সহকারী অধ্যাপক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:২৭ পূর্বাহ্ণ
সৎকর্মের সহজ পথ, কৃপণতার কঠিন পরিণতি -মোঃ মুজিবুর রহমান
সৎকর্মের সহজ পথ, কৃপণতার কঠিন পরিণতি
(সূরা আল-লাইলের আলোকে ঈমান, তাকওয়া, দানশীলতা, মানবিকতা ও আখিরাতের সফলতার মহাগাথা)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষের জীবন একই পথে চলে না। কেউ আলোর পথে এগিয়ে যায়, কেউ নিজের প্রবৃত্তি ও স্বার্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। কারও জীবনে দয়া, দান, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পথকে সহজ করে দেয়; আবার কারও জীবনে কৃপণতা, অহংকার, সত্য অস্বীকার ও দায়িত্বহীনতা তাকে কঠিন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
পবিত্র কুরআনের ৯২তম সূরা সূরা আল-লাইল মানুষের এই দুই ভিন্ন জীবনপথকে অত্যন্ত গভীর ও হৃদয়গ্রাহীভাবে তুলে ধরেছে। সূরার শুরুতে আল্লাহ রাতের অন্ধকার, দিনের আলো এবং নর-নারীর সৃষ্টির শপথ করে ঘোষণা করেছেন—“নিশ্চয়ই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের।” অর্থাৎ মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, উদ্দেশ্য ও কর্ম এক রকম নয়। প্রত্যেক মানুষ নিজের পছন্দ ও কর্মের মাধ্যমে একটি পথ বেছে নেয় এবং সেই পথেরই পরিণতি লাভ করে।
সূরা আল-লাইল আমাদের সামনে দুটি জীবনধারা স্পষ্ট করে দেয়। একদিকে রয়েছে দানশীলতা, তাকওয়া, সত্যের প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা; অন্যদিকে রয়েছে কৃপণতা, আত্মনির্ভরতার অহংকার, সত্যকে অস্বীকার এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। প্রথম পথের পরিণতি সহজতা ও কল্যাণ, আর দ্বিতীয় পথের পরিণতি কঠিনতা ও ক্ষতি।
রাত ও দিনের শপথ—জীবনের বৈচিত্র্যের শিক্ষা
সূরার শুরুতেই আল্লাহ বলেন—
“শপথ রাত্রির, যখন সে আচ্ছন্ন করে; শপথ দিনের, যখন সে আলোকিত হয়; এবং শপথ তাঁর, যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন।”
রাত ও দিন পরস্পরের বিপরীত হলেও উভয়ই আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন। রাত পৃথিবীকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়, আবার দিনের আলো সেই অন্ধকার দূর করে। এই পরিবর্তনের মধ্যে মানুষের জন্য চিন্তার শিক্ষা রয়েছে।
মানুষের জীবনেও কখনো স্বস্তি আসে, কখনো দুঃখ; কখনো আলো, কখনো অন্ধকার; কখনো সুযোগ, কখনো সংকট। কিন্তু একজন মুমিন জানে—জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিই আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমতের অধীন।
নর ও নারী—উভয়কেই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকের মর্যাদা, দায়িত্ব ও জবাবদিহির ক্ষেত্র আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত। মানুষের প্রকৃত সফলতা তার বাহ্যিক পরিচয়, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মে।
মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের
সূরার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো—
“নিশ্চয়ই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের।”
এই ছোট্ট আয়াতের মধ্যে মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর সত্য নিহিত রয়েছে। সবাই একই উদ্দেশ্যে জীবনযাপন করে না। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, কেউ শুধু দুনিয়ার সম্পদ চায়; কেউ মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে, কেউ নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করে।
