সহকারী অধ্যাপক
০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
দাম্পত্যে আস্থা ও ভালোবাসা (সুন্দর পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি) - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
দাম্পত্যে আস্থা ও ভালোবাসা
(সুন্দর পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
মানুষ একা পৃথিবীতে জন্ম নেয়, কিন্তু একা জীবন কাটানোর জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম আশ্রয় এবং ভালোবাসা ও মূল্যবোধ শেখার প্রধান ক্ষেত্র। আর এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। তাদের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে একটি পরিবারের শান্তি, স্থিতি ও ভবিষ্যৎ। বিপরীতে দাম্পত্য জীবনে যখন সন্দেহ, অবিশ্বাস, অনাস্থা, অহংকার, কটু কথা, অবহেলা ও পারস্পরিক বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, তখন তার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা পুরো পরিবারকে অশান্ত করে এবং সন্তানদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে নিছক সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে দায়িত্ব, ভালোবাসা, রহমত, আমানত ও পারস্পরিক অধিকারের সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদেরই মধ্য থেকে জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)
অতএব, দাম্পত্যের সৌন্দর্য শুধু একই ছাদের নিচে বসবাসের মধ্যে নয়; বরং পরস্পরের জন্য প্রশান্তির আশ্রয় হয়ে ওঠার মধ্যেই তার প্রকৃত সৌন্দর্য।
দাম্পত্যে বিরোধের শুরু কোথা থেকে?
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। দুজন মানুষ একই পরিবারের সদস্য হলেও তাদের চিন্তা, অভ্যাস, রুচি, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা এক হবে—এমন কোনো কথা নেই। মতের অমিল থাকতেই পারে; কিন্তু মতের অমিল যেন হৃদয়ের অমিল হয়ে না যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় বিরোধের সৃষ্টি হয়। একটি অসম্পূর্ণ কথা, একটি অনুচিত মন্তব্য, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, সময়ের অভাব, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, পুরোনো ক্ষোভ কিংবা সন্দেহ—এসব ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। একসময় স্বামী ভাবতে পারেন, স্ত্রী তাকে বোঝেন না; স্ত্রী মনে করতে পারেন, স্বামী তাকে মূল্য দেন না। এরপর শুরু হয় নীরবতা, অভিমান, সন্দেহ ও অনাস্থা।
একটি সম্পর্ক তখনই দুর্বল হতে শুরু করে, যখন মানুষ সমস্যার সমাধান না করে একে অপরকে সমস্যার কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
অবিশ্বাস দাম্পত্যের শান্তি নষ্ট করে
বিশ্বাস দাম্পত্য জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যেখানে বিশ্বাস থাকে, সেখানে সামান্য ভুলও আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা যায়; কিন্তু যেখানে বিশ্বাস ভেঙে যায়, সেখানে নির্দোষ আচরণও সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অতিরিক্ত সন্দেহ মানুষের হৃদয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, সত্য গোপন করা, প্রতারণা, মিথ্যা বলা বা এমন কোনো আচরণ করা যা জীবনসঙ্গীর মনে অনাস্থা সৃষ্টি করে—এসবও সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে।
তবে সন্দেহের প্রতিকারও অন্যায় সন্দেহ, অপমান বা গুপ্ত অনুসন্ধান নয়। ইসলাম যাচাই ছাড়া ধারণা ও সন্দেহের অনুসরণ থেকে সতর্ক করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাক; নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ।”
(সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)
অতএব, দাম্পত্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে অনুমানকে সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে শান্তভাবে সত্য জানা, কথা বলা এবং ন্যায়সংগতভাবে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পোশাক
কুরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দর উপমায় প্রকাশ করেছে—
