Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

পড়ো তোমার রবের নামে -সূরা আল-আলাকের আলোকে

পড়ো তোমার রবের নামে

(সূরা আল-আলাকের আলোকে জ্ঞান, ঈমান, বিনয়, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্যের শিক্ষা)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ হিদায়াত। এই মহাগ্রন্থের প্রথম অবতীর্ণ বাণীর সূচনাই হয়েছে জ্ঞান ও শিক্ষার আহ্বান দিয়ে—“পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতে একদিকে যেমন মানুষকে জ্ঞান অর্জনের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে—মানুষের সৃষ্টি, জ্ঞান, মর্যাদা ও সামর্থ্যের মূল উৎস আল্লাহ তাআলা।

সূরাটির পরবর্তী আয়াতগুলোতে মানুষের একটি বিপজ্জনক দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে—মানুষ যখন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অভাবমুক্ত মনে করে, তখন সে সীমালঙ্ঘন করতে পারে। অথচ তার চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন তার রবের কাছেই। তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিনয়, তাকওয়া, সালাত, আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির অনুভূতি থাকা অপরিহার্য।

সূরা আল-আলাক যেন মানুষকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপথ দেখায়—সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার পরিচয়, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের আলো, জ্ঞান থেকে ঈমান, ঈমান থেকে আমল, আমল থেকে তাকওয়া এবং তাকওয়া থেকে আল্লাহর নৈকট্য।

“পড়ো”—ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক আহ্বান

সূরার শুরুতেই মহান আল্লাহ বলেন—

“পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”

এখানে “পড়ো” শব্দটি শুধু অক্ষর পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান অর্জন, চিন্তা করা, বোঝা, উপলব্ধি করা এবং সত্যকে অনুসরণ করার ব্যাপক আহ্বান এতে নিহিত।

তবে এই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে—“তোমার রবের নামে।”

অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন হবে আল্লাহকে ভুলে নয়, বরং আল্লাহকে স্মরণ করে। জ্ঞান হবে সত্য ও কল্যাণের পথে ব্যবহারের জন্য। এমন জ্ঞান নয়, যা মানুষকে অহংকারী করে তোলে; বরং এমন জ্ঞান, যা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখায় এবং স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

জ্ঞান মানুষের মর্যাদা বাড়ায়, কিন্তু জ্ঞান যদি বিনয় ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে তা মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই ইসলামের জ্ঞানচর্চার সঙ্গে ঈমান, আমল ও চরিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

মানুষের সৃষ্টি—নিজের দুর্বলতা স্মরণ করার শিক্ষা

মহান আল্লাহ বলেন—

“সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে।”

মানুষ যত বড় জ্ঞানী হোক, যত সম্পদশালী হোক, যত ক্ষমতাবান হোক—তার সূচনা ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও দুর্বল অবস্থা থেকে।

এই স্মরণ মানুষকে বিনয়ী করে। যে মানুষ নিজের সৃষ্টির সূচনা স্মরণ করে, সে অহংকার করার কারণ খুঁজে পায় না। মানুষের দেহ, জীবন, মেধা, শক্তি, সৌন্দর্য, সম্পদ—সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত।

তাই মানুষের উচিত নিজের সামর্থ্য নিয়ে অহংকার না করে নিয়ামতের দাতা আল্লাহকে স্মরণ করা।

আল্লাহই সর্বাধিক সম্মানিত দাতা

এরপর বলা হয়েছে—

“পড়ো, আর তোমার রব মহামহিমান্বিত।”

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি অসীম অনুগ্রহ করেন। মানুষ যা জানে, যা বোঝে, যা করতে পারে—সবই আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্যের মাধ্যমে।

মানুষ জন্মের সময় অনেক কিছুই জানে না। ধীরে ধীরে সে ভাষা শেখে, চিনতে শেখে, লিখতে শেখে, পড়তে শেখে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্যও আল্লাহর দান।

তাই জ্ঞান অর্জনকারী মানুষের উচিত জ্ঞানের কারণে অহংকারী না হয়ে আরও বিনয়ী হওয়া এবং বলা—

আল্লাহ আমাকে জ্ঞান দিয়েছেন; তাই এই জ্ঞান তাঁর সন্তুষ্টির পথে কাজে লাগাতে হবে।

কলম ও জ্ঞানের মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন—

“যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।”

কলম জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি কলমের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, গবেষণা ও শিক্ষা সংরক্ষিত হতে পারে।

আজকের পৃথিবীতে বই, খাতা, গবেষণাপত্র, শিক্ষা-উপকরণ ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত মাধ্যমে জ্ঞান সংরক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু মূলনীতি একই—জ্ঞান সংরক্ষণ করতে হবে এবং কল্যাণকর জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