একজন মানুষ কী বিশ্বাস করে, কী উদ্দেশ্যে কাজ করে এবং কীভাবে জীবন পরিচালনা করে—এসবের ওপর তার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে।
তাই শুধু ব্যস্ত থাকাই যথেষ্ট নয়; কোন কাজে ব্যস্ত আছি, কেন করছি এবং সেই কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য কি না—এসবও বিবেচনা করতে হবে।
সফল মানুষের তিনটি গুণ
সূরা আল-লাইল সফলতার একটি সুন্দর পথ দেখিয়েছে। আল্লাহ বলেন—
“কাজেই যে ব্যক্তি দান করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, আর উত্তম বিষয়কে সত্য বলে মানে, আমি তার জন্য সহজ পথ সুগম করে দেব।”
এখানে সফল মানুষের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে—
১. দানশীলতা
দান শুধু অর্থ দেওয়ার নাম নয়। প্রয়োজনমতো অর্থ, খাদ্য, পোশাক, সময়, শ্রম, জ্ঞান ও সহযোগিতা—সবই কল্যাণকর দানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
একজন মুমিন নিজের সম্পদকে শুধু নিজের ভোগের বস্তু মনে করে না। সে জানে, সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই অভাবী, অসহায়, আত্মীয়, প্রতিবেশী ও সমাজের প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তার নৈতিক দায়িত্ব।
দান মানুষের হৃদয়কে প্রশস্ত করে। কৃপণতা মানুষকে সংকীর্ণ করে, আর দানশীলতা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে।
২. তাকওয়া
দান করলেই হবে না; দানের সঙ্গে তাকওয়া থাকতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় ও শ্রদ্ধা করে তাঁর নির্দেশ মেনে চলতে হবে এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে হবে।
তাকওয়া মানুষের অন্তরের এমন এক শক্তি, যা তাকে গোপনেও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন—এই বিশ্বাস তাকে সৎ থাকতে সাহায্য করে।
৩. উত্তম বিষয়কে সত্য বলে গ্রহণ করা
মানুষের সঠিক বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের ভিত্তি হলো সত্যের প্রতি আনুগত্য। আল্লাহর দেওয়া হিদায়াত, তাঁর প্রতিশ্রুতি, আখিরাত, জান্নাত ও আল্লাহর বিধান—এসব সত্য বলে বিশ্বাস করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সত্যকে শুধু মুখে স্বীকার করলেই হবে না; জীবনেও তার প্রভাব প্রকাশ করতে হবে।
আল্লাহ সহজ পথ সুগম করে দেন
আল্লাহ বলেন—
“আমি তার জন্য সহজ পথ সুগম করে দেব।”
এখানে মানুষের জন্য গভীর আশার বার্তা রয়েছে। যে ব্যক্তি ঈমান, তাকওয়া, দানশীলতা ও সৎকর্মের পথ গ্রহণ করে, আল্লাহ তার জন্য কল্যাণের পথ সহজ করে দেন।
এর অর্থ এই নয় যে তার জীবনে কোনো কষ্ট থাকবে না। বরং মুমিনের জীবনেও পরীক্ষা, দুঃখ ও সংকট আসতে পারে। তবে আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য ও সৎকর্মের মাধ্যমে সে সঠিক পথে অবিচল থাকার তাওফিক লাভ করে।
তাই জীবনে কোনো কষ্ট এলেই হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং নিজের ঈমান, আমল ও উদ্দেশ্য পর্যালোচনা করে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
কৃপণতা ও আত্মতুষ্টির বিপদ
এরপর আল্লাহ বিপরীত পথের কথা বলেছেন—
“পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কৃপণতা করে এবং নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে, আর উত্তম বিষয়কে মিথ্যা বলে মনে করে, আমি তার জন্য কঠিন পথ সুগম করে দেব।”
