Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:১১ পূর্বাহ্ণ

অবশ্যম্ভাবী সত্যের আহ্বান ও আখিরাতের চূড়ান্ত হিসাব -মোঃ মুজিবুর রহমান

অবশ্যম্ভাবী সত্যের আহ্বান ও আখিরাতের চূড়ান্ত হিসাব

(সূরা আল-হাক্কাহর আলোকে কিয়ামত, পুনরুত্থান, আমলনামা, ঈমান ও মানবিক দায়িত্বের শিক্ষা)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষ পৃথিবীতে আসে, কিছুদিন জীবনযাপন করে এবং একসময় মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন থেকে বিদায় নেয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং এটি অনন্ত জীবনের পথে একটি সেতু। দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবন একদিন শেষ হবে, পৃথিবীর পরিচিত দৃশ্যপট বদলে যাবে, পাহাড়-পর্বত চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে, আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং সমগ্র মানবজাতিকে মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেই অবশ্যম্ভাবী দিনের নাম কিয়ামত। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাক্কাহ এই মহাসত্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।

সূরা আল-হাক্কাহ পবিত্র কুরআনের ৬৯তম সূরা। এতে ৫২টি আয়াত রয়েছে এবং এটি মাক্কী সূরা। ‘আল-হাক্কাহ’ শব্দের অর্থ—অবশ্যম্ভাবী সত্য, সুনিশ্চিত ঘটনা বা এমন বাস্তবতা যা অবশ্যই সংঘটিত হবে। সূরার শুরুতেই পরপর প্রশ্নের মাধ্যমে মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়া হয়েছে—“আল-হাক্কাহ! কী সেই অবশ্যম্ভাবী সত্য? আর কিসে তোমাকে বোঝাবে সেই অবশ্যম্ভাবী সত্য কী?” এ প্রশ্ন শুধু তথ্য জানার জন্য নয়; বরং মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলার জন্য। যেন মানুষ থেমে চিন্তা করে—আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি এবং একদিন আমার সব কাজের হিসাব কার কাছে দিতে হবে?

কিয়ামত—এক অবশ্যম্ভাবী সত্য

দুনিয়ার জীবনে মানুষ অনেক সত্যকে অস্বীকার করতে পারে, কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করলেই সত্য বিলীন হয়ে যায় না। রাতের পর যেমন দিন আসে, বীজ থেকে যেমন চারা গজায়, তেমনি মহান আল্লাহর নির্ধারিত সময় এলে কিয়ামতও অবশ্যই সংঘটিত হবে।

সূরা আল-হাক্কাহ মানুষের সামনে সেই অবশ্যম্ভাবী দিনের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, পৃথিবী ও পাহাড়সমূহ তুলে নেওয়া হবে এবং সেগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আকাশের বর্তমান বিন্যাস পরিবর্তিত হবে। মানুষ তার প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হবে। সেদিন দুনিয়ার কোনো পরিচয়, পদমর্যাদা, অর্থ-সম্পদ বা ক্ষমতা মানুষকে আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

তাই কিয়ামতের প্রতি ঈমান শুধু একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়; এটি মানুষের জীবনদর্শনকে পরিবর্তন করে। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে তাকে একদিন দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিটি কাজের জবাব দিতে হবে, সে অন্যায় করার আগে চিন্তা করে, মানুষের অধিকার নষ্ট করতে ভয় পায় এবং নিজের জীবনকে সংশোধনের চেষ্টা করে।

পূর্ববর্তী জাতির পরিণতি—অস্বীকারের ভয়াবহ শিক্ষা

সূরা আল-হাক্কাহ শুধু কিয়ামতের কথা বলেই শেষ হয়নি; বরং পূর্ববর্তী কয়েকটি জাতির পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আদ ও সামূদ জাতি আল্লাহর নিদর্শন ও সত্যের আহ্বান অস্বীকার করেছিল। তারা তাদের রাসূলদের অবাধ্য হয়েছিল। ফলে তারা ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হয়।

