প্রভাষক
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে আয়বৈষম্য যেভাবে দায়ী
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস কার্বন ডাই–অক্সাইড। কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হলো আয়বৈষম্য, যা তুলনামূলক কম আলোচিত।
বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে, এটা আর নতুন খবর নয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও নিঃসরণের হার ক্রমেই বাড়ছে। এই বৃদ্ধির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো আয়বৈষম্য। বৈষম্য বাড়ার ফলে স্বল্প কিছু মানুষের হাতে অতিমাত্রায় ধনসম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। আর সেই অতি ধনিক শ্রেণি নানা রকম বিলাসী দ্রব্যের প্রতি ঝুঁকছে, যা তৈরিতে অতিমাত্রায় জ্বালানি প্রয়োজন।
অন্যদিকে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের কর্মঘণ্টা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এটিও কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
পরিহাসের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে রাষ্ট্র যেসব আইন প্রণয়ন করতে চায়, আয়বৈষম্যের মাধ্যমে সৃষ্ট ধনিক শ্রেণি সে প্রক্রিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বিদ্যমান আইনকানুন ভঙ্গ করা ও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তো আছেই, যথাযথ জবাবদিহি না থাকা এবং ধনিক শ্রেণির প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্বও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। বড় করপোরেশনগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা জানার পরও মুনাফার কথা চিন্তা করে ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে প্রমাণ রয়েছে।
বাড়ছে কার্বন নিঃসরণ
বিগত ছয় দশকে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ অতিমাত্রায় বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী নানা মাত্রায় তোড়জোড় থাকলেও এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সাধারণত বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলো উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছাড়াই শেষ হয়ে থাকে।
এদিকে উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কার্বন নিঃসরণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা বড় বিপদ। কারণ, আমাদের মতো দেশে আর্থিক সক্ষমতা, কারিগরি জ্ঞান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো পদ্ধতি বেছে নেওয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে শিল্পায়নের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে আয়বৈষম্যও বাড়ছে।
উল্লেখিত দুটো বিষয়ই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসডিজির ১০ ও ১৩ নম্বর লক্ষ্যে আয়বৈষম্য কমানো ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা দুটো লক্ষ্যেই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রমাগত উচ্চমাত্রার দূষিত দেশ হিসেবে বিশ্ব তালিকায় উঠে আসছে। ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা’ নামক অনলাইন প্রকাশনার ২০২৩ সালের হিসাবে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহনের ক্রমাগত উচ্চ ব্যবহার এবং উচ্চ কার্বন পণ্যের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়।
অন্যদিকে জলবায়ু উদ্বাস্তুসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক কারণে শহরগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে ব্যাপক হারে। ফলে শহরাঞ্চলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে ক্রমাগত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ১৫০ শতাংশ বেশি।
আয়বৈষম্যের সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের সম্পর্ক
বিশ্বব্যাপী সাধারণত গিনি কোইফিশিয়েন্ট বা সহগ দিয়ে আয়বৈষম্য পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশে আয় বণ্টনের গিনি সহগ ১৯৮৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩৬, ২০২২ সালে যা বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯।
বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের করা গবেষণায় দেখা যায়, আয়বৈষম্য পরিবেশের ক্ষতি করে। সমাজের ধনিক শ্রেণি সম্পদ বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণিকে বঞ্চিত করে এবং পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। একইভাবে, আয়বৈষম্যের কারণে সমাজে ধনিক শ্রেণির স্ট্যাটাস কনজাম্পশন বাড়ে, যা কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়।
স্ট্যাটাস কনজাম্পশন মানে ভোগবিলাস, যা সাধারণত নিজেকে জাহির করতে মানুষ করে থাকে। স্ট্যাটাস কনজাম্পশনের জন্য মানুষ বেশি সময় কাজ করতেও বাধ্য হয়। এটিও কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়।
সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে পরিবেশের ওপর দুই ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রথমত, বৈষম্যের কারণে আরও বেশি মানুষ দরিদ্র হয়। আর এই দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও অদক্ষ শ্রমিকেরা জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয় বন ও পরিবেশ নষ্ট করতে। নগরে এসব মানুষের অপরিকল্পিত বসবাসের মাধ্যমেও পরিবেশের ক্ষতি হয়।
দ্বিতীয়ত, ধনীরা পুঁজির মালিক হিসেবে উৎপাদন ও কাঁচামাল আহরণে জীবাশ্ব জ্বালানি সবচেয়ে বেশি পোড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, উন্নত দেশগুলোয় পরিবেশবান্ধব কঠোর আইনকানুন আছে। ফলে অতিমাত্রায় কার্বন পোড়ায় বা পরিবেশের ক্ষতি করে যেসব শিল্পকারখানা, সেগুলো বাংলাদেশের মতো দেশে সরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
করণীয় কী
সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আয়বৈষম্য কমানোর দাবি ছিল বহুদিনের। এখন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও সরকারের উচিত আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের একটি অন্যতম পরামর্শ হলো পুনর্বণ্টনমূলক আর্থিক নীতি, যার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা যাবে। প্রগতিশীল আয়কর হিসেবে পরিচিত করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে একটি বহুল পরিচিত উপায় হলো কার্বন কর আরোপ। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে আয়বৈষম্য ও কার্বন নিঃসরণ দুটোই কমানো যাবে বলে রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন। তাঁদের মতে, কার্বন কর আরোপ করলে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও দরিদ্রদের আয় না কমিয়েই কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে। উল্টো কার্বন কর থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যয় করা যায়।
যদিও বহু পরিবেশবাদী এর সমালোচনা করেন। কারণ, যার সামর্থ্য আছে, সে যদি জানে তার মুনাফা আসবেই, তাহলে বাড়তি কর দিয়ে হলেও কার্বন নিঃসরণ করবে। ফলে পৃথিবী গ্রহের উপকার হবে সামান্যই।
অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন ‘অনুমতি নিলামের’ মাধ্যমে নিঃসরণের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া বেশি যুক্তিসংগত নীতি। তা ছাড়া অদক্ষ ও কম দক্ষ শ্রমিকদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাঁদের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আয়বৈষম্য কমে আসবে। গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের মাধ্যমেও আয়বৈষম্য কমানো যায়।
মোদ্দা কথা, আয়বৈষম্য কমানো শুধু সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়ই নয়, প্রাণ–প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
২
২ মন্তব্য