কৃপণতা শুধু সম্পদ না দেওয়ার বিষয় নয়; এটি হৃদয়ের একটি সংকীর্ণতা। মানুষ যখন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে নিজের একান্ত মালিকানা মনে করে এবং অন্যের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে, তখন তার অন্তরে কৃপণতার জন্ম হয়।
আর “নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করা” বলতে এমন আত্মতুষ্টি বোঝায়, যেখানে মানুষ আল্লাহর প্রয়োজন অনুভব করে না, তাঁর বিধানের প্রতি উদাসীন হয়ে যায় এবং নিজের সামর্থ্যকে যথেষ্ট মনে করে।
সম্পদ, শিক্ষা, ক্ষমতা, পদ বা সামাজিক মর্যাদা—কোনোটিই মানুষকে আল্লাহর মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত করতে পারে না।
সম্পদ সব সমস্যার সমাধান নয়
আল্লাহ বলেন—
“যখন সে ধ্বংস হবে, তখন তার সম্পদ তার কোনো কাজে আসবে না।”
দুনিয়াতে সম্পদ প্রয়োজনীয় এবং হালালভাবে উপার্জন ও ব্যয় করা ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু সম্পদ মানুষের চূড়ান্ত সফলতার নিশ্চয়তা নয়।
মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সঙ্গে তার সম্পদের পাহাড় যায় না। তার সঙ্গে থাকে তার ঈমান ও আমল। তাই সম্পদ অর্জন করা দোষ নয়; বরং সম্পদকে জীবনের উদ্দেশ্য বানানো বিপজ্জনক।
সম্পদ যদি মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য, দানশীলতা ও মানবসেবায় উৎসাহিত করে, তবে তা কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সম্পদ যদি অহংকার, কৃপণতা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করার কারণ হয়, তবে তা মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হিদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে
সূরা আল-লাইল ঘোষণা করে—
“পথনির্দেশ করা তো আমারই দায়িত্ব।”
মানুষের জন্য আল্লাহ হিদায়াতের পথ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন।
মানুষের দায়িত্ব হলো সেই হিদায়াত গ্রহণ করা, সত্য অনুসরণ করা এবং আল্লাহর কাছে সঠিক পথে থাকার তাওফিক চাওয়া।
একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তাই—আল্লাহ যেন তাকে সত্য বুঝতে, সত্য গ্রহণ করতে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকতে সাহায্য করেন।
দুনিয়া ও আখিরাত—সবই আল্লাহর মালিকানাধীন
আল্লাহ বলেন—
“আর পরকাল ও ইহকাল আমারই মালিকানাধীন।”
মানুষ দুনিয়ার জীবনে যত কিছু অর্জন করুক, প্রকৃত মালিক আল্লাহ। জীবন, সম্পদ, সময়, জ্ঞান, শক্তি—সবই তাঁর দেওয়া নিয়ামত।
আবার আখিরাতও তাঁরই অধীন। সেখানে মানুষের কর্মের হিসাব হবে এবং প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
এই বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল করে। সে জানে—কোনো ভালো কাজই আল্লাহর কাছে হারিয়ে যাবে না এবং কোনো অন্যায়ও জবাবদিহির বাইরে থাকবে না।
জাহান্নামের সতর্কবার্তা
সূরায় কঠিন সতর্কবার্তা এসেছে—
“কাজেই আমি তোমাদেরকে এক দপদপে আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছি।”
ইসলামের শিক্ষা শুধু সুসংবাদ দেয় না; মানুষকে সতর্কও করে। কারণ মানুষ যদি নিজের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন না হয়, তাহলে সে পাপ ও অবাধ্যতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
জাহান্নামের ভয় মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে এবং তাকে অন্যায় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। তাই একজন মুমিনের জীবনে আশা ও ভয়—দুটিই থাকা প্রয়োজন। সে আল্লাহর রহমতের আশা রাখে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।
কারা সেই কঠিন পরিণতির পথে?
