সহকারী শিক্ষক
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ
Pioneer 10, Pioneer 11 এবং New Horizons
পৃথিবীর মানবজাতির তৈরি কয়েকটি ছোট নভোযান এমন এক যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছে, যার শেষ গন্তব্য সৌরজগতের বাইরের অন্ধকার মহাকাশ।
ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২-এর নাম আমরা সবচেয়ে বেশি শুনি। কারণ তারা হেলিওস্ফিয়ার পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করেছে এবং পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠিয়েছে। কিন্তু গল্পটা শুধু ভয়েজারদের নয়। নীরবে একই পথে এগিয়ে চলেছে আরও তিনটি মানবনির্মিত নভোযান: Pioneer 10, Pioneer 11 এবং New Horizons। NASA-র তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচটি নভোযানই এমন গতিপথে রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের সৌরজগতের অনেক দূরে নিয়ে যাবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। হেলিওস্ফিয়ার ছেড়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করা আর পুরো সৌরজগত ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া এক কথা নয়। NASA-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, সৌরজগতের প্রকৃত সীমানা হিসেবে ওর্ট ক্লাউডকে ধরলে, এসব নভোযানের সেই অঞ্চল পেরোতে হাজার হাজার বছর লাগবে। Voyager 1 ইতিমধ্যে হেলিওস্ফিয়ার ছেড়েছে, কিন্তু ওর্ট ক্লাউডের ভেতরের প্রান্তে পৌঁছাতেই তার আরও প্রায় ৩০০ বছর লাগতে পারে এবং পুরো অঞ্চল পেরোতে সময় লাগতে পারে প্রায় ৩০ হাজার বছর।
গল্পটা শুরু হয় ভয়েজারেরও আগে। ১৯৭২ সালে উৎক্ষেপণ করা Pioneer 10 ছিল এই মহাকাব্যিক যাত্রার অন্যতম পথপ্রদর্শক। এটি ছিল প্রথম মানবনির্মিত নভোযান, যাকে এমন গতিপথে পাঠানো হয়েছিল যা তাকে সৌরজগত থেকে পালানোর পথে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে এটি ছিল প্রথম নভোযান যা মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথ পেরিয়ে প্রধান গ্রহাণু বলয় অতিক্রম করে বৃহস্পতির কাছে পৌঁছেছিল।
Pioneer 10 শেষবার পৃথিবীতে সংকেত পাঠায় ২০০৩ সালে। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ এখন এটি একটি নীরব নভোযান। কোনো ক্যামেরা দিয়ে ছবি পাঠাচ্ছে না, কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যও আসছে না। তবু তার যাত্রা থেমে নেই। সূর্যের মহাকর্ষীয় টান থেকে মুক্ত গতিপথে সেটি ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। NASA-এর হিসাবে, এটি ভবিষ্যতে বৃষ রাশির দিকের উজ্জ্বল নক্ষত্র Aldebaran-এর কাছাকাছি দিয়ে যাবে, তবে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ২০ লাখ বছর সময় লাগবে।
Pioneer 10-এর যাত্রার সঙ্গে আরও একটি অসাধারণ বিষয় জড়িয়ে আছে। নভোযানটির গায়ে লাগানো ছিল একটি ধাতব ফলক, Pioneer Plaque। এতে একজন পুরুষ ও একজন নারীর ছবি, সৌরজগতের অবস্থান এবং কয়েকটি পালসারের সাহায্যে পৃথিবীর অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্থাৎ পৃথিবীর মানুষ জানত, এই ছোট যন্ত্রটি হয়তো এমন কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতার হাতে পড়তে পারে, যারা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানে না।
এর পর আসে Pioneer 11। ১৯৭৩ সালে উৎক্ষেপণ করা এই নভোযান বৃহস্পতি ও শনির কাছ দিয়ে উড়ে যায়। এটি ছিল শনির প্রথম কাছ থেকে পর্যবেক্ষণকারী নভোযানগুলোর একটি এবং শেষ পর্যন্ত এটিও এমন গতিপথে চলে যায়, যা তাকে সৌরজগতের বাইরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে Pioneer 11 আর পৃথিবীতে কোনো সংকেত পাঠায় না। ভবিষ্যতে এটি Aquila বা ঈগল নক্ষত্রমণ্ডলের দিক দিয়ে এগিয়ে যাবে এবং কোনো একটি নক্ষত্রের কাছাকাছি যেতে তার প্রায় ৪০ লাখ বছর লাগতে পারে।
