Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৮ অপরাহ্ণ

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬

আজ ৫ অক্টোবর—বিশ্ব শিক্ষক দিবস।

প্রতিবছর এই দিনটি আসে, আমরা শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানাই, ফুল দিই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দর সুন্দর কথা লিখি। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমার মনে হয় শিক্ষককে স্মরণ করার জন্য একটি দিন যথেষ্ট নয়। কারণ শিক্ষকতা কোনো নির্দিষ্ট দিনের পেশা নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব, প্রতিদিনের অপেক্ষা, প্রতিদিনের স্বপ্ন এবং কখনো কখনো নীরব আত্মত্যাগের নাম।


একজন শিক্ষক যখন সকালে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন তাঁর সামনে শুধু কিছু শিক্ষার্থী বসে থাকে না সেখানে বসে থাকে অনেকগুলো স্বপ্ন, অনেকগুলো সম্ভাবনা এবং অনেকগুলো অজানা ভবিষ্যৎ।


এদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন ডাক্তার হবে, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, আবার কেউ উদ্যোক্তা হবে। তবে আমি শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে একটু বেশি উৎসাহিত করি। কারণ উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে একজন তরুণ নিজের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারে এবং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর পাশাপাশি একজন সফল উদ্যোক্তা নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি করে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। তাই আমি চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, ভবিষ্যতে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলুক। আবার কেউ হয়তো কোনো বড় পদে যাবে না; কিন্তু একজন সৎ, মানবিক ও ভালো মানুষ হয়ে পরিবার ও সমাজের পাশে দাঁড়াবে।


কখনো একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, কখনো আত্মবিশ্বাস হারায়, কখনো ভুল পথে হাঁটতে শুরু করে। তখন একজন শিক্ষক শুধু বিষয়ের শিক্ষক থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন একজন পথপ্রদর্শক, কখনো অভিভাবক, কখনো নীরব আশ্রয়। শিক্ষকতার এই জায়গাটিই আমাকে স্পর্শ করে।


আমরা হয়তো হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পড়াই; কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সত্যিকার অর্থে ভালো কিছু পরিবর্তন আনতে পারলে সেই একটি অর্জনই একজন শিক্ষকের জীবনের অনেক বড় সাফল্য। একটি কথা প্রচলিত আছে-

“একজন শিক্ষক সেই প্রদীপ যিনি নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দেন।”

এই কথাটির মধ্যে শিক্ষকতার এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। শিক্ষক অন্যকে আলো দেখাতে গিয়ে নিজের সময়, শ্রম, মেধা ও জীবনের একটি বড় অংশ দিয়ে দেন। তাঁর নিজের সাফল্যের চেয়ে শিক্ষার্থীর সাফল্য অনেক সময় বেশি আনন্দের হয়ে ওঠে।


একজন শিক্ষক জ্ঞানের যে বীজ বপন করেন তার ফল হয়তো তিনি সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পান না। কিন্তু সেই বীজ কোনো একদিন একজন শিক্ষার্থীর চিন্তায়, চরিত্রে, কর্মে এবং মানুষের প্রতি তার আচরণে বৃক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।


১৯৬৬ সালে ILO ও UNESCO শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে যে সুপারিশ প্রণয়ন করেছিল, ২০২৬ সালে তার ৬০ বছর পূর্ণ হলো। ছয় দশক পরও সেই সুপারিশের গুরুত্ব কমেনি। বরং প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর এই সময়ে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বেড়েছে।


আজকের শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবই জানলেই হয় না। তাঁকে প্রযুক্তি জানতে হয়, নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি জানতে হয়, শিক্ষার্থীর মানসিক জগৎ বুঝতে হয় এবং একই সঙ্গে তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখাতে হয়।

তাই একজন শিক্ষককে শুধু দায়িত্ব দিতে হলে হবে না; তাঁকে সেই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও দিতে হবে।

প্রয়োজন—

• ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন-কাঠামো

• সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ

• নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের সুযোগ

• প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ

• পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তিগত সহায়তা

• শিক্ষা-নীতিনির্ধারণে শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন

• পেশাগত স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা

• এবং সর্বোপরি, একজন শিক্ষকের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি।


শিক্ষককে শুধু শিক্ষক দিবসে সম্মান জানানোই যথেষ্ট নয়। তাঁর প্রতিদিনের কাজকে সম্মান করতে হবে। তাঁর মতামত শুনতে হবে। তাঁর সমস্যাগুলো বুঝতে হবে। তাঁকে নতুন করে শেখার সুযোগ দিতে হবে। কারণ একজন শিক্ষক নিজে যত বেশি শিখবেন, তাঁর শিক্ষার্থীরাও তত বেশি সমৃদ্ধ হবে।


আমি একজন শিক্ষক।

প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে যখন শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকাই তখন মনে হয় আমাদের হাতে আসলে কত বড় একটি দায়িত্ব! একটি ভুল কথা একজন শিক্ষার্থীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আবার একটি সঠিক কথা তাকে সারাজীবনের জন্য সাহসী করে তুলতে পারে। আবার একটি বিশ্বাস তাকে অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস দিতে পারে। তাই শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু চাকরি নয়। এটি মানুষের জীবনকে একটু ভালো করার সুযোগ। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে আলো তুলে দেওয়ার সুযোগ। এটি নিজের জীবনের একটি অংশ অন্যের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করার সুযোগ। হয়তো একজন শিক্ষক তাঁর জীবদ্দশায় জানতে পারেন না কতজন শিক্ষার্থীর জীবনে তাঁর একটি কথা, একটি পরামর্শ কিংবা একটি ছোট্ট উৎসাহ কত বড় প্রভাব ফেলেছে।


কিন্তু এটাই শিক্ষকতার সৌন্দর্য।


শিক্ষক বীজ বপন করেন; সময় তার ফল ফলায়।

এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সকল শিক্ষককে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। শ্রদ্ধা সেই সব শিক্ষকের প্রতি, যাঁরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, শিক্ষার্থীদের পাশে থাকেন এবং নীরবে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে চলেন।

বিশেষ শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁদের অনেক শিক্ষার্থী হয়তো আজ তাঁদের কথা মনে রাখে না; কিন্তু কোনো একদিন জীবনের কঠিন মুহূর্তে শিক্ষকের শেখানো একটি কথা তাদের পথ দেখায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