সূরায় বলা হয়েছে, সেখানে প্রবেশ করবে সেই চরম হতভাগা—
“যে অস্বীকার করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
অর্থাৎ সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তা অস্বীকার করা এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ভয়াবহ পরিণতির কারণ।
এখানে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো—সত্য জানার পর তা মেনে নেওয়া এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি। জ্ঞান যদি আমলে পরিণত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান মানুষের প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
তাকওয়াবান ব্যক্তির পরিচয়
সূরার পরবর্তী অংশে আল্লাহ বলেন—
“আর তা থেকে দূরে রাখা হবে এমন ব্যক্তিকে, যে আল্লাহকে খুব বেশি ভয় করে।”
তাকওয়াবান মানুষ আল্লাহকে ভয় করে অন্যায় থেকে দূরে থাকে। সে মানুষের প্রশংসার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ করে।
তার অন্তরে থাকে বিনয়, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির অনুভূতি। সে জানে—মানুষকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।
দানের প্রকৃত সৌন্দর্য
আল্লাহ বলেন—
“যে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজের ধন-সম্পদ দান করে।”
এখানে দানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। দান শুধু সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য নয়, লোকদেখানোর জন্য নয়, প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত।
দান মানুষের সম্পদকে পবিত্র করার পাশাপাশি তার অন্তরকেও পরিশুদ্ধ করে। এটি মানুষের মধ্যে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, স্বার্থপরতার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং কঠোরতার পরিবর্তে মমতা সৃষ্টি করে।
প্রতিদানের প্রত্যাশা নয়—আল্লাহর সন্তুষ্টিই লক্ষ্য
সূরা আল-লাইলের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষাগুলোর একটি হলো—
“সে দান করে তার ওপর কারো কোনো অনুগ্রহের প্রতিদান হিসেবে নয়; একমাত্র তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির আশায়।”
এটি নিঃস্বার্থতার আদর্শ শিক্ষা।
কেউ আমাদের উপকার করেছে—তার প্রতিদান দেওয়া অবশ্যই ভালো। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা দানের সৌন্দর্য হলো, সেখানে মানুষের কাছ থেকে প্রতিদানের প্রত্যাশা থাকে না।
সৎকর্মের মূল্য তখনই গভীর হয়, যখন মানুষ মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
লোকদেখানো থেকে সতর্কতা
মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো—ভালো কাজ করেও প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা। ইসলামে আমলের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
তাই দান করার সময় মনে রাখতে হবে—আমি কেন দিচ্ছি? মানুষের প্রশংসার জন্য, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য?
একই কাজ বাহ্যিকভাবে ভালো হলেও নিয়ত ভিন্ন হলে তার মূল্যও ভিন্ন হতে পারে। তাই সৎকর্মের পাশাপাশি অন্তরের সংশোধন জরুরি।
আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সফলতা
সূরার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন—
“সে অবশ্যই অতি শীঘ্র সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।”
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সত্যকে গ্রহণ করে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ রয়েছে।
মানুষ দুনিয়াতে অনেক কিছু চায়—অর্থ, বাড়ি, সম্মান, পদ, সম্পদ ও সুখ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত সফলতা নয়।
চূড়ান্ত সফলতা হলো—আল্লাহ সন্তুষ্ট হওয়া এবং আখিরাতে তাঁর রহমত লাভ করা।
ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সূরা আল-লাইলের শিক্ষা
সূরা আল-লাইল শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; এটি সুন্দর সমাজ গঠনের পথও দেখায়।
যদি সমাজে দানশীলতা বাড়ে, তাহলে অসহায় মানুষের কষ্ট কমে।
যদি তাকওয়া বাড়ে, তাহলে অন্যায় ও দুর্নীতি কমে।
যদি সত্যের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে, তাহলে প্রতারণা ও মিথ্যাচার কমে।
যদি কৃপণতা কমে, তাহলে মানুষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ে।
যদি আল্লাহর জবাবদিহির ভয় থাকে, তাহলে মানুষ গোপনেও অন্যায় করতে ভয় পায়।