তারপর এল ভয়েজার। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত Voyager 1 ও Voyager 2 পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত আন্তঃনাক্ষত্রিক দূত হয়ে ওঠে। বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের অভূতপূর্ব ছবি এবং তথ্য পাঠিয়ে তারা সৌরজগত সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছে।
Voyager 1 প্রায় ৩.৫ AU প্রতি বছর গতিতে সূর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। Voyager 2-এর গতি প্রায় ৩.১ AU প্রতি বছর। ২০১২ সালে Voyager 1 হেলিওপজ অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করে। ছয় বছর পর, ২০১৮ সালে একই পথ অনুসরণ করে Voyager 2।
আর তাদের সঙ্গে রয়েছে পৃথিবীর মানুষের একটি বার্তা। দুই ভয়েজারেই বহন করা হচ্ছে বিখ্যাত Golden Record, যাতে পৃথিবীর নানা শব্দ, ছবি ও মানুষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কিছু নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
কিন্তু তৃতীয় নীরব যাত্রীটি এখনো কথা বলছে। এখানে আসে New Horizons। Pluto-কে কাছ থেকে দেখার জন্য ২০০৬ সালে উৎক্ষেপণ করা এই নভোযানটি ২০১৫ সালে Pluto-এর ঐতিহাসিক ফ্লাইবাই সম্পন্ন করে। এরপর এটি আরও দূরের Kuiper Belt-এর দিকে এগিয়ে যায় এবং Arrokoth নামের একটি আদিম বস্তু অতিক্রম করে। এখন তার পথ আরও বাইরের অন্ধকার অঞ্চলের দিকে।
New Horizons-এর বিশেষত্ব হলো, এটি এখনো একটি সক্রিয় নভোযান। অর্থাৎ Pioneer 10 ও 11-এর মতো নীরব হয়ে যায়নি। এটি সৌরজগতের বহিরাংশ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ ভবিষ্যতে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশের দিকে এগিয়ে যাবে। NASA-ও New Horizons-কে এমন একটি নভোযান হিসেবে উল্লেখ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশের দিকে এগিয়ে চলেছে।
তাই শুরুতে বলা কথাটি একটু সংশোধন করে বলা যায়। ভয়েজার ছাড়া শুধু আরও দুইটি নয়, মোট পাঁচটি মানবনির্মিত নভোযান এমন গতিপথে রয়েছে, যা তাদের সৌরজগতের বাইরের মহাকাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে Voyager 1 ও Voyager 2 ইতিমধ্যে হেলিওস্ফিয়ার পেরিয়েছে, New Horizons এখনো সক্রিয়ভাবে বাইরে এগোচ্ছে, আর Pioneer 10 ও Pioneer 11 নীরব অবস্থায় মহাকাশে ভেসে চলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এগুলোর যাত্রা মানুষের জীবদ্দশার তুলনায় এত দীর্ঘ যে কোনো মানুষই এর শেষ দেখতে পাবে না।
আজ পৃথিবীতে আমরা হয়তো তাদের সংকেত শুনছি। আগামী কয়েক দশক বা তারও কিছু বেশি সময় পর সেই কণ্ঠস্বর একে একে ক্ষীণ হয়ে যাবে। কিন্তু নভোযানগুলো থামবে না। তারা চলতেই থাকবে।
পৃথিবী থেকে তৈরি ক্ষুদ্র ধাতব যন্ত্রগুলো তখন আমাদের গ্রহ, আমাদের সভ্যতা, এমনকি আমাদের সময়কেও অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে এক বিশাল, নীরব মহাশূন্যের দিকে।
আর কোনো এক সুদূর ভবিষ্যতে, যখন পৃথিবীর আজকের সভ্যতার অস্তিত্বও হয়তো ইতিহাসের পাতায় পরিণত হবে, তখনও এই ছোট্ট নভোযানগুলো সূর্যের চারপাশের তাদের পুরোনো ঠিকানা থেকে দূরে, অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলবে। মানুষ হয়তো নক্ষত্রে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু মানুষ ইতিমধ্যেই নক্ষত্রগুলোর দিকে নিজের তৈরি দূত পাঠিয়ে দিয়েছে।
৪
৭ মন্তব্য