সহকারী অধ্যাপক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩১ পূর্বাহ্ণ
নফসের শুদ্ধিতেই সফলতা -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
নফসের শুদ্ধিতেই সফলতা
(সূরা আশ-শামসের আলোকে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও অবাধ্যতার পরিণতি)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, করি আজ শুরু,
তাঁরই দয়া জীবনজুড়ে, তিনিই সত্য গুরু।
সূরা শামসের বাণী নিয়ে জাগুক অন্তর-প্রাণ,
আত্মশুদ্ধির পথে চলুক মুমিনের অভিযান।
সূর্যের শপথ, তারই আলো, দীপ্তিময় কিরণ,
চন্দ্র যখন সূর্য অনুসরণ করে সারাক্ষণ।
দিনের শপথ—সূর্য যখন প্রকাশ করে আলো,
রাত্রি এসে ঢেকে ফেলে দিনের দীপ্তি ভালো।
আকাশের শপথ, যিনি তাকে করেছেন নির্মাণ,
পৃথিবীরও শপথ, যিনি বিস্তৃত করেছেন স্থান।
প্রাণের শপথ, যিনি তাকে গড়েছেন সুনিপুণ,
দেহের মাঝে দিয়েছেন প্রাণ, করেছেন তাকে গুণময়।
মানুষের অন্তরে দিয়েছেন ভালো-মন্দ জ্ঞান,
সৎপথ আর অসৎপথের চিনিয়েছেন সন্ধান।
ভালো পথে এগিয়ে গেলে হৃদয় হয় নির্মল,
পাপের পথে পা বাড়ালে অন্তর হয় বিকল।
নিজেকে যে পবিত্র রাখে, সফল সে-ই হয়,
তাকওয়া যার জীবনের পথ, আল্লাহ তার সহায়।
নফসকে যে শাসন করে, পাপ থেকে রাখে দূর,
তার জীবন আলোকিত হয়, অন্তর থাকে নূর।
লোভ-হিংসা-অহংকার আর মিথ্যা থেকে সরে,
হারাম ছেড়ে হালাল পথে চলে যে অন্তরে।
তওবা করে ভুলের পরে রবের দিকে ফেরে,
আল্লাহর রহমত তারই জীবন ঘিরে ধরে।
কিন্তু যে নিজ আত্মাকে পাপে করে কলুষিত,
অবাধ্যতার অন্ধকারে করে জীবন মলিন।
দুনিয়ার মোহে সত্য ছেড়ে হারায় ন্যায়ের পথ,
অবশেষে তারই সামনে খুলে যায় ক্ষতির রথ।
মানুষ ভাবে—আমি শক্ত, আমার কে বা কী করে?
ক্ষমতা আর সম্পদ নিয়ে অহংকারে মরে।
কিন্তু কত শক্তিশালী জাতি কালের স্রোতে গেছে,
অবাধ্যতার পরিণামে ধ্বংস হয়ে মিশেছে।
সামুদের সেই জাতির কথা স্মরণ করো আজ,
অবাধ্যতায় অন্ধ হয়ে হারিয়েছিল লাজ।
সালেহ (আ.) ছিলেন তাদের সত্যের পথের দূত,
তাঁর আহ্বানে ফিরতে বললেন—ছাড়ো পাপের স্রোত।
আল্লাহর নিদর্শন এসেছিল উটের রূপে তাদের,
পরীক্ষা ছিল তাদের জন্য, মানতে হবে বিধান তাঁর।
সালেহ (আ.) বললেন—এটি আল্লাহর নিদর্শন,
তার অধিকার রক্ষা করো, করো না অবমানন।
পানির ব্যাপারেও ছিল নির্ধারিত অধিকার,
আল্লাহর বিধান মানাই ছিল তাদের দায়িত্বভার।
কিন্তু তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করল অহংকারে,
বিদ্রোহের বিষ ঢেলে দিল নিজেদেরই অন্তরে।