আদ জাতিকে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছিল। সামূদ জাতি ভয়াবহ আঘাতে ধ্বংস হয়েছিল। ফেরাউন ও তার পূর্ববর্তীদের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। লূত (আ.)-এর জাতির অপরাধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনা কেবল অতীতের ইতিহাস নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা। আল্লাহর বিধান অমান্য করে কোনো জাতি চিরস্থায়ী নিরাপত্তা লাভ করতে পারে না। শক্তি, সম্পদ, সভ্যতা, প্রভাব ও ক্ষমতা মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বড় করে তুলতে পারে; কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে রক্ষা করতে পারে না।

অতএব ইতিহাসের দিকে তাকানো মানে শুধু পুরোনো ঘটনা জানা নয়; বরং সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া। যে জাতি অন্যায়ের পরিণতি দেখে নিজেকে সংশোধন করে, সে ইতিহাস থেকে উপকার লাভ করে; আর যে জাতি ইতিহাসের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে, সে একই ভুলের পথে এগিয়ে যেতে পারে।

নূহ (আ.)-এর নৌকা—আল্লাহর স্মরণীয় নিদর্শন

সূরাটিতে নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের কথাও এসেছে। যখন প্লাবনের পানি পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নৌকায় আরোহণের সুযোগ দিয়েছিলেন। এই ঘটনাকে মানুষের জন্য স্মরণীয় নিদর্শন করা হয়েছে।

এখানে গভীর শিক্ষা রয়েছে। বিপদের সময় মানুষ নিজের শক্তির সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে। সমুদ্রের ঢেউ, ঝড়ের গতি, বন্যার স্রোত কিংবা প্রকৃতির বিপুল শক্তির সামনে মানুষের সামর্থ্য কত সীমিত—এসব ঘটনা আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়।

তবে মুমিনের শিক্ষা হলো—বিপদে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং বৈধ উপায় অবলম্বন করা। নূহ (আ.)-এর ঘটনায় যেমন আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ছিল, তেমনি নৌকা নির্মাণ ও তাতে আরোহণের বাস্তব ব্যবস্থা ছিল। তাই তাওয়াক্কুল মানে কর্মহীন বসে থাকা নয়; বরং সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

হাশরের ময়দানে কেউ গোপন থাকবে না

দুনিয়াতে মানুষ অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। মানুষের কাছ থেকে সম্পদ লুকানো যায়, অপরাধ গোপন করা যায়, বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে নিজের প্রকৃত অবস্থা ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু কিয়ামতের দিন কোনো গোপন বিষয় গোপন থাকবে না।

সূরা আল-হাক্কাহ জানিয়ে দেয়—মানুষকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে। সেদিন প্রত্যেক মানুষের আমল প্রকাশিত হবে। দুনিয়াতে যে কাজকে মানুষ ছোট মনে করেছে, যে কথা বলে ভুলে গেছে, যে অধিকার নষ্ট করেছে, যে ভালো কাজ গোপনে করেছে—সবই আল্লাহর জ্ঞানে সংরক্ষিত।

এই বিশ্বাস মানুষকে আত্মসংযম শেখায়। কারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই আড়াল করা সম্ভব নয়।

ডান হাতে আমলনামা—সফলতার আনন্দ

সূরা আল-হাক্কাহর অন্যতম হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য হলো আমলনামা গ্রহণের দৃশ্য। যাকে ডান হাতে তার আমলনামা দেওয়া হবে, সে আনন্দের সঙ্গে বলবে—“নাও, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো!”

কেন তার এই আনন্দ?

কারণ সে জানত, তাকে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। সে দুনিয়ার জীবনকে দায়িত্বহীন আনন্দের জীবন হিসেবে নেয়নি। ঈমান, সালাত, সৎকর্ম, আল্লাহভীতি, মানুষের অধিকার রক্ষা, সত্যবাদিতা ও নেক আমলকে জীবনের পথ বানিয়েছিল।

তারপর তার জন্য সম্মানজনক জীবন ও জান্নাতের সুখের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ফলমূল তার নাগালের মধ্যে থাকবে এবং তাকে বলা হবে—তোমরা অতীতে যে আমল করেছিলে, তার বিনিময়ে তৃপ্তির সঙ্গে খাও ও পান করো।

