Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

সূচ নয়, ভাতেই মিলবে যক্ষার ভ্যাক্সিন: ধানে প্রতিষেধক তৈরি করলেন ঢাবি অধ্যাপক

ভ্যাকসিন বলতে সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিরিঞ্জ, ইনজেকশন আর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা। কিন্তু যদি ভ্যাকসিনের অ্যান্টিজেন তৈরি হয় আমাদের পরিচিত ধানের বীজে? যদি সেই ধানকে ব্যবহার করেই মুখে খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব হয়?


এমন সম্ভাবনাই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জেবা ইসলাম সেরাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের এই অধ্যাপকের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ধানকে ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় recombinant protein ও vaccine antigen উৎপাদন করা।


১৯৮৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন ড. জেবা ইসলাম সেরাজ। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভিদ জৈবপ্রযুক্তি, বিশেষ করে ধানের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও উন্নত জাত উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার অন্যতম পরিচিত ক্ষেত্র লবণসহিষ্ণু ধান। পাশাপাশি ধানকে ব্যবহার করে ভ্যাকসিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরির গবেষণাতেও কাজ করেছেন তিনি।


এই গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ধানের বীজে কলেরা ও যক্ষ্মা-সম্পর্কিত অ্যান্টিজেন উৎপাদনের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে SIDA-এর সহায়তায় ধানের বীজে উৎপাদনের জন্য cholera ও TB antigen-এর cloning নিয়ে কাজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে Bill & Melinda Gates Foundation এবং icddr,b-এর যৌথ সহায়তায় ধানের endosperm-এ mucosal cholera antigen উৎপাদনের গবেষণাও পরিচালিত হয়।


গবেষণাটি শুধু ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ড. জেবা ইসলাম সেরাজ ও তাঁর সহকর্মীদের ২০১৭ সালের peer-reviewed গবেষণাপত্রে transgenic rice seed-এর মাধ্যমে যক্ষ্মা ও কলেরার অ্যান্টিজেন মুখে প্রয়োগের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় যক্ষ্মার জন্য Mycobacterial Ag85B antigen এবং কলেরার জন্য TcpA-এর একটি immunoprotective অংশকে ব্যবহার করা হয়েছিল।


পরীক্ষায় ইঁদুরকে এই transgenic rice seed খাওয়ানো হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিশেষ করে cholera antigen বহনকারী rice seed খাওয়ানোর পর ইঁদুরের শরীরে antigen-specific immune response তৈরি হয়েছে। রক্তে IgG এবং IgA অ্যান্টিবডির পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রের mucosal compartment-এও IgA response পাওয়া যায়। অর্থাৎ ধানের বীজের মাধ্যমে মুখে অ্যান্টিজেন পৌঁছে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার সম্ভাবনা গবেষণায় দেখা গেছে।


এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সম্ভাব্য সরলতা। প্রচলিত ভ্যাকসিন উৎপাদনে অ্যান্টিজেন আলাদা করে বিশুদ্ধকরণ, formulation এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। বিপরীতে rice-based vaccine নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের বীজের ভেতরে থাকা অ্যান্টিজেন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং oral delivery-এর মাধ্যমে শরীরে পৌঁছানো সম্ভব। একটি পূর্ববর্তী rice-based cholera vaccine গবেষণায় rice seed-এ থাকা CTB antigen দীর্ঘ সময় room temperature-এ স্থিতিশীল থাকার প্রমাণও পাওয়া যায়।


এ ধরনের প্রযুক্তি সফলভাবে মানুষের জন্য ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে এর সম্ভাব্য সুবিধা হবে অনেক। বিশেষ করে যেখানে উন্নত cold-chain ব্যবস্থা সীমিত, সেখানে সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহনের উপযোগী vaccine platform গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ইনজেকশননির্ভরতার পরিবর্তে oral delivery ব্যবস্থাও টিকাদানকে আরও সহজ করে তুলতে পারে।


তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি—ড. জেবা ইসলাম সেরাজের এই গবেষণা এখনো মানুষের জন্য অনুমোদিত যক্ষ্মা বা কলেরার ‘ভাতের ভ্যাকসিন’ তৈরি হয়ে যাওয়ার অর্থ নয়। গবেষণাটি মূলত transgenic rice-এর মাধ্যমে antigen delivery এবং প্রাণীদেহে immune response তৈরির সম্ভাবনা দেখিয়েছে। মানুষের ওপর ব্যবহারযোগ্য ভ্যাকসিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে আরও বিস্তৃত preclinical গবেষণা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় clinical trial দরকার।


অর্থাৎ, ধানের দানায় ভ্যাকসিন তৈরির গল্পটি এখনো গবেষণাগারের পর্যায়ে থাকা একটি সম্ভাবনাময় বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং peer-reviewed গবেষণার ফলাফল।


লবণসহিষ্ণু ধান থেকে শুরু করে উদ্ভিদভিত্তিক ভ্যাকসিন—বাংলাদেশের কৃষি ও জীবপ্রযুক্তি গবেষণায় ড. জেবা ইসলাম সেরাজের কাজ তাই কেবল একটি ফসলের উন্নয়ন নয়; বরং পরিচিত একটি খাদ্যশস্যকে ভবিষ্যতের জীবপ্রযুক্তির বাহন হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।

মন্তব্য করুন