Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

বিনয়ী মুমিনের মর্যাদা ও অহংকারীর পরিণতি - মোঃ মুজিবুর রহমান

বিনয়ী মুমিনের মর্যাদা ও অহংকারীর পরিণতি

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, পদ-পদবি, বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিতে নয়; মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ঈমান, তাকওয়া, বিনয়, সৎচরিত্র ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যে। দুনিয়ার চোখে যে মানুষটি সাধারণ, অসহায় কিংবা অবহেলিত বলে মনে হয়, আল্লাহর কাছে সে-ই হয়তো অত্যন্ত মর্যাদাবান। আবার দুনিয়ায় যে ব্যক্তি সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাবের অহংকারে নিজেকে বড় মনে করে, মানুষের সামনে দম্ভ প্রকাশ করে এবং সত্যকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, আখিরাতে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

এই গভীর সত্যটি রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত হারিসা ইবনু ওয়াহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“আমি কি তোমাদের জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে জানাব না? প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যাকে দুর্বল ও অবহেলিত মনে করা হয়; সে যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। আর আমি কি তোমাদের জাহান্নামবাসীদের সম্পর্কে জানাব না? প্রত্যেক কঠোর, উদ্ধত ও অহংকারী ব্যক্তি।”
—
সহীহ বুখারী: ৪৯১৮; সহীহ মুসলিম: ২৮৫৩।

এখানে “দুর্বল” বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়নি যে শারীরিকভাবে অক্ষম বলেই জান্নাতের অধিকারী হয়ে যাবে। বরং হাদিসের ব্যাখ্যায় এমন ব্যক্তির কথা এসেছে, যে বিনয়ী, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী এবং দুনিয়ার পদমর্যাদা ও বড়ত্বের মোহে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে না। অনেক সময় মানুষ তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেও আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা অনেক উঁচু হতে পারে।

দুনিয়ার চোখে ছোট, আল্লাহর কাছে বড়

আমরা সাধারণত মানুষের মূল্যায়ন করি তার পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, অর্থ-সম্পদ, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক অবয়ব ও পার্থিব প্রাচুর্যের দিকে নয়, বরং তার অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। তাই একজন দরিদ্র মানুষও আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারেন, আর একজন বিত্তবান ব্যক্তিও হতে পারেন আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়—যদি তার অন্তর অহংকার, অবাধ্যতা ও অন্যকে তুচ্ছ করার প্রবণতায় পূর্ণ থাকে।

বিনয়ী মানুষ নিজের মর্যাদা নিয়ে অহংকার করে না। সে অন্যকে ছোট করে নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। সে জানে—জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, সুস্থতা ও সম্মান—সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। তাই সে নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হয়, গর্বিত নয়।

“দুর্বল” হওয়া মানে হীন হওয়া নয়

হাদিসের “দুর্বল ও অবহেলিত” শব্দটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, প্রচুর সম্পদ নেই, বড় পরিচয় নেই; ফলে অনেকে তাদের গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু আল্লাহর কাছে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে।

তাই কাউকে দরিদ্র বলে অবজ্ঞা করা, সাধারণ পোশাক দেখে তুচ্ছ করা, কম শিক্ষিত বলে অপমান করা, পদমর্যাদা না থাকায় তাকে অসম্মান করা—মুসলিমের চরিত্র হতে পারে না।

কখনো কখনো যে মানুষটি নীরবে নামাজ পড়ে, গোপনে দান করে, কারও উপকার করে, অন্যের কষ্টে পাশে দাঁড়ায় এবং নিজের প্রশংসা চায় না—সেই মানুষটিই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হতে পারে।

বিনয় হলো ঈমানি সৌন্দর্য

বিনয় মানুষের ব্যক্তিত্বকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও মর্যাদাবান করে। বিনয়ী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করলে অহংকারী হয় না, সম্পদ পেলে উদ্ধত হয় না, ক্ষমতা পেলে জুলুম করে না এবং সম্মান পেলে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে না।

সে জানে—আজ যে সম্মান পেয়েছি, কাল তা চলে যেতে পারে; আজ যে শক্তি আছে, কাল তা নিঃশেষ হতে পারে; আজ যে সম্পদ আছে, কাল তা অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। কিন্তু ঈমান ও সৎকর্মই মানুষের প্রকৃত পাথেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” —সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।

অতএব, মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড হলো তাকওয়া; দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্য নয়।

অহংকার মানুষের পতনের কারণ

অহংকার মানুষের অন্তরের এমন একটি ব্যাধি, যা মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অহংকারী ব্যক্তি মনে করে—সে অন্যদের চেয়ে বড়, বেশি জ্ঞানী, বেশি সম্মানিত কিংবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সে উপদেশ গ্রহণ করতে চায় না, ভুল স্বীকার করতে চায় না এবং নিজের অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখতে চায় না।

অহংকারের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি মানুষকে সত্যের সামনে মাথা নত করতে বাধা দেয়। অথচ মুমিনের পরিচয় হলো, সত্য প্রকাশিত হলে সে তা গ্রহণ করবে; ভুল হলে ফিরে আসবে; অন্যায় করলে ক্ষমা চাইবে এবং আল্লাহর সামনে বিনীত থাকবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ অহংকার সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ তো সুন্দর পোশাক ও সুন্দর জিনিস পছন্দ করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। —সহীহ মুসলিম।

সুতরাং সুন্দর পোশাক পরা, পরিচ্ছন্ন থাকা বা বৈধভাবে সম্পদশালী হওয়া অহংকার নয়; বরং সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে হেয় করাই অহংকারের ভয়াবহ রূপ।

কঠোরতা, ঝগড়াটে স্বভাব ও অহংকার

হাদিসে জাহান্নামের মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে—কঠোর, উদ্ধত ও অহংকারী। এর অর্থ এই নয় যে, হাদিসের এই বর্ণনা দ্বারা প্রত্যেক ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বরং এসব নিন্দনীয় চরিত্র থেকে সতর্ক করা হয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যাতেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এখানে জান্নাতি ও জাহান্নামিদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে; এটি প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যাপারে সীমাবদ্ধ ও চূড়ান্ত তালিকা নয়।

তাই একজন মুসলমানের উচিত নিজের চরিত্র পরীক্ষা করা—আমি কি অকারণে ঝগড়া করি? আমি কি অন্যকে অপমান করি? আমি কি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারি? আমি কি দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে সম্মান করি? আমি কি সত্য কথা শুনলে তা গ্রহণ করি? আমি কি ক্ষমতা পেলে দুর্বল মানুষের ওপর প্রভাব খাটাই?

