Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১৮ পূর্বাহ্ণ

দুনিয়ার চোখে দুর্বল, আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান -মোঃ মুজিবুর রহমান

দুনিয়ার চোখে দুর্বল, আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

যাঁর হুকুমে জীবন জাগে, মুছে মনের ভয়,
তাঁরই পথে চললে মানুষ সত্যিকারের জয়।
ধন-দৌলত, মান-সম্মান—সবই ক্ষণিক ছায়া,
তাকওয়াতে যে হৃদয় গড়ে, সফলতার সে-ই মায়া।

দুনিয়ার চোখে যে জন হয় সাধারণ, অতি ক্ষীণ,
আল্লাহর কাছে হতে পারে সে-ই মর্যাদাবান মুমিন।
নেই যার ধন, নেই যার বড় পরিচয়ের ভার,
তবু তার অন্তরে জ্বলে ঈমানের দীপ্তিধার।

চুপটি করে ভালো থাকে, করে না বড়াই,
অন্যের সুখে হাসে সে, দুঃখে পাশে দাঁড়ায়।
নিজের গুণের কথা বলে বেড়ায় না সে মুখে,
আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজে নীরব আমলসুখে।

মানুষ তাকে দুর্বল ভাবে, তুচ্ছ করে যায়,
সে তো জানে রবের কাছে মর্যাদা কে পায়।
মানুষ দেখে বাহিরখানি, আল্লাহ দেখেন মন,
কে কতটা সত্যনিষ্ঠ—জানেন অন্তরধন।

যার অন্তরে তাকওয়া থাকে, বিনয় থাকে প্রাণে,
সত্য কথা শুনে সে মাথা নোয়ায় জ্ঞানে।
ভুল হলে সে ফিরে আসে, করে তওবা মনে,
রবের দয়া চেয়ে নেয় অশ্রুসিক্ত নয়নে।

বিনয় মানে হীন হওয়া—এ কথা সত্য নয়,
বিনয়ী সে সত্যের পথে অটল থাকে নির্ভয়।
অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না কখনো,
তবু কারও প্রতি রাখে না অহংকারের ক্ষতচিহ্ন কোনো।

সত্য এলে সত্য মানে, ভুল এলে ফেরে,
আল্লাহরই বিধান মেনে জীবনপথ সে গড়ে।
নিজের জ্ঞানকে বড় ভেবে অন্যকে না হেলায়,
বিনয়েরই সৌরভ ছড়ায় তার কথা ও আচরণমেলায়।

অহংকার এক বিষের মতো অন্তর মাঝে রয়,
মানুষ তখন নিজেকেই ভাবে সবার চেয়ে বড় হয়।
ধন পেলে সে দম্ভ করে, ক্ষমতায় নেয় ভার,
অন্য মানুষ তুচ্ছ যেন—এটাই তার অহংকার।

বাড়ি আছে, সম্পদ আছে, আছে ক্ষমতার বল,
তাই বলে কি চিরদিন থাকবে এসব চল?
আজ যে মাথায় মুকুট জ্বলে, কাল তা মাটির ধূলি,
আজ যে দেহে শক্তি আছে, কাল তা হবে শূন্যভূমি।

যে বলে, “আমি সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, বড় আমি,”
সময় তাকে শিক্ষা দেয়—স্থায়ী নয় কোনো দামি।
মৃত্যু এসে থামিয়ে দেবে দম্ভের সকল গান,
সঙ্গে যাবে না ধনরত্ন, থাকবে শুধু আমলখান।

কঠোর কথা, কটু ভাষা, অকারণে বিবাদ,
অহংকারে ভরে গেলে নষ্ট হয় সব সাধ।
যে মানুষটি সত্য শুনেও ফিরিয়ে দেয় মুখ,
তার অন্তরে ধীরে ধীরে জমে অন্ধকারের দুঃখ।

অন্যকে যে ছোট করে নিজের বড়ত্ব চায়,
সে নিজেরই অন্তরটাকে অন্ধকারে হারায়।
মানুষকে সম্মান দিলে সম্মান বাড়ে মনে,
ভালোবাসা ফিরেই আসে মানুষেরই জীবনে।

দরিদ্র বলে কাউকে তুমি কখনো করো না হেলা,
অসহায়ের চোখের পানি নয় কোনো অবহেলার খেলা।
ছেঁড়া পোশাক, ছোট ঘর—এসব দেখে কী লাভ?
তাকওয়াতে যার হৃদয় ভরা, সে-ই তো সম্মানের দাবিদার।

কেউ হয়তো নীরব মানুষ, নেই তার বাহ্যিক জৌলুস,
তবু তার অন্তরে জ্বলে ঈমানের পবিত্র আলো অসীম।
কেউ হয়তো নাম না জানা, নেই তার খ্যাতির ধ্বনি,
তবু তার সৎ আমলে ফুটে রহমতেরই রজনীগন্ধা রমণী।

ধনীর প্রতি সম্মান থাকবে, গরিবের প্রতিও মান,
ইসলামের শিক্ষা সবার জন্য সমান মর্যাদার দান।
পদ-পদবি নয় মানুষের আসল পরিচয়,
ঈমান, আমল, চরিত্রেই মানুষের প্রকৃত জয়।

জ্ঞানী হলে জ্ঞানের গর্ব হৃদয়ে রেখো না,
ক্ষমতা পেলে দুর্বল মানুষকে কখনো ঠেকো না।
সুন্দর হলে সৌন্দর্যের অহংকার কোরো না,
সম্পদ পেলে দরিদ্র মানুষকে ভুলে যেও না।

