সহকারী অধ্যাপক
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরতম সৃষ্টির মর্যাদা ও সফলতার পথ (সূরা আত-ত্বীনের আলোকে
সুন্দরতম সৃষ্টির মর্যাদা ও সফলতার পথ
(সূরা আত-ত্বীনের আলোকে ঈমান, সৎকর্ম, চরিত্র ও আখিরাতের মহাগাথা)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
বিসমিল্লাহর নামে শুরু, পরম দয়াময়,
যাঁর দানে জগৎজুড়ে জীবনেরই জয়।
তাঁরই নামে জাগুক প্রাণ, তাঁরই নামে গান,
তাঁর হুকুমে জীবন হোক সত্যের সন্ধান।
তীন ও যায়তুনের শপথ—কুরআনের বাণী,
সৃষ্টির মাঝে ছড়িয়ে আছে কুদরতেরই জানি।
সীনাই পর্বত সাক্ষী হয়ে স্মরণ করায় পথ,
মক্কার সেই নিরাপদ নগর—পবিত্রতার রথ।
সৃষ্টিজগতের নিদর্শনে ভাবুক মুমিন মন,
স্রষ্টার মহিমা চিনে নিক প্রতিক্ষণ।
ফল, পর্বত, নগর—সবই কুদরতের চিহ্ন,
আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই নয় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
সুন্দরতম অবয়বে মানুষ—আল্লাহর সৃষ্টি,
দেহে দিলেন সৌন্দর্য, জ্ঞানে দিলেন দৃষ্টি।
চোখ দিলেন দেখার জন্য, কান দিলেন শুনি,
বুদ্ধি দিলেন সত্য বুঝে জীবনটাকে গড়ি।
জিহ্বা দিলেন কথা বলার, বিবেক দিলেন জ্ঞান,
সত্য-মিথ্যা বুঝতে দিলেন বোধের পরিমাণ।
হাত-পা দিলেন কর্ম করার, দিলেন পথের জ্ঞান,
এই নিয়ামত কাজে লাগাই—এই হোক অঙ্গীকার।
শুধু মুখের রূপে নয়, মানুষ বড় হয়,
সুন্দর চরিত্রে তার আসল পরিচয় রয়।
ঈমান যদি হৃদয়জুড়ে সত্য আলো জ্বালে,
মানুষ তখন উত্তম পথে আপন জীবন ঢালে।
সৌন্দর্য যদি অহংকারে অন্তর করে কালো,
তবে বাহির যতই সুন্দর, অন্তর থাকে কালো।
জ্ঞান যদি জুলুম শেখায়, সম্পদ যদি লুটে,
মানুষ তখন নিজের মর্যাদা নিজেই ফেলে ছুটে।
ক্ষমতা পেয়ে জুলুম করা মানুষের কাজ নয়,
সম্পদ পেয়ে হক নষ্ট করা কোনো গৌরব নয়।
কথার শক্তি পেয়েও যদি মিথ্যা বলা হয়,
তবে সেই শক্তি মানুষের কল্যাণ আনে না কভু।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু দেহের গঠনে নয়,
আল্লাহভীতি, সত্যনিষ্ঠায় মর্যাদা তার রয়।
লজ্জাশীলতা, দয়া, ক্ষমা, ন্যায় ও আমল,
এসব গুণেই আলোকিত হয় মানুষের জীবনতল।
যে হৃদয়ে রবের ভয়, সে হৃদয় হয় পবিত্র,
যে জীবনে নেক আমল, সে জীবন হয় চরিত্রময়।
সত্য পথে যে অবিচল, বিপদে যে ধৈর্য ধরে,
আল্লাহর রহমতের আশায় সে এগিয়ে যায় তরে।
মানুষ নেমে যেতে পারে সর্বনিম্নের দ্বারে,
যদি সত্য ছেড়ে দেয় সে প্রবৃত্তিরই টানে।
ঈমান হারিয়ে, পাপের পথে, অবাধ্যতার স্রোতে,
নিজের মর্যাদা হারায় মানুষ নিজেরই ভুলে।
অহংকার হৃদয় ঢাকে, মিথ্যা করে ক্ষয়,
হিংসা, জুলুম, প্রতারণাতে নষ্ট হয় পরিচয়।
অশ্লীলতা, অন্যায়, হক নষ্টের কালো ছায়া,