এই আত্মসমালোচনাই মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।

আল্লাহর ওপর ভরসা ও বিনয়

হাদিসে এমন বিনয়ী ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তার শপথ পূর্ণ করে দেন। এর দ্বারা তার বিশেষ মর্যাদা ও আল্লাহর নৈকট্য বোঝানো হয়েছে। এটি মানুষের জন্য কোনো অহংকারের বিষয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও আনুগত্যের শিক্ষা।

মুমিন তার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে, দায়িত্ব পালন করে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। সে জানে, মানুষের শক্তি সীমিত; কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা অসীম। তাই সে বিপদে হতাশ হয় না, সাফল্যে অহংকারী হয় না এবং ব্যর্থতায় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।

বিনয় মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়

ইসলামের বিনয় দুর্বলতা বা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার নাম নয়। একজন মুমিন বিনয়ী হবে, কিন্তু সত্যের ব্যাপারে দৃঢ় থাকবে। সে কাউকে অপমান করবে না, আবার নিজেও অন্যায়কে বৈধ মনে করবে না। সে ক্ষমা করতে জানবে, কিন্তু জুলুমকে সমর্থন করবে না। সে নম্রভাবে কথা বলবে, কিন্তু সত্যকে গোপন করবে না।

অর্থাৎ ইসলামের বিনয় হলো—আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ, মানুষের সঙ্গে সদাচরণ এবং সত্যের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা।

পরিবার ও সমাজে বিনয়ের প্রয়োজন

একটি পরিবারে যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্মান করে, সন্তানকে ভালোবাসে, বড়রা ছোটদের স্নেহ করে এবং ছোটরা বড়দের সম্মান করে—তাহলে পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে অহংকার, কটু কথা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, জেদ ও অকারণ ঝগড়া পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে। একইভাবে সমাজেও ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি দুর্বলকে সম্মান করেন, ধনী ব্যক্তি দরিদ্রের পাশে দাঁড়ান, জ্ঞানী ব্যক্তি অজ্ঞকে তুচ্ছ না করেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করেন—তাহলে সমাজে মানবিকতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।

প্রকৃত সফলতা কোথায়?

দুনিয়ার সফলতার সংজ্ঞা অনেক সময় সম্পদ, পদ ও খ্যাতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে মুক্তি লাভ।

একজন মানুষ দুনিয়ায় হয়তো অখ্যাত, কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রিয়। আবার কেউ দুনিয়ায় বিখ্যাত, কিন্তু নিজের অন্তরের অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ করতে হবে। মানুষের চোখে বড় হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের করণীয়

এই হাদিস আমাদের জীবনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—

প্রথমত, কাউকে তার দারিদ্র্য, সাধারণ জীবন বা সামাজিক অবস্থানের কারণে তুচ্ছ করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, নিজের জ্ঞান, সম্পদ, পদ-পদবি ও ক্ষমতা নিয়ে অহংকার করা যাবে না।

তৃতীয়ত, সত্য কথা শুনলে তা গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, অকারণ ঝগড়া, কটু কথা, রূঢ় আচরণ ও মানুষকে অপমান করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

পঞ্চমত, আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখতে হবে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সৎকর্ম করতে হবে।

ষষ্ঠত, ভুল হলে তা স্বীকার করে তওবা করতে হবে।

সপ্তমত, অসহায়, দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।

অষ্টমত, নিজের অন্তরকে নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে—আমার মধ্যে অহংকার, হিংসা, আত্মম্ভরিতা বা অন্যকে তুচ্ছ করার প্রবণতা জন্ম নিচ্ছে কি না।

উপসংহার

মানুষের প্রকৃত বড়ত্ব বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, অন্তরের পবিত্রতায়; প্রকৃত মর্যাদা সম্পদে নয়, তাকওয়ায়; প্রকৃত শক্তি মানুষকে দমন করার মধ্যে নয়, বরং নিজের অহংকারকে দমন করার মধ্যে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার চোখে যাকে দুর্বল, সাধারণ বা অবহেলিত মনে করা হয়, সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারে; আর যে ব্যক্তি অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ও মানুষকে তুচ্ছ করে, সে নিজের আখিরাতকে বিপন্ন করে।

তাই আসুন, আমরা মানুষের বাহ্যিক অবস্থান দেখে নয়, তার চরিত্র ও তাকওয়ার মূল্য বুঝতে শিখি। অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা, ঝগড়ার পরিবর্তে শান্তি, অবজ্ঞার পরিবর্তে সম্মান এবং আত্মম্ভরিতার পরিবর্তে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকে জীবনের আদর্শ করি।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও আত্মম্ভরিতা থেকে পবিত্র করো। আমাদের বিনয়ী, সত্যনিষ্ঠ, তাকওয়াবান ও সৎচরিত্রবান বানাও। দুনিয়ার মানুষের চোখে নয়—তোমার কাছে প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দাও। আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি ঈমানের সঙ্গে করো এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করো। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