এখানে মুমিনের জন্য এক গভীর আশাবাদ রয়েছে। দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর আনুগত্যের পথে কষ্ট থাকলেও তার পরিণতি অশেষ শান্তি ও সফলতা।

বাম হাতে আমলনামা—অনুশোচনার ভয়াবহতা

অন্যদিকে যার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে, তার মুখে ফুটে উঠবে গভীর অনুশোচনা। সে আফসোস করে বলবে—হায়, যদি আমার আমলনামা আমাকে না দেওয়া হতো! যদি আমি আমার হিসাব সম্পর্কে না জানতাম! যদি মৃত্যু আমার শেষ পরিণতি হতো!

কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

সে বুঝতে পারবে—দুনিয়ার সম্পদ তাকে রক্ষা করতে পারেনি। ক্ষমতা-কর্তৃত্বও তার কোনো কাজে আসেনি। যে সম্পদের জন্য সে সত্যকে ভুলে গিয়েছিল, যে ক্ষমতার জন্য সে মানুষের অধিকার নষ্ট করেছিল, যে অহংকারে সে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল—সেগুলোর কোনোটিই তাকে মুক্তি দিতে পারবে না।

এই দৃশ্য আমাদের আজকের জীবনকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি এমন কিছু অর্জনের জন্য ছুটছি, যা কিয়ামতের দিন আমাদের কোনো উপকার করবে না?

সম্পদ নয়, আমলই হবে আসল পরিচয়

দুনিয়ার সমাজে মানুষের মূল্যায়ন অনেক সময় অর্থ, পদ, বাড়ি, গাড়ি, ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে করা হয়। কিন্তু আখিরাতের বিচারের মানদণ্ড ভিন্ন।

মানুষ যত সম্পদই অর্জন করুক, মৃত্যুর পর তা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে না। তার সঙ্গে থাকবে তার ঈমান ও আমল। তাই সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করা বৈধ। কিন্তু সম্পদ যেন মানুষের অন্তরের মালিক না হয়ে যায়—এটাই শিক্ষা।

সম্পদ যদি আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সম্পদের মোহ যদি মানুষকে আল্লাহর স্মরণ, সালাত, সত্য, ন্যায় ও মানুষের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে সেটিই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মিসকিনের অধিকার—ঈমানের সামাজিক প্রকাশ

সূরা আল-হাক্কাহর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্ব।

অপরাধীর শাস্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনত না এবং মিসকিনকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করত না।

এখানে মানবসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পেয়েছে। ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; মানুষের অধিকার রক্ষাও ইসলামী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সালাত যেমন আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে দৃঢ় করে, তেমনি দান-সদকা, যাকাত, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা সমাজে ন্যায় ও সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করে।

তাই একজন মুমিন শুধু নিজে ভালো থাকবে না; বরং ক্ষুধার্তকে খাবার দেবে, অসহায়কে সাহায্য করবে, মজলুমের পাশে দাঁড়াবে, এতিমের প্রতি সদয় হবে, দরিদ্রের অধিকার রক্ষা করবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসবে।

কুরআন কবির বা গণকের কথা নয়

সূরা আল-হাক্কাহর শেষাংশে কুরআনের সত্যতা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এটি কোনো কবির কথা নয় এবং কোনো গণকের কথাও নয়; এটি জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

এখানে কুরআনের ওহি হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের পক্ষ থেকে কুরআন রচনা করেননি; বরং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

এ শিক্ষা মুসলমানের আকিদার একটি মৌলিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে—কুরআন আল্লাহর কালাম এবং তা মানবজাতির জন্য হিদায়াতের গ্রন্থ। তাই কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বোঝা, মানা এবং জীবনে বাস্তবায়নের জন্যও।

সত্যের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সততা

সূরাটির ৪৪-৪৭ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে—যদি রাসূল আল্লাহর নামে কোনো কথা বানিয়ে বলতেন, তবে আল্লাহ তাঁকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন এবং কেউ তাঁকে রক্ষা করতে পারত না।