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষকে আবৃত করে, রক্ষা করে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের দুর্বলতা আড়াল করবে, সম্মান রক্ষা করবে এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়াবে।
জীবনসঙ্গীর দুর্বলতা নিয়ে অন্যের কাছে হাসাহাসি করা, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা, অপমান করা কিংবা পুরোনো ভুল বারবার সামনে এনে তাকে ছোট করা এই মহান সম্পর্কের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দাম্পত্য জীবনে প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত—জীবনসঙ্গী প্রতিপক্ষ নন; তিনি জীবনের পথচলার সঙ্গী।
ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, দায়িত্বও
ভালোবাসা শুধু মিষ্টি কথা বলার নাম নয়। ভালোবাসা হলো দায়িত্ব পালন, সম্মান করা, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, কষ্টের সময় সান্ত্বনা দেওয়া এবং ভুল হলে সুন্দরভাবে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
(জামে‘ আত-তিরমিজি)
এই শিক্ষা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায় ক্ষমতা দেখানোর মাধ্যমে নয়; বরং উত্তম চরিত্র, কোমল আচরণ, দায়িত্বশীলতা ও দয়ার মাধ্যমে।
রাগের মুহূর্তে সংযমই প্রকৃত শক্তি
দাম্পত্য জীবনে রাগ আসতেই পারে। কিন্তু রাগের মুহূর্তে বলা একটি কঠিন কথা অনেক বছরের ভালোবাসাকে আহত করতে পারে। তাই উত্তেজিত অবস্থায় সিদ্ধান্ত না নেওয়া, কণ্ঠস্বর নিচু রাখা এবং প্রয়োজন হলে কিছু সময় নীরব থাকা বিচক্ষণতার পরিচয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
(সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)
তাই দাম্পত্যে জয়ের অর্থ সঙ্গীকে পরাজিত করা নয়; বরং দুজনের মিলে সমস্যাকে পরাজিত করা।
কথার আঘাত অনেক গভীর
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কটু কথা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান, ব্যঙ্গ ও অবজ্ঞা ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে ক্ষয় করে। একটি সম্পর্কের দেয়ালে ইটের আঘাতের চেয়ে কথার আঘাত অনেক সময় বেশি গভীর ক্ষত তৈরি করে।
কুরআন সুন্দর কথা বলার শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন—
“মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:৮৩)
এই নির্দেশ পরিবারেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বাইরে সবার সঙ্গে ভদ্র আর ঘরে জীবনসঙ্গীর সঙ্গে রূঢ়—এটি সুন্দর চরিত্রের পরিচয় নয়।
অর্থনৈতিক সংকট যেন হৃদয়ের সংকটে পরিণত না হয়
সংসারে অর্থের প্রয়োজন আছে, কিন্তু অর্থই সংসারের সবকিছু নয়। সীমিত আয় ও অসীম চাহিদার সংঘাত থেকে অনেক পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করবেন; স্ত্রীও পরিবারের বাস্তব সামর্থ্য বুঝে সহযোগিতা করবেন। অপচয়, অযথা তুলনা ও লোকদেখানো জীবনযাপন দাম্পত্যে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩১)
তাই সংসারের শান্তির জন্য আয়-ব্যয়ের বিষয়ে পারস্পরিক পরামর্শ, স্বচ্ছতা ও সংযম প্রয়োজন।
সন্তানদের সামনে দাম্পত্য বিরোধের প্রভাব
সন্তান শুধু বাবা-মায়ের কথা শোনে না; তাদের আচরণও দেখে শেখে। বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান, ধৈর্য, সত্যবাদিতা ও সহযোগিতা সন্তানের চরিত্র গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বিপরীতে ঘন ঘন ঝগড়া, অপমান, ভয়ভীতি ও অবজ্ঞার পরিবেশ শিশুর নিরাপত্তাবোধ ও পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে স্বামী-স্ত্রীকে নিজেদের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, তার সামনে অন্য অভিভাবককে অপমান করা কিংবা তাকে দাম্পত্য দ্বন্দ্বের বিচারক বানানো উচিত নয়।
সন্তানের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার শুধু সম্পদ নয়; একটি শান্ত, নিরাপদ ও নৈতিক পরিবারও তার বড় সম্পদ।
আস্থা কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়?
ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস একদিনে ফিরে আসে না। কিন্তু আন্তরিক চেষ্টা, সত্যবাদিতা ও ধারাবাহিক ভালো আচরণের মাধ্যমে তা ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করা সম্ভব।
প্রথমত, ভুল হলে তা স্বীকার করতে হবে। নিজের ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢেকে রাখলে সম্পর্কের ক্ষত আরও গভীর হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও বিশ্বাস পুনর্গঠনের বড় মাধ্যম।
তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, পারিবারিক দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় গোপনীয়তা অনাস্থা বাড়াতে পারে।
চতুর্থত, পুরোনো ক্ষতকে বারবার উসকে না দিয়ে সংশোধিত বর্তমান আচরণকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়। গুরুতর অন্যায় হলে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
পঞ্চমত, নিয়মিত সময় দিতে হবে। শুধু একই ঘরে থাকা মানেই একসঙ্গে থাকা নয়। একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, দিনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং পরস্পরের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দাম্পত্য বন্ধনকে দৃঢ় করে।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব
ইসলাম স্বামীকে দায়িত্বশীল করেছে এবং স্ত্রীর অধিকারও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কুরআন বলে—
“নারীদের জন্য ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর রয়েছে দায়িত্ব।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮)
অতএব, দাম্পত্য জীবন একতরফা দাবি-দাওয়ার সম্পর্ক নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের সম্পর্ক।
স্বামী স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ করবেন, তার মর্যাদা রক্ষা করবেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করবেন। স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সম্মান, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়সংগত সহযোগিতার মাধ্যমে সংসারকে সুন্দর করতে ভূমিকা রাখবেন। উভয়েই আল্লাহকে ভয় করবেন এবং একে অপরের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকবেন।
সমস্যা হলে পরিবার ভাঙার আগে সমাধানের দরজা খোলা রাখা
কোনো দাম্পত্য সমস্যাকে ছোট করে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি মতবিরোধকে বিচ্ছেদের কারণ বানানোও সমাধান নয়। ইসলাম শান্তিপূর্ণ মীমাংসাকে গুরুত্ব দিয়েছে।
কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশ বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
“তোমরা যদি তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে তার একজন সালিশ পুরুষের পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ নারীর পরিবার থেকে নিযুক্ত করো; তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে সমন্বয় করে দেবেন।”
(সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সমস্যা গভীর হলে বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ ও বিচক্ষণ মুরব্বি বা উপযুক্ত পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তবে এমন কাউকে বেছে নিতে হবে, যিনি গোপনীয়তা রক্ষা করবেন, পক্ষপাত করবেন না এবং আগুনে ঘি ঢালার পরিবর্তে শান্তির পথ দেখাবেন।
ক্ষমা মানে ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়
দাম্পত্য জীবনে ক্ষমা অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। একই ভুল বারবার করে শুধু “ক্ষমা করো” বলা আস্থা পুনর্গঠনের বিকল্প হতে পারে না। সত্যিকারের সংশোধনের জন্য প্রয়োজন—ভুল স্বীকার, অনুতাপ, ক্ষতি পূরণের চেষ্টা এবং ভবিষ্যতে একই আচরণ থেকে বিরত থাকার দৃশ্যমান উদ্যোগ।
অন্যদিকে, যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে ভুল স্বীকার করে সংশোধনের চেষ্টা করছে, তার জন্য অতীতের ভুলকে চিরস্থায়ী শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করাও সম্পর্ককে সুস্থ হতে বাধা দেয়।
পারস্পরিক পরামর্শে গড়ে উঠুক সংসার
সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে চাপিয়ে না দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। কোথায় কীভাবে ব্যয় হবে, সন্তানদের শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এসব বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মতামত শুনলে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
পরিবারে “আমি” এবং “তুমি”-এর প্রতিযোগিতার পরিবর্তে “আমরা” শব্দটির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
“তোমার সংসার” নয়—“আমাদের সংসার”;
“তোমার সন্তান” নয়—“আমাদের সন্তান”;
“তোমার সমস্যা” নয়—“আমাদের সমস্যা”—এই মানসিকতাই দাম্পত্যকে দৃঢ় করে।
সন্তানদের জন্য কেমন পরিবার রেখে যেতে চাই?
প্রত্যেক বাবা-মায়ের নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমাদের সন্তানরা আমাদের কাছ থেকে কী শিখছে?
তারা কি শিখছে যে মতভেদ হলে চিৎকার করতে হয়?
নাকি শিখছে যে মতভেদ হলেও সম্মান বজায় রাখা যায়?
তারা কি শিখছে যে ভুল করলে সম্পর্ক ভেঙে দিতে হয়?
নাকি শিখছে যে ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথ খোলা থাকে?
তারা কি দেখছে যে ক্ষমতা মানেই কর্তৃত্ব?
