সহযোগী অধ্যাপক
০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৪৫ অপরাহ্ণ
এলপিজি গ্যাসের দাম বেশি নিলে করণীয় ২০২৬ | LPG Cylinder Overprice Complaint Bangladesh
এলপিজি গ্যাসের দাম বেশি নিলে করণীয় ২০২৬ | LPG Cylinder Overprice Complaint Bangladesh
সরকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন। দোকানে গিয়ে দেখা যাচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। দাম বাড়ার ঘোষণার আগের দুই-তিন সপ্তাহ ধরেই বাজারে এই সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগ চলছিল।
এই পোস্টে জানুন — বাজারে আসলে কী দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, সংকটটা আসল নাকি কৃত্রিম, সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, এবং সবচেয়ে জরুরি — আপনার কাছ থেকে বেশি দাম নিলে কোথায়, কীভাবে অভিযোগ করবেন।
বাজারে আসলে কত দামে বিক্রি হচ্ছে?
অক্টোবরের নতুন সরকারি দাম ঘোষণার আগেই, সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১,৫৮৫ টাকা, অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছিল ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায়। কোনো কোনো এলাকায় ২,২০০ থেকে ২,৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সরকারি দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি!
এখন অক্টোবরের নতুন দাম (১,৮৩৭ টাকা) কার্যকর হওয়ার পর বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয় কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে — সরকারি দাম আর বাজারের দামের এই ফারাক সহজে কমে না, বিশেষ করে সরবরাহে টানাপোড়েন থাকলে।
সংকট কি আসল, নাকি কৃত্রিম?
এই প্রশ্নে দুই পক্ষের বক্তব্য দুই রকম। নতুন দাম ঘোষণার আগের দুই সপ্তাহে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে ব্যবসায়ীরা সংকটের কথা অস্বীকার করে আসছিলেন।
অনেক ভোক্তা ও পর্যবেক্ষকের অভিযোগ — সংকটটি কৃত্রিম। দাম বাড়ার আগাম আভাস পেয়ে কিছু অপারেটর সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল, যাতে বাড়তি দামে বিক্রি করা যায়। কেউ কেউ এমনও দাবি করেছিলেন, দাম বাড়ানো হলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
অন্যদিকে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন (LOAB) বলছে, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই এবং চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত আমদানি হচ্ছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রতি মাসে দেশে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আসে — আগস্টে এসেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১৯ হাজার টন।
কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ আমলে নিয়ে বিইআরসি ১২টি এলপিজি আমদানিকারকের কাছ থেকে সেপ্টেম্বরের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) আমদানি তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে কমানো হয়েছিল কিনা, তা এখন তদন্তের আওতায়।
সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, তা তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে — কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি বা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দাম ঘোষণার আগের দিন মন্ত্রণালয়ে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।
এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত শনিবার ঢাকা মহানগরসহ দেশের ১৬ জেলায় এলপিজি বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ তদারকি অভিযান চালানো হয়। ২৩টি দলের অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বেশি দাম নিলে কোথায় অভিযোগ করবেন?
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করলে বা কোনো ধরনের অনিয়ম দেখলে আপনার অভিযোগ জানানোর একাধিক মাধ্যম রয়েছে:
১. ভোক্তা অধিকার হটলাইন — ১৬১২১
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই হটলাইন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। কোনো ডিলার বা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিলে সরাসরি এই নম্বরে কল করে অভিযোগ করতে পারবেন।
২. অনলাইনে অভিযোগ
ভোক্তা অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে অভিযোগ দায়ের করা যায়। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রের মোবাইল নম্বর ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮-এ যোগাযোগ করেও অভিযোগ জানানো যাবে।
৩. বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করে অভিযোগ দায়ের করা যায়। এছাড়া প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও অভিযোগ করা যাবে।
অভিযোগে কী কী তথ্য দেবেন?