পরিবারে এই শিক্ষা প্রয়োগ করলে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সহযোগিতা ও মমতা বাড়তে পারে। কর্মক্ষেত্রে সততা, সমাজে ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা গড়ে উঠতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
আজকের তরুণ সমাজের সামনে নানা ধরনের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্পদ, প্রযুক্তি, বিনোদন ও প্রতিযোগিতার ভিড়ে অনেক সময় জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়।
সূরা আল-লাইল তরুণদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু ভোগের জন্য নয়; জীবন একটি আমানত এবং প্রতিটি কর্মের হিসাব আছে।
তাই তরুণদের উচিত—
- জ্ঞান অর্জন করা;
- হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা করা;
- বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ করা;
- অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো;
- অপচয় ও কৃপণতা উভয়ই বর্জন করা;
- সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা;
- আল্লাহর ওপর ভরসা করা;
- নিজের নিয়ত সংশোধন করা;
- সময়কে মূল্য দেওয়া;
- আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া।
দুনিয়ার সাফল্য ও আখিরাতের সাফল্য
ইসলাম দুনিয়ার বৈধ সাফল্যকে নিষেধ করে না। শিক্ষা, কর্ম, ব্যবসা, পরিবার, সমাজসেবা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি করা যায়। তবে দুনিয়ার সাফল্য যেন আখিরাতের ক্ষতির কারণ না হয়।
একজন মুমিনের আদর্শ জীবন হলো—হালাল উপার্জন করবে, দায়িত্ব পালন করবে, পরিবারকে দেখবে, মানুষের উপকার করবে, নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে এবং একই সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে রাখবে।
তাই সম্পদ থাকবে হাতে, হৃদয়ে নয়; দুনিয়া থাকবে জীবনের প্রয়োজন হিসেবে, জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে নয়।
আমাদের করণীয়
সূরা আল-লাইলের শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—
প্রথমত, ঈমানকে দৃঢ় করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া অর্জন করতে হবে।
তৃতীয়ত, সামর্থ্য অনুযায়ী দান ও সহযোগিতা করতে হবে।
চতুর্থত, কৃপণতা ও স্বার্থপরতা থেকে বাঁচতে হবে।
পঞ্চমত, সত্যকে গ্রহণ করে তার ওপর আমল করতে হবে।
ষষ্ঠত, সম্পদকে জীবনের একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি মনে করা যাবে না।
সপ্তমত, ভালো কাজের ক্ষেত্রে নিয়ত শুদ্ধ রাখতে হবে।
অষ্টমত, আল্লাহর হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকার জন্য নিয়মিত দোয়া করতে হবে।
নবমত, দুনিয়ার জীবনের পাশাপাশি আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।
দশমত, মানুষের অধিকার রক্ষা করে সমাজে কল্যাণ ও ন্যায়ের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
সূরা আল-লাইল মানুষের সামনে জীবনের দুটি স্পষ্ট পথ তুলে ধরে—একটি ঈমান, তাকওয়া, দানশীলতা ও সত্যের পথ; অন্যটি কৃপণতা, আত্মতুষ্টি, সত্য অস্বীকার ও অবাধ্যতার পথ।
রাত যেমন দিনের বিপরীত, তেমনি মানুষের কর্মপথও পরস্পর ভিন্ন। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন সাজায়, কেউ দুনিয়ার মোহে নিজের আখিরাত ভুলে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
সুতরাং আমাদের জীবন যেন শুধু সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা না হয়; বরং ঈমান, আমল, মানবিকতা, দানশীলতা, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাধনায় পরিণত হয়।
আমরা যেন কৃপণতার সংকীর্ণতা ছেড়ে দানের সৌন্দর্য গ্রহণ করি, অহংকার ছেড়ে তাকওয়া অবলম্বন করি, সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে সত্যের অনুসারী হই এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার জন্য প্রস্তুতি নিই।
সূরা আল-লাইলের শিক্ষা আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলুক—সৎকর্মের পথ বেছে নেওয়ার সাহস, আল্লাহর পথে দান করার মানসিকতা, তাকওয়ার আলো এবং আখিরাতের সফলতার প্রত্যাশা।
হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করো, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করো, কৃপণতা ও অহংকার থেকে রক্ষা করো, হালাল রিজিকে বরকত দাও, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দাও এবং তোমার সন্তুষ্টির পথে অবিচল রাখো। আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতকে কল্যাণময় করো।
আমিন।
১
১ মন্তব্য