তাদের মাঝে এক দুর্ভাগা ব্যক্তি উঠল শেষে,
অপরাধের কাজে সে এগিয়ে গেল হিংস্র বেশে।
আল্লাহর উট হত্যা করে করল সীমালঙ্ঘন,
সত্যের প্রতি অবমাননা—ভয়াবহ সেই কর্ম।
সালেহ (আ.) সতর্ক করলেন—এ পথ ছেড়ে দাও,
আল্লাহর বিধান মানো, তাঁর রহমত পেতে চাও।
কিন্তু তারা শুনল না আর সত্যের কোনো বাণী,
অবাধ্যতার পথেই তারা করল শেষ যাত্রাখানি।
পাপের পরে তওবার দুয়ার খোলা থাকে সদা,
রবের দিকে ফিরে এলে মুছে যেতে পারে গুনাহ।
কিন্তু জেদে সত্য অস্বীকার, সীমালঙ্ঘন, বিদ্রোহ,
মানুষকে যে ধ্বংস করে—এটাই চরম শিক্ষা।
সামুদের সেই কাহিনি তাই শুধু অতীত নয়,
আজও তার সতর্কবাণী মানুষের জন্য রয়।
ক্ষমতা পেয়ে অন্যায় কোরো না কোনোদিন,
সত্য জেনে অস্বীকার কোরো না অবিবেচনাহীন।
নফস যদি বলে—“আমি বড়, আমিই সবার শ্রেষ্ঠ,”
মনে রেখো, আল্লাহর কাছে তাকওয়াই হলো শ্রেষ্ঠ।
ধন-সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, বাহ্যিক কোনো মান,
আল্লাহর কাছে মূল্য পায় না—মূল্য পায় ঈমান।
জিহ্বা যদি মিথ্যা বলে, অন্তর হয় কালো,
চোখ যদি হারামে ফেরে, নিভে যায় তার আলো।
হৃদয় যদি হিংসায় ভরে, শান্তি থাকে না আর,
ক্ষমা, দয়া, সত্য, তাকওয়া—এগুলোই অহংকারহীন অলংকার।
নিজেকে তাই প্রতিদিনই করতে হবে প্রশ্ন,
আজকে আমার কাজে কতটা রয়েছে হক-চিন্তন?
কথায় কি আমি সত্য বলি? কাজে কি ন্যায় রাখি?
অন্যের হক নষ্ট করে নিজের সুখ কি চাই?
নামাজ যদি জীবনের প্রাণ, কুরআন যদি আলো,
তবে কেন পাপের পথে মন ছুটে যায় কালো?
সালাত মানুষকে স্মরণ করায় রবের মহিমা,
তাকওয়া জাগে অন্তরে, কমে পাপের সীমা।
সিয়াম শেখায় সংযমের দীপ্ত মহাশিক্ষা,
দান শেখায় অসহায়ের পাশে থাকার দীক্ষা।
তওবা শেখায় ভুলের পরে রবের দিকে ফেরা,
ইস্তিগফার ধুয়ে দেয় অন্তরের বহু ময়লা-জরা।
সত্য পথে কষ্ট এলেও পিছিয়ে যেও না,
অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে দিয়ো না।
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে দেন হিদায়াত,
সৎকর্মে রাখেন স্থির, দেন অন্তরে প্রশান্তি-সান্ত্বনা।
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, একদিন হবে শেষ,
কবরের পথে যেতে হবে, থাকবে না কোনো বেশ।
সম্পদ, পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি—সবই হবে ক্ষয়,
সঙ্গে যাবে ঈমান আর আমল—অন্য কিছু নয়।
তাই আজই নিজেকে গড়ো, সময় থাকতে ভাই,
মৃত্যু কখন আসবে কারও জানা তো নেই তাই।
আজকের সুযোগ কালকে হয়তো থাকবে না আর,
তওবার পথে ফিরে এসো, এটাই শ্রেষ্ঠ ভার।
