Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ

সূরা আল-মুযযাম্মিলের আলোকে আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও সফল জীবনের পথ -মোঃ মুজিবুর রহমান

সূরা আল-মুযযাম্মিলের আলোকে আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও সফল জীবনের পথ

(রাতের ইবাদত, কুরআনের আলো ও ধৈর্যের শক্তিতে গড়ে উঠুক ঈমানদীপ্ত জীবন)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

যাঁর কৃপায় প্রাণে জাগে আশার নবোদয়,
যাঁর দানে জীবন ভরে শান্তি ও নির্ভয়।

পবিত্র কুরআন মানুষের জন্য শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি মানুষের জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ। মানুষের অন্তর যখন দুশ্চিন্তা, ভয়, দুর্বলতা ও অস্থিরতায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন কুরআনের বাণী তাকে আলোর পথ দেখায়। আর যখন মানুষ সত্যের পথে চলতে গিয়ে বাধা, বিরোধিতা ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তখন কুরআন তাকে ধৈর্য, সাহস ও আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়।

সূরা আল-মুযযাম্মিল কুরআনের ৭৩তম সূরা। এটি মাক্কী সূরা এবং এতে ২০টি আয়াত রয়েছে। সূরাটির শুরুতেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে ‘মুযযাম্মিল’—অর্থাৎ বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি বলে সম্বোধন করেছেন। এই সূরায় বিশেষভাবে রাতের ইবাদত, কুরআন ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত, আল্লাহর স্মরণ, তাঁর ওপর নির্ভরতা, বিরোধীদের কথায় ধৈর্য ধারণ, সুন্দরভাবে তাদের এড়িয়ে চলা এবং আখিরাতের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

সূরাটির শেষ আয়াতে মানুষের সাধ্য ও বাস্তবতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। অসুস্থতা, জীবিকার অনুসন্ধান এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামের মতো বিভিন্ন দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে যতটুকু সহজ হয় ততটুকু কুরআন তিলাওয়াত, সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে সূরাটি ইবাদত ও দায়িত্বের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

রাতের নীরবতায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক

সূরা আল-মুযযাম্মিলের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো রাতের ইবাদত। মহান আল্লাহ বলেন—

“হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রে কিয়াম কর, তবে কিছু অংশ ছাড়া।”

রাতের সময় পৃথিবী যখন নীরব হয়ে যায়, মানুষের ব্যস্ততা যখন থেমে আসে, তখন বান্দা একান্তভাবে তার রবের সামনে দাঁড়াতে পারে। দিনের কোলাহল থেকে দূরে রাতের ইবাদত মানুষের অন্তরকে গভীরভাবে আল্লাহমুখী করে।

তবে রাতের ইবাদত কেবল বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকার নাম নয়; এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইখলাস, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। বান্দা যখন নির্জনে তার রবের সামনে দাঁড়ায়, নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে, ক্ষমা চায় এবং দোয়া করে, তখন তার অন্তর থেকে অহংকার, গাফিলতি ও দুনিয়ামুখী আসক্তি ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে।

রাতের ইবাদত মানুষকে দিনের দায়িত্ব পালনের জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। তাই একজন মুমিনের জীবনে রাতের নীরব ইবাদত হতে পারে আত্মিক শক্তির অন্যতম উৎস।

কুরআন তিলাওয়াত হোক ধীরস্থির ও হৃদয়গ্রাহী

মহান আল্লাহ বলেন—

“আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরস্থির ও স্পষ্টভাবে।”

এখানে কুরআন তিলাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—তারতীল। অর্থাৎ তাড়াহুড়ো না করে স্পষ্ট উচ্চারণে, মনোযোগসহকারে এবং ভাবার্থ উপলব্ধির চেষ্টা করে কুরআন পড়া।

কুরআন শুধু সুন্দর কণ্ঠে পড়লেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; এর শিক্ষা জীবনে ধারণ করাই মূল উদ্দেশ্য। কুরআনের আয়াত মানুষের চোখে অশ্রু আনবে, অন্তরে ভয় সৃষ্টি করবে, ভালো কাজে উৎসাহিত করবে এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখবে—এটাই কুরআনের প্রকৃত প্রভাব।

তাই কুরআন পাঠের সঙ্গে প্রয়োজন বোঝা, চিন্তা করা ও আমল করা। কুরআনের আলো ঘরে থাকলেই হবে না; সেই আলো চরিত্রে, আচরণে, পরিবারে, সমাজে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হতে হবে।