এর মাধ্যমে কুরআনের সত্যতা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ ওহির নির্ভরযোগ্যতা সুস্পষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল; তাঁর দায়িত্ব ছিল আল্লাহর বার্তা যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমান রাখা, তাঁর সুন্নাহকে সম্মান করা এবং তাঁর প্রদর্শিত ন্যায়, সত্য, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্র অনুসরণ করা।

তাকওয়াবানদের জন্য কুরআন—এক মহা উপদেশ

সূরার ৪৮ নম্বর আয়াতে কুরআনকে মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের শিক্ষা মানুষের জীবনকে আলোকিত করে, কিন্তু উপকার লাভের জন্য অন্তরে সত্য গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হয়।

তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি করে তাঁর আদেশ পালন করা, নিষেধ থেকে বিরত থাকা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তাকওয়াবান ব্যক্তি একা থাকলেও অন্যায় করতে ভয় পায়, কারণ সে জানে—আল্লাহ তাকে দেখছেন। সে মানুষের প্রশংসার জন্য ভালো কাজ করে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে। সে ক্ষমতা পেলে অহংকারী হয় না, সম্পদ পেলে অপচয় করে না, বিপদে হতাশ হয় না এবং সুযোগ পেলে অন্যের অধিকার নষ্ট করে না।

কিয়ামতের বিশ্বাস—চরিত্র গঠনের শক্তি

কিয়ামতের প্রতি ঈমান মানুষের চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যে ব্যক্তি জানে, একদিন তাকে নিজের কথা, কাজ, সম্পদ, দায়িত্ব ও সম্পর্কের হিসাব দিতে হবে, সে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

সে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকে, কারণ সত্যের হিসাব দিতে হবে।

সে প্রতারণা থেকে দূরে থাকে, কারণ আমানতের হিসাব দিতে হবে।

সে জুলুম থেকে বিরত থাকে, কারণ মজলুমের অধিকার নষ্ট করার জবাব দিতে হবে।

সে মানুষের গোপন বিষয় প্রকাশ করে না, কারণ নিজের গোপন বিষয়ও একদিন প্রকাশিত হবে।

সে অহংকার করে না, কারণ দুনিয়ার মর্যাদা ক্ষণস্থায়ী।

সে ক্ষমা করতে শেখে, কারণ সে নিজেও আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশী।

এভাবেই আখিরাতের বিশ্বাস একজন মানুষকে অন্তর থেকে সংশোধন করে।

দুনিয়ার জীবন—পরীক্ষার ক্ষেত্র

সূরা আল-হাক্কাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন স্থায়ী আবাস নয়। এখানে মানুষ পরীক্ষা দিচ্ছে। কখনো সম্পদ দিয়ে, কখনো দারিদ্র্য দিয়ে, কখনো ক্ষমতা দিয়ে, কখনো দুর্বলতা দিয়ে, কখনো সুখ দিয়ে, কখনো দুঃখ দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়।

সফল সে নয়, যে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি সম্পদ অর্জন করেছে; সফল সে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করেছে।

সফল সে নয়, যে মানুষের চোখে বড় হয়েছে; সফল সে, যে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

সফল সে নয়, যে দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরে থেকেছে; সফল সে, যে দুনিয়ার প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করে আখিরাতের প্রস্তুতি নিয়েছে।

আমাদের জীবনের জন্য সূরা আল-হাক্কাহর শিক্ষা

সূরা আল-হাক্কাহর আলোকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি—

প্রথমত, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী; তাই আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী জাতির ধ্বংসের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, মানুষের কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়; তাই প্রকাশ্য ও গোপন—উভয় জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।

চতুর্থত, আমলনামা সত্য; তাই প্রতিটি কাজের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

পঞ্চমত, সম্পদ ও ক্ষমতা চূড়ান্ত নিরাপত্তা দিতে পারে না; ঈমান ও সৎকর্মই আখিরাতের জন্য আসল পাথেয়।

ষষ্ঠত, দরিদ্র, অসহায় ও মিসকিনের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

সপ্তমত, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সত্য বাণী; তাই কুরআন বুঝে পড়া ও জীবনে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