সূরা শামস শেখায় আমাদের—নিজেকে করো শুদ্ধ,
অন্তর থেকে দূর করো সব পাপের বিষবীজ।
সৎকাজ দিয়ে জীবন সাজাও, সত্যকে করো সাথি,
আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলো ন্যায়ের পথে যথাযথই।
যে হৃদয়ে তাকওয়া জাগে, সে হৃদয় হয় নির্মল,
মানুষের প্রতি দয়া জাগে, আচরণ হয় কোমল।
অন্যের দুঃখে কাঁদে সে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ায়,
আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় নেক কাজে নিজেকে হারায়।
যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সফলতার পথে যায়,
দুনিয়াতেও শান্তি পায়, আখিরাতেও কল্যাণ পায়।
আর যে নফসের দাস হয়ে পাপকে করে প্রিয়,
সে নিজের হাতেই ডেকে আনে ক্ষতির কঠিন নীড়।
হে রব, আমাদের অন্তর করো সত্যের আলোয় ভরা,
পাপ থেকে ফিরিয়ে নাও, দাও তওবার পথ ধরা।
অহংকার থেকে বাঁচাও, হিংসা-বিদ্বেষ করো দূর,
কুরআন-সুন্নাহর পথে রাখো, অন্তর করো নূর।
সামুদের কাহিনি থেকে শিক্ষা নিতে দাও,
অবাধ্যতার ভয়াবহতা হৃদয়ে বুঝতে দাও।
সত্য যখন সামনে আসে, সত্য যেন মানি,
অন্যায় দেখে নীরব না হই—এ হোক জীবনের বাণী।
হে আল্লাহ, নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে দাও শক্তি,
সৎকর্মে রাখো অবিচল, দাও ঈমানের ভক্তি।
জীবনের প্রতিটি কাজে তোমার ভয় যেন রয়,
তোমার সন্তুষ্টিই হোক আমাদের জীবনের জয়।
সূর্যের মতো সত্যের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রাণে,
কুরআনের হিদায়াত জাগুক মানুষের অন্তঃস্থানে।
দিন-রাত্রির পরিবর্তনে স্মরণ করি তোমার কুদরত,
আকাশ-পৃথিবী সাক্ষ্য দিক—তুমিই পরম মহাশক্তিমান।
নিজেকে যে শুদ্ধ করে—তার জীবন হোক সফল,
সৎপথে যে অটল থাকে—তার হৃদয় হোক নির্মল।
পাপের পথে যে না যায়, সত্যকে করে মান্য,
আখিরাতে তার জন্য থাকুক রবের অনন্ত ধন্য।
এই হোক আজ প্রত্যয় আমাদের, এই হোক অঙ্গীকার,
আল্লাহর বিধান মানব—এটাই জীবনের অধিকার।
নফসকে রাখব নিয়ন্ত্রণে, সত্যকে রাখব বুকে,
রবের দিকে ফিরব সদা, জীবন যতই দুঃখে।
হে পরম দয়াময় আল্লাহ, দাও সরল পথের জ্ঞান,
দাও আমাদের শুদ্ধ অন্তর, দৃঢ় ঈমান ও আমলদান।
তোমার রহমত ছাড়া প্রভু কে-ই বা আমাদের ত্রাণ?
তোমার সন্তুষ্টিই হোক আমাদের জীবনের পরম সম্মান।
হে আল্লাহ, আমাদের আত্মাকে পবিত্র করার তৌফিক দাও,
সত্যের পথে অবিচল রাখো, পাপ থেকে দূরে রাখো,
কুরআন-সুন্নাহর আলোয় জীবন গড়ার তৌফিক দাও।
আমাদের ঈমান, আমল ও অন্তর কবুল করো—
আমিন।
১৪
২৪ মন্তব্য