কুরআন হলো গুরুভার দায়িত্ব

মহান আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করতে যাচ্ছি এক গুরুভার বাণী।”

কুরআন ‘গুরুভার বাণী’—কারণ এটি মানুষের জীবন ও সমাজকে সত্য, ন্যায় ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে পরিচালিত করে। কুরআনের বিধান মানার অর্থ শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত পালন নয়; বরং বিশ্বাস, চরিত্র, লেনদেন, পরিবার, সমাজ ও ন্যায়বিচার—সব ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করা।

কুরআনের দায়িত্ব গ্রহণকারী মানুষকে তাই নিজের জীবন সংশোধনের পাশাপাশি সত্যের পথে মানুষকে আহ্বান করার দায়িত্বও পালন করতে হয়। এই দায়িত্ব সহজ নয়। এজন্য প্রয়োজন ঈমানের দৃঢ়তা, ইখলাস, জ্ঞান, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা।

রাতের ইবাদত আত্মশক্তি গড়ে তোলে

আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত প্রবৃত্তি দমনে অধিক কার্যকর এবং বাকস্ফুরণের জন্য বেশি উপযোগী।”

রাতের ইবাদত মানুষের নফসকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যে ব্যক্তি দিনের ব্যস্ততার পাশাপাশি রাতের কিছু সময় আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে, সে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায়।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ বাহ্যিকভাবে অনেক উন্নত হলেও মানসিক অস্থিরতা, হতাশা, লোভ, হিংসা, অহংকার ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো অন্তরের শূন্যতা। আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে।

সুতরাং রাতের ইবাদত শুধু অতিরিক্ত একটি আমল নয়; এটি আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধির একটি প্রশিক্ষণ।

দিনের ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ

আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই দিনের বেলা রয়েছে তোমার দীর্ঘ ব্যস্ততা।”

মানুষ দিনের বেলায় জীবিকা অর্জন করে, পরিবার পরিচালনা করে, শিক্ষা গ্রহণ করে, সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। ইসলাম এসব দায়িত্ব থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না। বরং বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জন, পরিবারকে দেখাশোনা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করাও সওয়াবের কারণ হতে পারে—যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়।

তবে ব্যস্ততা যেন মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়। মানুষের হাতে কাজ থাকবে, কিন্তু অন্তরে থাকবে আল্লাহর স্মরণ। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যেও সালাত, কুরআন, জিকির ও দোয়ার জন্য সময় রাখতে হবে।

আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল

সূরায় বলা হয়েছে—

“তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; সুতরাং তাঁকেই তোমার কর্মবিধায়ক বা ভরসাস্থল হিসেবে গ্রহণ কর।”

এ আয়াত তাওহিদের একটি মৌলিক শিক্ষা বহন করে। পূর্ব-পশ্চিমের মালিক, সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ। তাই চূড়ান্ত ভরসা তাঁর ওপরই রাখতে হবে।

তবে তাওয়াক্কুল মানে দায়িত্ব ছেড়ে বসে থাকা নয়। বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে চেষ্টা করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। কৃষক জমি চাষ করবে, বীজ বপন করবে, পানি দেবে—তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। ছাত্র পড়াশোনা করবে, পরিশ্রম করবে—তারপর সফলতার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইবে।

বিরোধিতার মুখে ধৈর্য ও সুন্দর আচরণ

মহান আল্লাহ বলেন—

“কাফিররা যা বলে তাতে ধৈর্য ধারণ কর এবং সুন্দরভাবে তাদের বর্জন কর।”

সত্যের পথে চলতে গেলে বিরোধিতা আসতে পারে। কটূক্তি, উপহাস, অপবাদ কিংবা বাধার সম্মুখীন হওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু একজন মুমিনের পরিচয় হলো—সে অন্যায়ের জবাবে অন্যায়কে নিজের চরিত্রে স্থান দেয় না।

ধৈর্য মানে দুর্বলতা নয়; বরং ধৈর্য হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি। প্রতিটি উত্তরের জবাব মুখ দিয়ে দিতে হয় না, প্রতিটি অপমানের প্রতিশোধ নিতে হয় না। কখন কোথায় কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকতে হবে—এ জ্ঞানও ইসলামী প্রজ্ঞার অংশ।

