সহকারী শিক্ষক
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:০৬ অপরাহ্ণ
অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে মক ভাইভা, জবির চার বন্ধুর বিচারক হওয়ার গল্প
অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে মক ভাইভা, জবির চার বন্ধুর বিচারক হওয়ার গল্প
কনকনে শীতের দিন। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সামনে মৌখিক পরীক্ষা। বিচারক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর চারজন নিয়ম করে বসতেন মক ভাইভায়। একজন প্রার্থীর ভূমিকায় সামনে বসতেন, আর বাকি তিনজন করতেন প্রশ্ন। কখনো আইনি বিষয়, কখনো সাধারণ জ্ঞান ও সমসাময়িক বিষয়— এভাবেই একে অন্যকে প্রস্তুত করতে প্রায় ৪০টি মক ভাইভা দিয়েছিলেন তারা।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে নয়জন প্রার্থী সিভিল জজ হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মো. মামুন শেখ ৯ম এবং মৃণাল ডাকুয়া ১১৪তম মেধাস্থান অর্জন করেছেন। এর আগে ১৭তম বিজেএসে বৈশাখী কর্মকার ও ছোটন মিয়া সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বিচারক হন। এভাবেই স্বপ্নপূরণ হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে বসে ভাইবার প্রস্তুতি নেওয়া চার বন্ধুর।
তাদের মধ্যে মধ্যে বৈশাখী কর্মকার ও ছোটন মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। একই শিক্ষাবর্ষের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মৃণাল ডাকুয়া। তাদের সিনিয়র মো. মামুন শেখ আইন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
বিজ্ঞাপন
লিখিত পরীক্ষা শেষে কম সময়ে নিজেদের প্রস্তুতি, সংগ্রাম ও স্বপ্ন জয়ের পেছনের গল্প জানিয়েছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে সাফল্য অর্জনের পর বিচার বিভাগে প্রবেশের পরীক্ষাতেও নিজের অবস্থানের স্বাক্ষর রেখেছেন মো. মামুন শেখ। এবার বিজেএস মেধাতালিকায় নবম স্থান অধিকার করেছেন।
স্বপ্নজয়ের সেই মুহূর্তের অনুভূতি ঢাকা পোস্টের সঙ্গে শেয়ার করে মামুন শেখ বলেন, আমরা সবাই আশা করেছিলাম, ইনশাআল্লাহ চারজনই জজ হয়ে যাব। কিন্তু রিজিকের বিষয়টা ওপর থেকে নির্ধারিত। শেষ পর্যন্ত দুইজন রেকমেন্ডেড হয়েছে। আমরা দুজন হাল ছাড়িনি। আমি আর মৃণাল আবার নতুনভাবে শুরু করি। আল্লাহর অশেষ রহমতে ১৮তম বিজেএসে আমরা দুজনই সফল হয়েছি।
এদিকে ১১৪তম মেধাস্থান অর্জন করেন আরেক শিক্ষার্থী মৃণাল ডাকুয়া। চার বন্ধুর মক ভাইভা প্রস্তুতির পেছনের গল্প শেয়ার করেছেন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে।
মৃৃণাল বলেন, শুরুটা করেছিলাম আমরা তিনজন মিলে ১৭তম বিজেএসের রিটেনের পরে। পরবর্তী সময়ে মামুন ভাই আমাদের সঙ্গে জয়েন করেন। আমরা একে অন্যের সঙ্গে এমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং তৈরি হয়ে যায় যে সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ থাকে না আমাদের মাঝে। শুরুতে শহীদ মিনারের পাদদেশে বসতাম। কিন্তু শীতের মধ্যে খোলা জায়গায় এক- দেড় ঘণ্টা বসে থাকা যেত না। চিন্তা করলাম, কোথায় বসা যায়। পরে অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে বসে প্র্যাকটিস শুরু করি।
আসল ভাইভা বোর্ডের অনুভূতি ও প্রস্তুতি নিতেই মক ভাইভার শুরু করেন বলে জানান মৃণাল। তিনি বলেন, খুবই সিরিয়াস জায়গা থেকে আমরা এটা শুরু করি। একটা সিরিয়াসনেস ছিলো যে একজন আসলেও আমরা একজন নিয়েই বোর্ড গঠন করব। নির্দিষ্ট একটা শিডিউল তৈরি করে পড়া দিতাম যে আজকে এই জায়গা থেকে ২০টা সেকশন থাকবে, জেনারেল এইটুকু পড়া থাকবে। এরপর আমরা প্রিপারেশন নিয়ে আসতাম নির্দিষ্ট দিনে। পরে একজন সামনে যেত, বাকি তিনজন একটা ভাইভা বোর্ডের মতো করে বসতাম। একেবারে টোটাল কনসেন্ট্রেশন নিয়ে জাস্টিসদের মতো কোশ্চেন করা হতো। আমরা চেষ্টা করতাম যে নিজেকে ধরে রেখে গম্ভীর আচরণ করার। এমনভাবে করতাম যেন ওই জায়গায় বসলে একটা ভাইভা বোর্ডের ফ্লেভার চলে আসে।
মৃণালের বিচারক হওয়ার গল্পে আছে স্বপ্ন বদলে যাওয়ার অধ্যায়ও। একসময় তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার।
স্বপ্নজয়ের পথে অন্তরায় থাকা সত্ত্বেও নিজের মনোবল ধরে রাখার বিষয়ে মৃণাল ডাকুয়া বলেন, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় আমার ইচ্ছা ছিল মেডিকেলে পড়ব। কিন্তু এসএসসির রেজাল্টের কারণে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমি অনেকটা পিছিয়ে যাই। পরিবার থেকেও অনেক কথা শুনতে হয়েছে, কারণ সবাই চেয়েছিল আমি মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নিই। পরে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আইন ও ভূমি প্রশাসন বিষয়টি পছন্দের তালিকায় দিই। এরপর এই বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করার পর ধীরে ধীরে জুডিশিয়ারির দিকে আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসার পথটাও সহজ ছিল না আমার জন্য। ১৬তম ও ১৭তম বিজেএসে রিটেন দিয়েছি।কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ১৮তম বিজেএস ছিল আমার চতুর্থবারের পরীক্ষা এবং তৃতীয় ভাইভা। যত যাই হয়েছে, মনোবল হারাইনি আমি। আলহামদুলিল্লাহ, ১৮তম বিজেএসে সফল হয়েছি। বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
মৃণাল ও মামুনের সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন তাদেরই মক ভাইভার সঙ্গী ছোটন মিয়া। ১৭তম বিজেএসের ভাইভার আগে তোলা চার বন্ধুর একটি ছবি নিজের ফেসবুক পোস্টে দিয়ে তিনি লিখেছেন, চারজন মিলে প্রায় ৩০-৪০টি মক ভাইভা দিয়েছিলাম। আমি ও বৈশাখী ১৭তম বিজেএসেই সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। এবার মৃণাল ও মামুনও বিচারক হওয়ায় ছবিটি পূর্ণতা পেয়েছে।
অভিনন্দন জানিয়ে ছোটন লেখেন, কী যে ভালো লাগছে, বলে বুঝানো সম্ভব না।
জবির আইন অনুষদের চার বন্ধুর সাফল্য সাফল্য একই সঙ্গে সহপাঠী ও পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি গল্প।
এসএএস
৭
৭ মন্তব্য