যা কিছু পেয়েছ তুমি, সবই রবের দান,
তাঁরই দেওয়া রিজিক নিয়ে কেন এত অভিমান?
শ্বাস দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, দিয়েছেন জীবন,
তাঁরই দানে দাঁড়িয়ে আছ—তাঁরই কাছে ঋণী মন।

আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখো, চেষ্টা রেখো সাথে,
তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয় কোনো প্রভাতে।
কর্ম করে ফলের ভারটি রবের হাতে দাও,
বিপদ এলে ধৈর্য ধরে তাঁরই দিকে চাও।

দুঃখ এলে ভেঙে পড়ো না, রব আছেন পাশে,
অন্ধকারের পরেই তো আলো আসে আকাশে।
মানুষ যদি ফিরেও যায়, রব ফিরিয়ে নেন না,
তাঁর রহমতের দরজা কোনো তওবাকারীর জন্য বন্ধ হয় না।

পরিবারে বিনয় রাখো, ভালোবাসা দাও,
কথার মাঝে মধুরতা, সম্মান দিয়ে চাও।
স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্তান—সবার প্রতি মায়া,
সুন্দর কথায় ঘুচে যায় কত হৃদয়ের ছায়া।

শিক্ষক হলে ছাত্রকে দাও জ্ঞানের আলো,
ছাত্র হলে শিক্ষকের প্রতি রেখো আচরণ ভালো।
বড় হলে ছোটকে স্নেহ, ছোট হলে দাও মান,
এভাবেই গড়ে ওঠে সুন্দর মানবসমাজের প্রাণ।

ক্ষমতাবান হলে দুর্বলের অধিকার রেখো,
অসহায়ের কান্না শুনে তার পাশে গিয়ে থেকো।
মজলুমের চোখের পানি মুছে দাও যত্নে,
মানবতার ফুল ফুটুক তোমার সেবার রত্নে।

ঝগড়া করে জয়ী হওয়া প্রকৃত বিজয় নয়,
রাগ দমন করাই তো শক্তিমান হওয়ার পরিচয়।
কটু কথায় হৃদয় ভাঙে, ক্ষত থাকে বহুদিন,
মিষ্টি কথায় ফুটতে পারে ভালোবাসার রঙিন দিন।

ক্ষমা করা মহৎ গুণ, প্রতিহিংসা নয়,
ন্যায়ের পথে দৃঢ় থেকে ক্ষমায় মহত্ত্ব হয়।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করো, কিন্তু সীমা রেখো মান,
ইসলামের ন্যায়বোধেই জাগুক মানবিক প্রাণ।

নিজেকে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করো নীরব মনে—
“
কতটা আছি রবের পথে, কতটা আছি গুণে?”
“
আমার কথায় কারও মনে কষ্ট হলো কি আজ?”
“
আমার আচরণে ফুটল কি ইসলামেরই সাজ?”

“আমি কি সত্য গ্রহণ করি, ভুল হলে কি ফিরি?”
“
অন্যের দুঃখ দেখে কি আমি ব্যথিত হয়ে ঝরি?”
“
দরিদ্রকে কি সম্মান করি, অসহায়কে কি দিই মান?”
এই প্রশ্নেই জেগে উঠুক বিবেকের আহ্বান।

দুনিয়া যত বড়ই হোক, শেষ ঠিকানা কবর,
রাজপ্রাসাদ হোক বা কুটির—সবার গন্তব্য একবর।
মাটির নিচে নেই কোনো পদ, নেই কোনো সম্মান,
সঙ্গে থাকে শুধু মানুষের ঈমান ও আমল-সঞ্চয়দান।

সেদিন ধন-সম্পদের হিসাব দেবে না কোনো মান,
সত্যিকার পাথেয় হবে ঈমান ও নেক আমলখান।
যে হৃদয়ে তাকওয়া ছিল, যে জীবন ছিল সৎ,
রবের রহমতে তার জন্য খুলবে জান্নাতের পথ।

তাই এসো অহংকার ছেড়ে বিনয়ের পথে যাই,
মানুষকে সম্মান দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই।
দম্ভ নয়, ভালোবাসা হোক জীবনের পরিচয়,
সত্য, ন্যায়, তাকওয়া নিয়ে গড়ি জীবনের জয়।

দুনিয়ার চোখে ছোট হলেও ক্ষতি নেই কোনো,
রবের কাছে প্রিয় হও—এই হোক সাধনা যেন।
মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই,
তাঁরই পথে জীবন রেখে জান্নাতের আশা পাই।

হে আল্লাহ, অহংকার থেকে আমাদের রাখো দূরে,
বিনয়ের আলো জ্বেলে দাও অন্তরেরই নীড়ে।
সত্যকে সত্য মানার শক্তি দাও অন্তরে,
ভুল হলে ফিরে আসার তাওফিক দাও জীবনে।

দরিদ্র, অসহায়, মজলুম যেন না হয় অবহেলিত,
আমাদের হাতে হোক তাদের অধিকার সুরক্ষিত।
কঠোরতা, কুটিলতা, হিংসা দূর করো প্রাণ,
তাকওয়া, বিনয়, সত্য ও দয়া হোক জীবনের গান।

দুনিয়ার ক্ষণিক মোহে যেন না হারাই পথ,
আখিরাতের চিরসুখ হোক আমাদের পরম রথ।
ঈমান নিয়ে জীবন কাটুক, ঈমানেই হোক শেষ,
তোমার রহমতে জান্নাত হোক আমাদের চির আবাসদেশ।

আমিন।

 

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