দুনিয়ার অহংকারের পরিণতি

সূরায় সত্য অস্বীকারকারী ও বিত্তশালী লোকদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি মানুষকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে না।

আজ মানুষ অর্থ, বাড়ি, গাড়ি, পদমর্যাদা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে এসব কিছুই সঙ্গে যাবে না। সঙ্গে যাবে ঈমান ও আমল।

তাই সম্পদ অর্জন অপরাধ নয়; অপরাধ হলো সম্পদের অহংকার করা, হারাম পথে উপার্জন করা, মানুষের অধিকার নষ্ট করা এবং আল্লাহকে ভুলে যাওয়া।

আখিরাতের ভয়াবহ সতর্কবার্তা

সূরা আল-মুযযাম্মিলের মধ্যভাগে জাহান্নামের শাস্তির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ভারী শিকল, প্রজ্বলিত আগুন, গলায় আটকে যাওয়া খাদ্য এবং কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এগুলো মানুষের অন্তরে আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। যে ব্যক্তি জানে তাকে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সে অন্যের অধিকার হরণ করতে ভয় পাবে, জুলুম করতে ভয় পাবে, হারাম উপার্জন করতে ভয় পাবে এবং গোপন পাপ থেকেও নিজেকে সংযত রাখবে।

ফিরআউনের ঘটনা থেকে শিক্ষা

আল্লাহ বলেন—

“যেমন আমি ফিরআউনের কাছে রাসূল পাঠিয়েছিলাম।”

ফিরআউন ক্ষমতা, রাজত্ব ও প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। কিন্তু সে আল্লাহর রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

এ ঘটনা প্রমাণ করে—মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর সামনে সে দুর্বল। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। তাই ক্ষমতা ও সামর্থ্য পেলে অহংকার নয়, বরং আল্লাহর শুকরিয়া এবং মানুষের প্রতি ন্যায় ও দয়া প্রদর্শন করা উচিত।

কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা

সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্যও তুলে ধরা হয়েছে। পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে, পর্বতগুলো বালুর মতো হয়ে যাবে এবং আকাশ বিদীর্ণ হবে।

কিয়ামতের এমন ভয়াবহতা মানুষের পার্থিব মোহ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে পৃথিবীকে আমরা স্থায়ী মনে করি, সেই পৃথিবীই একদিন পরিবর্তিত হবে। তাই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

দুনিয়া হলো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র; আর আখিরাত হলো চূড়ান্ত ফলাফলের স্থান। বুদ্ধিমান মানুষ দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করে।

মানুষের জন্য মুক্তির পথ উন্মুক্ত

মহান আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয়ই এটি একটি উপদেশ; সুতরাং যার ইচ্ছা, সে তার রবের দিকে পথ অবলম্বন করুক।”

এই আয়াত মানুষের সামনে আশার দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ পথ দেখিয়েছেন; এখন মানুষকে সেই পথ গ্রহণ করতে হবে।

তাওবা, সালাত, কুরআন, জিকির, সৎকর্ম, দান, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের হক আদায়ের মাধ্যমে মানুষ তার রবের দিকে ফিরে যেতে পারে।

ইসলামে ভারসাম্য ও সহজতার শিক্ষা

সূরার শেষ আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ মানুষের বাস্তব অবস্থা জানিয়ে সহজতার বিধান দিয়েছেন। কেউ অসুস্থ হতে পারে, কেউ জীবিকার সন্ধানে সফর করতে পারে, কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে পারে। তাই যতটুকু সহজ হয় ততটুকু কুরআন পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে। ইসলাম মানুষকে সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না।

তবে সহজতার অর্থ দায়িত্বহীনতা নয়। বরং সাধ্য অনুযায়ী নিয়মিত আমল করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। অল্প হলেও নিয়মিত ও আন্তরিক আমল মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।

সালাত, যাকাত ও দানের শিক্ষা

শেষ আয়াতে সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান এবং আল্লাহর জন্য উত্তম দান করার নির্দেশ রয়েছে। এতে ইসলামের ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয় ফুটে ওঠে।

সালাত মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করে; যাকাত মানুষের সম্পদকে পবিত্র করে এবং দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে; আর আল্লাহর পথে দান মানুষের অন্তর থেকে কৃপণতা দূর করে।

তাই প্রকৃত ইসলামী জীবন হলো এমন জীবন, যেখানে আল্লাহর হক ও বান্দার হক—উভয়ই যথাযথভাবে আদায় করার চেষ্টা থাকে।