একজন শিক্ষক যখন জ্ঞান দেন, একজন শিক্ষার্থী যখন জ্ঞান অর্জন করে, একজন লেখক যখন উপকারী কিছু লেখেন, তখন জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা হয়।

তবে জ্ঞানের সঙ্গে আমল ও নৈতিকতা না থাকলে সেই জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না।

অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের আলোয়

আল্লাহ বলেন—

“তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।”

এই আয়াত মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মানুষ যা জানে, তা সীমিত; আর আল্লাহর জ্ঞান অসীম। মানুষ যত জ্ঞান অর্জনই করুক, তার অজানা জগত আরও বিস্তৃত থেকে যায়।

তাই প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি অহংকারী হয় না। সে জানে—
আমার জানা সীমিত, আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন।

এই উপলব্ধি মানুষকে সত্য অনুসন্ধানী, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করে তোলে।

জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক

সূরা আল-আলাকের শুরুতে জ্ঞানের কথা বলা হলেও এই জ্ঞানকে ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। বরং “তোমার রবের নামে” পড়ার নির্দেশের মাধ্যমে জ্ঞানকে স্রষ্টার পরিচয় ও তাঁর আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ইসলামে জ্ঞান এমন একটি আলো, যা মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও হক-বাতিলের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে।

তাই একজন মুসলিমের জ্ঞানচর্চার লক্ষ্য হওয়া উচিত—

  • আল্লাহকে চেনা,

  • সত্যকে গ্রহণ করা,

  • নিজের দায়িত্ব বোঝা,

  • মানুষের উপকার করা,

  • অন্যায় থেকে দূরে থাকা,

  • ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।

মানুষ কেন সীমালঙ্ঘন করে?

সূরার ষষ্ঠ ও সপ্তম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন—

“কখনোই নয়! মানুষ অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করে—এ কারণে যে সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।”

এখানে মানুষের অন্তরের একটি বড় রোগ তুলে ধরা হয়েছে—অহংকার ও আত্মনির্ভরতার ভ্রান্ত অনুভূতি।

মানুষ যখন সম্পদ পায়, ক্ষমতা পায়, জ্ঞান পায়, পদ-মর্যাদা পায়, তখন কখনো কখনো সে ভুলে যায়—এসবই আল্লাহর দেওয়া।

সে মনে করতে শুরু করে—

“আমি যা চাই তাই করতে পারি।”
“
আমাকে কেউ থামাতে পারবে না।”
“
আমার সম্পদই আমার শক্তি।”
“
আমার ক্ষমতাই আমার নিরাপত্তা।”

এই মানসিকতা মানুষকে সীমালঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই

মহান আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই তোমার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন।”

এটি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

দুনিয়ার জীবন যত দীর্ঘই মনে হোক, একদিন তা শেষ হবে। সম্পদ থাকবে, কিন্তু মানুষ থাকবে না; ঘর থাকবে, কিন্তু বাসিন্দা থাকবে না; পদ থাকবে, কিন্তু পদধারী থাকবে না; দুনিয়ার পরিচয় থাকবে, কিন্তু মানুষ চলে যাবে তার রবের কাছে।

সুতরাং মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব আছে—এই বিশ্বাস তাকে দায়িত্বশীল করে।

আজ আমরা যা বলছি, যা করছি, যেভাবে মানুষের সঙ্গে আচরণ করছি—সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।

“সে কি জানে না যে আল্লাহ দেখেন?”

সূরা আল-আলাকের অন্যতম গভীর শিক্ষা হলো—

“সে কি জানে না যে আল্লাহ দেখেন?”

মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া সম্ভব নয়।

ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও আল্লাহ দেখেন।
মানুষের কাছ থেকে কোনো কথা গোপন থাকলেও আল্লাহ জানেন।
অন্ধকার রাতেও আল্লাহ দেখেন।
নির্জন স্থানেও আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী।

এই বিশ্বাস একজন মুমিনের অন্তরে মুরাকাবা—অর্থাৎ আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি সৃষ্টি করে।

তখন সে একা থাকলেও অন্যায় করতে ভয় পায়। কারণ তার কাছে মানুষের ভয় নয়, আল্লাহর জবাবদিহিই বড়।

সালাতের পথে বাধা দেওয়া কত ভয়াবহ

সূরার নবম ও দশম আয়াতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে একজন বান্দাকে সালাত আদায় করতে বাধা দেয়।

সালাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই আল্লাহর বান্দাকে সালাত থেকে বিরত রাখা বা আল্লাহর ইবাদতের পথে বাধা সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুতর অন্যায়।

একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজে সালাত প্রতিষ্ঠা করা এবং পরিবার ও সমাজে কল্যাণকরভাবে সালাতের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

তবে দাওয়াতের পদ্ধতিও হতে হবে হিকমত, সুন্দর আচরণ ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।

হিদায়াত ও তাকওয়ার পথে আহ্বান

আল্লাহ বলেন—

“যদি সে সঠিক পথে থাকে অথবা তাকওয়ার নির্দেশ দেয়?”