অষ্টমত, তাকওয়া ও নেক আমলকে জীবনের মূল ভিত্তি করতে হবে।

নবমত, বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি বৈধ ও বাস্তব উপায় অবলম্বন করতে হবে।

দশমত, মানুষের অধিকার রক্ষা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আত্মসমালোচনার সময় এখনই

কিয়ামতের ময়দানে দাঁড়িয়ে অনুশোচনা করার আগে দুনিয়াতেই নিজের হিসাব নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। আজ আমাদের হাতে সময় আছে, তাওবার সুযোগ আছে, আমল করার সুযোগ আছে, ভুল সংশোধনের সুযোগ আছে এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে।

তাই নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—

আমি কি আল্লাহর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক রেখেছি?

আমার সালাত কি সঠিক?

আমার উপার্জন কি হালাল?

আমি কি কারও হক নষ্ট করেছি?

আমার কথায় কি কেউ কষ্ট পেয়েছে?

আমি কি কোনো মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছি?

আমি কি দরিদ্র ও অসহায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছি?

আমার সম্পদ কি শুধু নিজের জন্য, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যও ব্যয় করি?

আমি কি কুরআন শুধু পড়ি, নাকি তার শিক্ষা জীবনে ধারণও করি?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজের কাছেই দিতে হবে। কারণ কিয়ামতের দিনের হিসাবের আগে দুনিয়াতেই আত্মসমালোচনা করে নিজেকে সংশোধন করা মুমিনের জন্য কল্যাণকর।

উপসংহার

সূরা আল-হাক্কাহ যেন মানুষের সামনে এক বিশাল আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখি—কিয়ামত আসবে, হাশর হবে, আমলনামা দেওয়া হবে, মানুষের গোপন বিষয় প্রকাশিত হবে এবং প্রত্যেককে তার কর্মের ফলের মুখোমুখি হতে হবে।

আদ, সামূদ, ফেরাউন ও অন্যান্য অবাধ্য জাতির পরিণতি আমাদের সতর্ক করে; নূহ (আ.)-এর ঘটনা আমাদের ঈমান ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দেয়; ডান হাতে আমলনামা পাওয়া মানুষের দৃশ্য আমাদের আশাবাদী করে; আর বাম হাতে আমলনামা পাওয়া মানুষের অনুশোচনা আমাদের সতর্ক করে।

এই সূরা আমাদের শেখায়—দুনিয়ার জীবন যতই সুন্দর হোক, তা ক্ষণস্থায়ী; সম্পদ যতই বেশি হোক, তা চিরস্থায়ী নয়; ক্ষমতা যতই প্রবল হোক, তা কিয়ামতের দিন রক্ষা করতে পারবে না। চূড়ান্ত সফলতা হলো ঈমান, তাকওয়া, সৎকর্ম, সত্যবাদিতা, আল্লাহর আনুগত্য এবং মানুষের অধিকার আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

অতএব, আসুন আমরা কিয়ামতের অবশ্যম্ভাবী সত্যকে অন্তরে ধারণ করি, কুরআনের হিদায়াতকে জীবনের পথনির্দেশ করি, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করি, অন্যায় ও জুলুম থেকে দূরে থাকি, মজলুম ও অসহায়ের পাশে দাঁড়াই, দরিদ্রের অধিকার আদায় করি এবং প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব গ্রহণ করি।

যেদিন আমলনামা হাতে তুলে দেওয়া হবে, সেদিন যেন আমরা আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি—“নাও, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো।”

আল্লাহ আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, কুরআনের শিক্ষা বুঝে আমল করার তাওফিক দিন, মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন, গুনাহ থেকে তাওবা করার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে ডান হাতে আমলনামা লাভকারী সৌভাগ্যবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

হে মহান আল্লাহ, আমাদের দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের সফলতার প্রস্তুতিতে পরিণত করুন। আমাদের অন্তরকে ঈমান, তাকওয়া, সত্য, ন্যায়, আমানতদারি ও মানবসেবায় আলোকিত করুন। আমাদের শেষ পরিণতি কল্যাণময় করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