অভিযোগ কার্যকর করতে হলে নিচের তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন:
কী অনিয়ম হয়েছে (যেমন: নির্ধারিত দামের চেয়ে কত বেশি নেওয়া হয়েছে)
কোথায় হয়েছে (দোকানের নাম ও ঠিকানা)
কে বা কোন প্রতিষ্ঠান করেছে (বিক্রেতা/ডিলারের নাম)
কবে ঘটনাটি ঘটেছে
প্রমাণ হিসেবে কেনার রশিদ, দোকানের ছবি বা ভিডিও থাকলে সেটিও জমা দিন। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভোক্তারা নিজেরাই অভিযোগ দায়ের করতে পারেন — কোনো আইনজীবী বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঠকা এড়াতে ৭টি কার্যকর টিপস
১. বিইআরসির মূল্য তালিকা জেনে যান
কেনার আগে অক্টোবর ২০২৬-এর সরকারি দাম জেনে নিন — ১২ কেজি ১,৮৩৭ টাকা, প্রতি কেজি ১৫৩.০৬ টাকা। দোকানে গিয়ে এই হিসাব মিলিয়ে নিন।
২. অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে কিনুন
পরিচিত ও অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনুন। অপরিচিত ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে কেনার সময় বাড়তি সতর্ক থাকুন।
৩. রশিদ অবশ্যই নিন
দাম, তারিখ ও দোকানের নামসহ রশিদ সংরক্ষণ করুন। বেশি দামের অভিযোগ করতে গেলে এই রশিদই আপনার প্রধান প্রমাণ।
৪. সিল ও ওজন যাচাই করুন
সিলিন্ডারের সিল অক্ষত আছে কিনা দেখুন। সম্ভব হলে ওজন মিলিয়ে নিন — ১২ কেজি সিলিন্ডারে গ্যাস থাকতে হবে ১২ কেজিই।
৫. কয়েকটি দোকানে দাম যাচাই করুন
এক দোকানের কথায় কিনবেন না। আশপাশের দুই-তিনটি দোকানে দাম জিজ্ঞেস করে তুলনা করুন।
৬. সংকটের গুজবে প্যানিক বায়িং করবেন না
"গ্যাস পাওয়া যাবে না" — এমন গুজবে আতঙ্কিত হয়ে বেশি দামে মজুত করবেন না। এতে কৃত্রিম সংকট আরও বাড়ে।
৭. বেশি দাম চাইলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করুন
১৬১২১ নম্বরে কল করুন অথবা অনলাইনে অভিযোগ দায়ের করুন। যত বেশি ভোক্তা অভিযোগ করবেন, তত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোক্তা হিসেবে আপনার অধিকার
মনে রাখবেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য কেনা আপনার আইনগত অধিকার। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের লঙ্ঘন। সম্প্রতি ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার ঘটনা প্রমাণ করে — অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাই চুপ করে বেশি দাম দিয়ে নয়, সচেতন হয়ে অধিকার আদায় করুন।
অক্টোবর ২০২৬-এর সম্পূর্ণ সরকারি দামের তালিকা (সব সাইজের সিলিন্ডার ও অটোগ্যাস) দেখতে আমাদের "এলপিজি গ্যাসের দাম অক্টোবর ২০২৬" পোস্টটি পড়ুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দোকানদার ১২ কেজি সিলিন্ডারের বেশি দাম চাইলে কী করব?
প্রথমে বিইআরসির নির্ধারিত দাম (অক্টোবর ২০২৬-এ ১,৮৩৭ টাকা) জানিয়ে দিন। না মানলে রশিদসহ ভোক্তা অধিকার হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করুন।
এলপিজির বাড়তি দামের অভিযোগ কোথায় করব?
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ (২৪ ঘণ্টা), অনলাইন পোর্টাল, মোবাইল ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮, বিভাগীয় কার্যালয় অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করা যায়।
অভিযোগ করতে কি টাকা লাগে বা উকিল লাগে?
না। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভোক্তারা নিজেরাই বিনামূল্যে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। কোনো আইনজীবীর প্রয়োজন নেই।
বাজারে এলপিজির সংকট কি সত্যি?
এ নিয়ে মতভেদ আছে। ভোক্তাদের অভিযোগ — দাম বাড়ার আগে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল। ব্যবসায়ী ও LOAB সংকট অস্বীকার করেছে। বিইআরসি ১২টি আমদানিকারকের তথ্য যাচাই করছে।
সরকার বেশি দাম নেওয়ার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
জেলা প্রশাসকদের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ভোক্তা অধিদপ্তর ১৬ জেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে।
সরকারি দামে সিলিন্ডার কোথায় পাব?
অনুমোদিত ডিলারদের সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হয়। দোকানে বিইআরসির মূল্য তালিকা দেখতে চান এবং রশিদ নিন।
সিলিন্ডারে গ্যাস কম দিলে কী করব?
ওজন যাচাই করে কম পেলে সেটিও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন — একইভাবে ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করতে পারবেন। কেনার সময় সিল অক্ষত আছে কিনা দেখে নিন।
নতুন দাম কবে থেকে কার্যকর?
৪ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা থেকে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই দাম বহাল থাকবে।
১
২ মন্তব্য