এখানে হিদায়াত ও তাকওয়ার মর্যাদা স্পষ্ট হয়েছে।

তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি গভীর সচেতনতা ও তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা।

তাকওয়াবান মানুষ জানে—

আমি আল্লাহর বান্দা।
আমার জীবনের উদ্দেশ্য আছে।
আমার প্রতিটি কাজের জবাবদিহি আছে।
তাই আমাকে হালাল-হারাম, সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের সীমা মেনে চলতে হবে।

অহংকারের বিপরীতে বিনয়

সূরা আল-আলাকের শিক্ষা মানুষকে একদিকে জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানায়, অন্যদিকে জ্ঞানের কারণে অহংকারী হতে নিষেধ করে।

একজন মানুষ যত জ্ঞানী হবে, তার বিনয় তত বাড়া উচিত।

কারণ জ্ঞান তাকে বুঝিয়ে দেয়—
সে কত অল্প জানে, আর আল্লাহ কত মহান ও সর্বজ্ঞ।

একজন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের আচরণে তাই অহংকার নয়, বরং বিনয়, ভদ্রতা, সহনশীলতা ও সত্য গ্রহণের মানসিকতা প্রকাশ পায়।

ক্ষমতা ও সম্পদ মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়

মানুষের সামাজিক মর্যাদা, অর্থ, পদ, বাড়ি, গাড়ি কিংবা ক্ষমতা তার প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়।

এসব দুনিয়ার সাময়িক বিষয়।

মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ঈমান, তাকওয়া, সৎকর্ম ও উত্তম চরিত্রে।

তাই সম্পদ পাওয়া গেলে শুকরিয়া করতে হবে; ক্ষমতা পাওয়া গেলে দায়িত্বশীল হতে হবে; জ্ঞান পাওয়া গেলে তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।

নিয়ামত যত বাড়বে, দায়িত্বও তত বাড়বে।

অন্যায়ের সামনে সত্যের পথে অবিচল থাকা

সূরার শেষ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা নবী ﷺ-কে নির্দেশ দেন—

“কখনোই নয়! তুমি তার কথা শুনো না; সিজদা করো এবং নৈকট্য অর্জন করো।”

এখানে সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা রয়েছে।

অন্য কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিরত রাখতে চায়, তবে মুমিন তার কথায় সত্যের পথ ছেড়ে দেবে না।

বরং সে আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকবে।

এই অবিচলতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো—সিজদা।

সিজদা—রবের নৈকট্যের পথ

সূরার শেষ নির্দেশ—

“সিজদা করো এবং নৈকট্য অর্জন করো।”

সিজদা হলো বান্দার বিনয়ের সর্বোচ্চ প্রকাশ। মানুষ যখন সিজদায় যায়, তখন সে তার অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও দুনিয়াবি বড়ত্বকে পেছনে রেখে আল্লাহর সামনে মাথা নত করে।

সিজদা মানুষকে শেখায়—

আমি আল্লাহর বান্দা।
আমার শক্তি সীমিত।
আমার জ্ঞান সীমিত।
আমার জীবন সীমিত।
আমার প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই।

তাই সিজদা শুধু শরীরের একটি ভঙ্গি নয়; এটি হৃদয়ের আত্মসমর্পণের প্রতীক।

আধুনিক জীবনে সূরা আল-আলাকের শিক্ষা

আজকের পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে। মানুষ মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে, অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করছে। কিন্তু জ্ঞান বৃদ্ধির সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা ও আল্লাহভীতি না বাড়ে, তবে সেই জ্ঞান মানুষের জন্য সবসময় কল্যাণ বয়ে আনবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাই আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রয়োজন—

জ্ঞান + ঈমান + নৈতিকতা + দায়িত্ববোধ + তাকওয়া।

শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই শিক্ষা নয়; সত্যবাদী হওয়া শিক্ষা।
শুধু বড় ডিগ্রি অর্জন করাই সাফল্য নয়; মানুষের হক আদায় করাও সাফল্য।
শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানা নয়; প্রযুক্তিকে কল্যাণে ব্যবহার করাও শিক্ষা।
শুধু সম্পদ অর্জন নয়; হালাল পথে সম্পদ অর্জন ও সঠিকভাবে ব্যয় করাও দায়িত্ব।

শিক্ষার্থী জীবনে সূরা আল-আলাকের বার্তা

একজন শিক্ষার্থীর জন্য সূরা আল-আলাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

তাকে পড়তে হবে—কিন্তু আল্লাহকে ভুলে নয়।
তাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে—কিন্তু অহংকারের জন্য নয়।
তাকে ভালো ফল করতে হবে—কিন্তু অসৎ পথে নয়।
তাকে বড় হতে হবে—কিন্তু মানুষের প্রতি অবজ্ঞা করে নয়।

