প্লাস্টিকের ব্যাবহার কমালেও পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয় না। কারণ, এর ভেতরের প্লাস্টিকের শিষটা ঠিকই কিন্তু রয়ে যায়। সুতরাং আমদেরকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব কলম আবিষ্কারের জন্য কাজ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘মাটিতে ফেলার পর কাগজের অংশটি পচে গেলেও ভেতরের প্লাস্টিক রিফিলটি ভাঙতে শুরু করে। রোদ ও বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে এগুলো অদৃশ্য ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ কণিকায় পরিণত হয়, যা মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট করে। পরে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে এগুলো নদী ও সমুদ্রের মাছের পেটে চলে যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি কলমের শিষ বা বলপয়েন্টের অগ্রভাগ তৈরি হয় টাংস্টেন কার্বাইড, তামা বা লোহা দিয়ে। এগুলো দীর্ঘদিন মাটিতে পড়ে থাকলে মরিচা ধরে এবং ভারী ধাতু মাটির নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি করে।’

বর্তমানে অনেক কাগজের কলমের পেছনে বিভিন্ন উদ্ভিদের (যেমন: মরিচ, টমেটো বা ফুল) বীজ যুক্ত করে দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘প্ল্যান্টেবল পেন’। বলা হয়, ব্যবহার শেষে কলমটি মাটিতে পুঁতে দিলে গাছ জন্মাবে। আইডিয়াটি বনায়নে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও, ব্যবহারকারী যদি কলমটি সঠিক উপায়ে মাটিতে না রোপণ করে সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলে দেন, তবে সেই বীজের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। তাছাড়া, বীজ থেকে গাছ হলেও ভেতরের প্লাস্টিক রিফিলটি কিন্তু মাটির নিচেই থেকে যায়।

এই বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ও ইপসা-র (YPSA-Young Power in Social Action) ব্লু প্রিজম প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এবং ফোকাল পারসন (গবেষণা, মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন) ড. মোরশেদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘প্লাস্টিক কলম বা ওয়ান-টাইম ব্যবহার্য কলম আমাদের ইকোসিস্টেমের জন্য এক নীরব হুমকি। কাগজের কলম প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে এবং এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে একে শতভাগ পরিবেশবান্ধব বলা যাবে না, কারণ এর ভেতরে থাকা রিফিলটি এখনো প্লাস্টিকের। তা ছাড়া, প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠলেও এই সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের কলমগুলোকে সার্কুলার অর্থনীতি বা ৩আর (3R - Reduce, Reuse, Recycle) মডেলে সহজে আনা যায় না। একবার উৎপাদিত হওয়ার পর এদের পুনরায় ব্যবহার বা রিসাইকেল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে এগুলো প্রকৃতিতে অপরিবর্তিত থেকে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করে।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি প্লাস্টিক দূষণ সামলাতে সরকার ‘উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) নির্দেশিকা ২০২৬’ তৈরি করেছে। এই নিয়মের অধীনে কলম তৈরি করা কোম্পানি বা ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের তৈরি করা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা ও তা আবার কাজে লাগানোর দায়িত্ব নিতে হবে। প্লাস্টিকের বডি না থাকলেও, রিফিল বা শিষের বর্জ্য যেন পরিবেশে না ছড়ায়, তা নিয়ে উৎপাদকদের জবাবদিহি করতে হবে। পাশাপাশি আমরা শতভাগ পরিবেশবান্ধব বা রিসাইকেল করা যায় এমন রিফিল ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছি।’

পরিবেশ গবেষকদের মতে, এটি প্লাস্টিকের ব্যবহার বিশাল পরিমাণে কমিয়ে আনছে। যদি কোটি কোটি প্লাস্টিক কলমের বডি ডাম্পিং সাইটে যাওয়া বন্ধ করা যায়, তবে তা পরিবেশের জন্য বড় স্বস্তি। তবে একে ‘শতভাগ পরিবেশবান্ধব’ বা ‘জিরো-ওয়েস্ট’ হিসেবে বাজারজাত করা এক ধরনের অতিশয়োক্তি। এটি পরিবেশ রক্ষার একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে।

প্রকৃত পরিবেশবান্ধব সমাধান পেতে হলে আমাদের সামগ্রিক ‘ব্যবহার ও ফেলে দেওয়া’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য দীর্ঘস্থায়ী ধাতব বা কাঠের তৈরি পুনঃব্যবহারযোগ্য পেন ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বছরের পর বছর শুধু কালি পরিবর্তন করে ব্যবহার করা যায় এবং কোনো প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি করে না। পাশাপাশি কলম প্রস্তুতকারকদের রিফিলের নল তৈরিতে খনিজ তেলের প্লাস্টিকের পরিবর্তে ভুট্টা বা উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে তৈরি ‘বায়ো-প্লাস্টিক’ এবং প্রাকৃতিক উপাদানের কালি ব্যবহার শুরু করতে হবে।

কাগজের কলম প্রচলিত প্লাস্টিক কলমের চেয়ে নিঃসন্দেহে বহুগুণ শ্রেয় এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে সাধারণ ভোক্তাদের মনে রাখা উচিত, যতক্ষণ না এর ভেতরের রিফিলটি প্লাস্টিকমুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ এটি প্রকৃতির জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়। সচেতনতাই পারে আমাদের প্রকৃত পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।

মন্তব্য করুন