নাকি দেখছে যে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও দয়া পরিবারের প্রকৃত শক্তি?
আজকের স্বামী-স্ত্রীর আচরণই আগামী প্রজন্মের সম্পর্কবোধ গঠনে ভূমিকা রাখবে। তাই সন্তানদের জন্য শুধু একটি বাড়ি নয়, একটি সুন্দর পারিবারিক সংস্কৃতি রেখে যাওয়া প্রয়োজন।
ইসলামী পরিবারে ভালোবাসার পরিবেশ
একটি আদর্শ মুসলিম পরিবারে থাকবে সালাতের প্রতি যত্ন, হালাল-হারামের সচেতনতা, সত্যবাদিতা, পরস্পরের অধিকার আদায়, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং আল্লাহর স্মরণ। সেখানে ভুল হলে সংশোধন থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না; মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; শাসন থাকবে, কিন্তু জুলুম থাকবে না; দায়িত্ব থাকবে, কিন্তু ভালোবাসার অভাব থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করে বলেন—
“আর তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।”
(সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:২৯)
দাম্পত্য জীবনে এই দয়া ও কোমলতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
একটি সুন্দর পরিবারের মূলমন্ত্র
দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর রাখতে কয়েকটি বিষয় হৃদয়ে ধারণ করা যায়—
বিশ্বাস রাখব, কিন্তু অন্ধ সন্দেহ করব না।
সত্য বলব, কিন্তু সত্যের নামে কষ্টদায়ক ভাষা ব্যবহার করব না।
ভুল হলে ক্ষমা চাইব, ক্ষমা করব এবং সংশোধনের চেষ্টা করব।
রাগ হলে থামব, ভাবব, তারপর কথা বলব।
সঙ্গীর দুর্বলতা প্রকাশ না করে তার মর্যাদা রক্ষা করব।
সন্তানের সামনে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখব।
সংসারের সিদ্ধান্তে পরামর্শ করব।
অভাব এলে একে অপরকে দোষ না দিয়ে সমাধান খুঁজব।
সুখ এলে কৃতজ্ঞ হব, দুঃখ এলে ধৈর্য ধরব।
সবশেষে মনে রাখব—আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই; আমরা একই পরিবারের দায়িত্বশীল দুই সঙ্গী।
উপসংহার
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিরোধ, অবিশ্বাস ও অনাস্থা কোনো পরিবারের জন্য কল্যাণকর নয়। তবে সম্পর্কের কোনো সংকট দেখা দিলেই সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়—এমনও নয়। আন্তরিকতা, সত্যবাদিতা, ক্ষমা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান, সুন্দর যোগাযোগ, ধৈর্য এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে বহু সম্পর্কেই নতুন করে শান্তির পথ তৈরি হতে পারে।
একটি পরিবার তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়, যখন সেখানে স্বামী স্ত্রীর প্রতিপক্ষ নয়, স্ত্রী স্বামীর প্রতিপক্ষ নয়; বরং উভয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে একে অপরের সহায়ক। যেখানে ভালোবাসা আছে, সেখানে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে; যেখানে বিশ্বাস আছে, সেখানে সন্দেহের অন্ধকার কমে; যেখানে শ্রদ্ধা আছে, সেখানে মতপার্থক্যও সম্পর্ক ভাঙতে পারে না; আর যেখানে আল্লাহর ভয় আছে, সেখানে অধিকার হরণ ও জুলুমের প্রবণতা কমে আসে।
তাই আজ থেকেই দাম্পত্য জীবনে নতুন অঙ্গীকার হোক—
অবিশ্বাসের স্থানে আস্থা,
অনাস্থার স্থানে বিশ্বাস,
অভিমানের স্থানে আন্তরিকতা,
কঠোরতার স্থানে কোমলতা,
বিরোধের স্থানে সংলাপ,
অবহেলার স্থানে যত্ন,
আর দূরত্বের স্থানে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হোক।
কারণ একটি শান্ত পরিবার শুধু স্বামী-স্ত্রীর সুখের জন্য নয়—এটি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনেরও অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোতে ভালোবাসা, রহমত, শান্তি, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক সম্মান দান করুন; ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন; সন্তানদের নেক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দিন এবং প্রতিটি পরিবারকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
১৭
২৮ মন্তব্য