একজন আদর্শ শিক্ষার্থী হবে জ্ঞানী, বিনয়ী, সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান।

সে জানবে—জ্ঞান আল্লাহর দান, তাই জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা তার দায়িত্ব।

শিক্ষকের জন্য শিক্ষা

সূরা আল-আলাকের “কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন” এবং “মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না”—এই শিক্ষা একজন শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

শিক্ষক শুধু বইয়ের তথ্য দেন না; তিনি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।

তাই একজন আদর্শ শিক্ষককে জ্ঞানদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করতে হবে।

শিক্ষক নিজেই যদি জ্ঞান, আমল ও উত্তম চরিত্রের আদর্শ হন, তাহলে তাঁর শিক্ষা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিবার ও সমাজে এর প্রয়োগ

সূরা আল-আলাকের শিক্ষা শুধু বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে।

পরিবারে আমরা যদি মনে রাখি—আল্লাহ দেখছেন, তাহলে অন্যায় কথা বলা, জুলুম করা, প্রতারণা করা কিংবা কারও অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করব।

ব্যবসায়ী মনে রাখবে—আল্লাহ দেখছেন।
শিক্ষক মনে রাখবেন—আল্লাহ দেখছেন।
শিক্ষার্থী মনে রাখবে—আল্লাহ দেখছেন।
কর্মচারী মনে রাখবে—আল্লাহ দেখছেন।
ক্ষমতাবান ব্যক্তি মনে রাখবে—আল্লাহ দেখছেন।

এই একটিমাত্র বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে অনেক অন্যায় থেকে রক্ষা করতে পারে।

সূরা আল-আলাকের মূল শিক্ষা একনজরে

সূরা আল-আলাক আমাদের শেখায়—

প্রথমত, জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জ্ঞান অর্জন করতে হবে আল্লাহর নামে ও তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

তৃতীয়ত, নিজের সৃষ্টি ও দুর্বলতা স্মরণ করে অহংকার থেকে দূরে থাকতে হবে।

চতুর্থত, জ্ঞান ও সামর্থ্যকে আল্লাহর দান হিসেবে স্বীকার করতে হবে।

পঞ্চমত, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।

ষষ্ঠত, মনে রাখতে হবে—চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই।

সপ্তমত, আল্লাহ সবকিছু দেখেন—এই বিশ্বাস হৃদয়ে জাগ্রত রাখতে হবে।

অষ্টমত, সালাত ও তাকওয়ার পথে অবিচল থাকতে হবে।

নবমত, অন্যায়ভাবে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত রাখার আহ্বান গ্রহণ করা যাবে না।

দশমত, সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।

উপসংহার

সূরা আল-আলাকের শুরু হয়েছে “পড়ো” নির্দেশ দিয়ে এবং শেষ হয়েছে “সিজদা করো ও নৈকট্য অর্জন করো” নির্দেশ দিয়ে। এর মধ্যে যেন মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনযাত্রার একটি সুন্দর শিক্ষা নিহিত রয়েছে।

পড়তে হবে—যাতে জ্ঞান আসে।
জ্ঞান অর্জন করতে হবে—যাতে সত্য বোঝা যায়।
সত্য বুঝতে হবে—যাতে ঈমান দৃঢ় হয়।
ঈমান দৃঢ় করতে হবে—যাতে আমল সুন্দর হয়।
আমল সুন্দর করতে হবে—যাতে তাকওয়া অর্জিত হয়।
আর তাকওয়ার পথে চলতে চলতে সিজদায় নত হতে হবে—যাতে রবের নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা যায়।

মানুষ যত জ্ঞানীই হোক, সে আল্লাহর বান্দা। যত ক্ষমতাবানই হোক, তার প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই। যত সম্পদশালীই হোক, সে আল্লাহর নিয়ামতের মুখাপেক্ষী। আর যত বড় মর্যাদার অধিকারীই হোক, তাকে একদিন তার রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।

তাই সূরা আল-আলাকের আহ্বান আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হোক—

জ্ঞান অর্জন করি, কিন্তু অহংকার নয়;
সত্য অনুসরণ করি, কিন্তু অবহেলা নয়;
সালাত প্রতিষ্ঠা করি, তাকওয়া অর্জন করি;
আল্লাহর সর্বদর্শিতা স্মরণ করি;
আর সিজদায় নত হয়ে তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি।

হে আল্লাহ! আমাদের উপকারী জ্ঞান দাও, জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দাও, অহংকার ও সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা করো, সালাত ও তাকওয়ার ওপর অটল রাখো এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের পথে পরিচালিত করো। আমিন।

 

মন্তব্য করুন