মানুষের সুন্দর জীবন করে অন্ধকারময় মায়া।
তবু রবের রহমতের দরজা কখনো বন্ধ নয়,
ঈমান নিয়ে ফিরে এলে আশা জাগে হৃদয়ময়।
তওবা করে সৎপথে যে নতুন জীবন গড়ে,
রবের রহমত তাকে ডাকে করুণারই ঘরে।
“যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে”—
তাদের জন্য পুরস্কার থাকে অফুরন্ত ভরে।
ঈমান হলো হৃদয়ের আলো, আমল তারই ফল,
দুটির মিলনেই সুন্দর হয় জীবনের সফল।
মুখে শুধু ঈমান বললেই দায়িত্ব শেষ নয়,
ঈমান তার প্রমাণ চায় কর্মের পরিচয়।
সত্য কথা, হালাল পথে জীবন পরিচালন,
নেক আমলের মাধ্যমে হোক ঈমানের প্রকাশন।
সালাত হবে জীবনের পবিত্রতার আলো,
রোজায় শিখি সংযম—হৃদয় করি ভালো।
কুরআনের বাণী নিয়ে জীবন করি গঠন,
জিকিরে প্রশান্ত হোক অন্তরেরই মন।
পিতা-মাতার সেবা হোক ভালোবাসার দান,
স্ত্রী-সন্তানের হক আদায় হোক জীবনের মান।
প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো,
আমানত রক্ষা, সত্য বলা—হোক জীবনের সাধনা।
শিক্ষক যদি নিষ্ঠাভরে জ্ঞানের আলো দেন,
শিক্ষার্থী যদি সেই জ্ঞান মানবকল্যাণে দেন,
ব্যবসায়ী যদি সততায় লেনদেনটি করেন,
তবে নেক নিয়তে এসবও সওয়াবের কারণ হয়।
কর্মক্ষেত্রে আমানত রক্ষা, দায়িত্বে অবিচল,
ন্যায়ের পথে থাকা—এও মহৎ আমল।
অন্যের হক ফিরিয়ে দেওয়া, জুলুম থেকে দূরে থাকা,
মুমিনের জীবনের এ-ই সত্য পথের শিক্ষা।
দুনিয়ার পুরস্কার ক্ষণিক, ক্ষণিক তার মান,
পদ-মর্যাদা, ধন-সম্পদ—সবই ক্ষণপ্রাণ।
আজ যে মানুষ সম্মানিত, কাল সে হবে ধূলি,
স্থায়ী শুধু রবের কাছে নেক আমলের মূলী।
যে সৎকর্ম গোপন রাতে রবের জন্য হয়,
তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে কখনো নষ্ট নয়।
মানুষ ভুলে যেতে পারে, ভুলে না মহান রব,
তাঁর কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি ভালো কাজ সব।
একদিন আসবে সেই দিন—হিসাব হবে সবার,
কর্মের খাতা খুলবে তখন প্রকাশ পাবে ভার।
কেউ লুকাতে পারবে না আর গোপন কোনো কাজ,
রবের জ্ঞানের বাইরে নয় মানুষের কোনো সাজ।
কিসে তবে অস্বীকার করবে প্রতিদান দিবস?
কুরআনের প্রশ্ন জাগায় হৃদয়ে গভীর রেশ।
আজ যে জীবন হাতে আছে, কাল তা থাকবে না,
মৃত্যুর পরে রবের কাছে ফিরে যেতে হবে সবার।
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল করে,
একাকীও সত্য থাকে, যখন কেউ তাকে না ধরে।
কেউ না দেখলেও জানে—রব তো দেখেন সব,
এই বিশ্বাসেই পাপ থেকে দূরে থাকে রবের বান্দা।
দুনিয়ার আদালতে অনেক কথা অগোচর রয়,
অনেক সত্য কখনো মানুষের চোখে ধরা নয়।
কিন্তু রবের আদালতে কিছুই গোপন নয়,
প্রকাশ্য-গোপন সবই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন?
এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে অবহেলিত মানবমন।
তিনি জানেন অন্তরের কথা, জানেন সব কর্ম,
তাঁর বিচারে প্রকাশ পাবে সত্যেরই মর্ম।
তাই জুলুম কোরো না কারও, নষ্ট কোরো না হক,
অন্যের অশ্রু দিয়ে গড়ো না সুখের কোনো লোক।
ক্ষমতা পেলে ন্যায় ধরো, সম্পদ পেলে দাও,
মানুষের প্রাপ্য ফিরিয়ে দিয়ে রবের সন্তোষ চাও।
পরিবারে হোক মমতা, কথায় থাকুক মান,
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের রাখুক অধিকার-সম্মান।
সন্তান যেন দেখে ঘরে সত্য, শিষ্টাচার,
পিতামাতার আচরণেই শেখে জীবনের আদর্শধার।
শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞানের সাথে চরিত্র গড়ার সাধ,
শিক্ষার আলোয় দূর হোক অজ্ঞতারই বাঁধ।
জ্ঞান যেন অহংকার নয়, কল্যাণেরই দ্বার,
সৎ মানুষ গড়াই হোক শিক্ষার অঙ্গীকার।
সমাজ যদি সত্য ধরে, ন্যায়কে করে মান,
কমে যাবে প্রতারণা, জুলুম, হিংসা, অপমান।
প্রত্যেকে যদি নিজের দায়িত্ব পালন করে ঠিক,
শান্তি তখন ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি দিক।
আজ মানুষ বিজ্ঞানে বড়, প্রযুক্তিতে অগ্রসর,
দূরকে করেছে কাছে, জ্ঞান হয়েছে বিস্তর।
তবু যদি নৈতিকতা হারায় মানুষের প্রাণ,
তবে সেই উন্নতিও আনতে পারে বিপর্যয়-জ্ঞান।
তাই উন্নতি শুধু বাহিরে নয়, অন্তরেও চাই,
জ্ঞান-বিজ্ঞান মানবতার সেবায় লাগাই।
ক্ষমতা হোক দায়িত্ববোধে, সম্পদ হোক দান,
জ্ঞান হোক হিদায়াতের, সত্য হোক পরিচয়-মান।
হে মানুষ, তুমি ভুলে যেয়ো না নিজের পরিচয়,
আল্লাহর সৃষ্টি তুমি—তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন হয়।
দুনিয়ার পথ ক্ষণিক, আখিরাত চিরস্থায়ী,
তাই নেক আমলের পথে চলো, রবের রহমত চাই।
সুন্দরতম অবয়ব তোমার—রাখো তার সম্মান,
ঈমান দিয়ে শুদ্ধ করো অন্তরেরই প্রাণ।
সৎকর্ম দিয়ে সাজাও জীবন, সত্যকে করো সাথী,
তাকওয়ার আলোয় পেরিয়ে চলো জীবনের সব রাতই।
অহংকার নয়—বিনয় হোক, হিংসা নয়—ভালোবাসা,
জুলুম নয়—ন্যায় হোক, মিথ্যা নয়—সত্যের আশা।
প্রতারণা নয়—আমানত, বিদ্বেষ নয়—ক্ষমা,
আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক জীবনের মহিমা।
যে জীবন রবের পথে, সে জীবনই ধন্য,
যে হৃদয়ে ঈমান জাগে, সে হৃদয়ই পুণ্য।
যে হাতে নেক আমল, যে মুখে সত্য বাণী,
তার জীবন আলোকিত করে দুনিয়ার অন্ধকারখানি।
শেষে একটাই প্রার্থনা—হে দয়াময় রব,
সুন্দরতম সৃষ্টি করে দিও উত্তম সব।
বিশুদ্ধ ঈমান দাও, নেক আমল দাও,
সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখো—হে দাও।
মানুষের হক আদায়ের তাওফিক দাও প্রভু,
জুলুম, মিথ্যা, অহংকার থেকে রাখো দূর সবই।
আখিরাতের সেই দিনে যখন হবে বিচার,
তোমার রহমতের ছায়ায় রেখো আমাদের বারবার।
হে আল্লাহ, সুন্দরতম সৃষ্টির মর্যাদা বুঝতে দাও,
ঈমান ও সৎকর্মে জীবনটাকে সাজাতে দাও।
তোমার সন্তুষ্টি হোক আমাদের জীবনের কামনা—
দুনিয়া ও আখিরাতে দাও সফলতার ঠিকানা।
হে আল্লাহ—তোমার পথে চলার তাওফিক দাও,
ঈমান, নেক আমল ও উত্তম চরিত্র দাও।
তোমার সর্বোত্তম বিচারের দিনে রেখো সফলদের দলে—
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
২
৫ মন্তব্য