ভবিষ্যতের জন্য নেক আমল পাঠানো

আল্লাহ বলেন, মানুষ নিজের জন্য যে সৎকর্ম আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক পুরস্কারযোগ্য হিসেবে পাবে।

মানুষ ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করে, বাড়ি নির্মাণ করে, সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যায়। কিন্তু প্রকৃত দূরদর্শিতা হলো আখিরাতের জন্য আমল সঞ্চয় করা।

একটি দান, একটি সালাত, একটি সত্য কথা, একজন অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, কারও কষ্ট দূর করা—এসব নেক আমল আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে। দুনিয়ার সম্পদ মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা নেক আমলের প্রতিদান আখিরাতে পাওয়া যাবে।

ক্ষমা প্রার্থনার মহিমা

সূরার শেষ নির্দেশগুলোর একটি হলো—

“আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কখনো গুনাহ হয়ে যায়, কখনো দায়িত্বে ত্রুটি ঘটে, কখনো কথা বা আচরণে অন্যের কষ্ট হয়। কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে ভুলকে আঁকড়ে ধরে থাকে না; বরং আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।

ইস্তিগফার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, মানুষকে নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন করে এবং আল্লাহর রহমতের আশা জাগায়। তাই প্রতিদিন নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

আধুনিক জীবনে সূরা আল-মুযযাম্মিলের শিক্ষা

বর্তমান যুগে মানুষের হাতে প্রযুক্তি আছে, যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম আছে, অর্থনৈতিক সুযোগ আছে; কিন্তু অন্তরের প্রশান্তি অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা, প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ, সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় মানুষের অন্তরকে অস্থির করে তুলছে।

এই বাস্তবতায় সূরা আল-মুযযাম্মিল আমাদের কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—

প্রথমত, ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর জন্য সময় রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, রাতের ইবাদতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করতে হবে।
চতুর্থত, বিরোধিতা ও সংকটে ধৈর্য ধরতে হবে।
পঞ্চমত, চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলকে একসঙ্গে ধারণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, দুনিয়ার সম্পদকে লক্ষ্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সপ্তমত, আখিরাতের জবাবদিহিকে জীবনের সিদ্ধান্তগুলোর সামনে রাখতে হবে।
অষ্টমত, সাধ্য অনুযায়ী নিয়মিত আমল করতে হবে।
নবমত, সালাত, যাকাত, দান ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে জীবনকে আল্লাহমুখী করতে হবে।

উপসংহার

সূরা আল-মুযযাম্মিল যেন মুমিনের জন্য এক গভীর আত্মিক আহ্বান—জাগো, তোমার রবের দিকে ফিরে এসো; কুরআনের আলোয় নিজেকে গড়ে তোলো; রাতের নীরবতায় অন্তরকে পরিশুদ্ধ করো; দিনের দায়িত্বে নিষ্ঠাবান হও; বিরোধিতায় ধৈর্য ধরো; আল্লাহর ওপর ভরসা করো এবং আখিরাতের জন্য নেক আমল সঞ্চয় করো।

এই সূরা আমাদের শেখায়, প্রকৃত সফলতা শুধু দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা বা খ্যাতিতে নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, চরিত্র, ধৈর্য, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং আখিরাতের সফলতায়।

তাই আসুন, কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করি, সালাতকে জীবনের কেন্দ্র বানাই, রাতের কিছু সময় রবের স্মরণে ব্যয় করি, মানুষের অধিকার আদায় করি, অন্যায়ের জবাবে সংযমী হই এবং প্রতিদিনের জীবনে নেক আমল সঞ্চয় করি। কারণ একদিন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেমে যাবে; তখন আমাদের সঙ্গে থাকবে শুধু ঈমান, আমল এবং আল্লাহর রহমত।

হে আল্লাহ! সূরা আল-মুযযাম্মিলের শিক্ষা আমাদের অন্তরে ধারণ করার, কুরআন বুঝে পড়ার, তার বিধান অনুযায়ী জীবন গড়ার, সালাত ও ইবাদতে অবিচল থাকার, বিপদে ধৈর্য ধরার এবং আখিরাতের জন্য নেক আমল সঞ্চয় করার তৌফিক দাও। আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করো, আমাদের অন্তরকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করো এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো। আমিন।

 

মন্তব্য করুন