Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৯ পূর্বাহ্ণ

আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরও কেন ভয় লাগে?

                          আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরও কেন ভয় লাগে?

আমরা অনেক সময় মনে মনে বলি, “আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি।” কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বুকের ভেতর অজানা ভয়, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা এসে ভর করে। ভবিষ্যৎ কী হবে? সমস্যার সমাধান হবে তো? প্রিয় মানুষটাকে হারাব না তো? আমার চাওয়া পূরণ হবে তো?

তখন মনে প্রশ্ন জাগে—আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরও যদি ভয় লাগে, তাহলে কি আমার ঈমান দুর্বল?

সবসময় এমন নয়।

ভয় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। আল্লাহর ওপর ভরসা করা মানে এই নয় যে একজন মানুষ আর কখনো ভয়, দুশ্চিন্তা বা কষ্ট অনুভব করবে না। বরং তাওয়াক্কুল হলো—ভয় থাকা সত্ত্বেও নিজের বিষয়টি আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং তাঁর ওপর আস্থা রাখা।

ভয় পাওয়া মানেই আল্লাহর ওপর ভরসা নেই—এটা নয়

মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। আর অজানা বিষয় থেকেই অনেক সময় ভয় জন্ম নেয়। আমরা জানি না আগামীকাল কী হবে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, আমাদের পরিকল্পনা সফল হবে কি না।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ভয় পাওয়া খুবই মানবিক।

নবী-রাসুলদের জীবনেও দুঃখ, বিপদ ও কঠিন পরিস্থিতি এসেছে। তাই ভয় বা দুশ্চিন্তা অনুভব করাটাকে নিজেই ব্যর্থতা মনে করা উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই ভয় আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

ভয় যদি আমাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়, দোয়া করতে শেখায় এবং নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে—তাহলে সেই ভয় আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধির একটি কারণও হতে পারে।

তাওয়াক্কুল মানে ভয়হীন জীবন নয়

তাওয়াক্কুলের অর্থ হলো আল্লাহর ওপর নির্ভর করা, কিন্তু নিজের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়।

আপনি পরীক্ষার আগে পড়াশোনা করবেন, তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন।

আপনি অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন, পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সুস্থতা চাইবেন।

আপনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিন্তা করবেন, পরামর্শ করবেন, ইস্তিখারা বা দোয়া করবেন—তারপর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবেন।

অর্থাৎ চেষ্টা আমার, ফলাফল আল্লাহর হাতে।

এই জায়গাটাই তাওয়াক্কুলের সৌন্দর্য।

আমরা অনেক সময় ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই

আমাদের ভয় পাওয়ার একটি বড় কারণ হলো—আমরা এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, যা আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

কেউ কী ভাববে, ভবিষ্যতে কী ঘটবে, কোনো সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, একটি কাজ সফল হবে কি না—এসবের অনেক কিছুই আমাদের হাতে নেই।

যখন আমরা প্রতিটি সম্ভাব্য ফলাফল নিজের ইচ্ছামতো করতে চাই, তখন মনের মধ্যে চাপ বাড়তে থাকে।

কিন্তু একজন মুমিন যখন মনে করে, “আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করব, এরপর যা হবে আল্লাহর হুকুমেই হবে”—তখন ধীরে ধীরে হৃদয়ে প্রশান্তি আসতে শুরু করে।

ভয় এলে কী করবেন?

ভয়কে জোর করে দূর করার চেষ্টা না করে প্রথমে নিজের অনুভূতিটাকে স্বীকার করুন।

নিজেকে বলুন, “হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু আমি একা নই। আমার রব আমার অবস্থা জানেন।”

তারপর আল্লাহর কাছে নিজের কথা খুলে বলুন। সুন্দর শব্দ সাজানোর প্রয়োজন নেই। নিজের ভাষায় বলুন—

“হে আল্লাহ, আমি জানি না সামনে কী আছে। আমি দুর্বল। আপনি সব জানেন। আমার জন্য যা কল্যাণকর, সেটাই নির্ধারণ করুন এবং আমার হৃদয়কে আপনার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট রাখুন।”

কুরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)

তাই ভয় যখন বাড়ে, তখন শুধু সমস্যাটার দিকে তাকিয়ে না থেকে সমস্যার মালিকের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি।

আল্লাহর ওপর ভরসা মানে একটি সুন্দর মানসিক অবস্থান

তাওয়াক্কুলের অর্থ এই নয় যে আপনি জানবেন সবকিছু আপনার ইচ্ছামতো হবে।

বরং এর অর্থ হলো—আপনি বিশ্বাস করবেন, আপনার অজানা বিষয়গুলো আল্লাহর অজানা নয়।

আপনি হয়তো জানেন না কেন একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আল্লাহ জানেন।

আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না কেন কোনো দোয়ার উত্তর দেরিতে আসছে। কিন্তু আল্লাহ জানেন।

আপনি হয়তো আজকের কষ্টের অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু আপনার রব আপনার পুরো জীবন, আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ—সবই জানেন।

তাই ভয় আসতেই পারে। চোখে পানি আসতেই পারে। মন অস্থির হতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজেকে মনে করিয়ে দিন—

“আমি সবকিছু বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমার রব সবকিছু জানেন।”

হয়তো তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটিই হলো এখানে—ভয় পুরোপুরি চলে যাওয়ার অপেক্ষা না করে, ভয় নিয়েই আল্লাহর ওপর ভরসা করা।

কারণ সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। কখনো কখনো সাহস মানে হলো—ভয় থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে যাওয়া।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