সহকারী অধ্যাপক
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ণ
মুযযাম্মিলের ডাক—রাতের আঁধারে কুরআনের আলো -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
মুযযাম্মিলের ডাক—রাতের আঁধারে কুরআনের আলো
(সূরা আল-মুযযাম্মিলের আলোকে আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আখিরাতের পথে এক কাব্যিক আহ্বান)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যাঁর কৃপায় প্রাণে জাগে আশার নবোদয়,
যাঁর দানে জীবন ভরে শান্তি ও নির্ভয়।
তাঁরই নামে জাগুক প্রাণ, মুছে যাক সব ভয়,
তাঁরই পথে চলুক জীবন, সত্য হোক আশ্রয়।
হে বস্ত্রাবৃত! জাগো এবার, রাত হয়েছে গভীর,
নীরব রাতে রবের ডাকে হও না আর অধীর।
রাতের কিছু অংশ জাগো, রবের কাছে দাঁড়াও,
কুরআনের মধুর বাণী হৃদয় দিয়ে পড়াও।
অর্ধরাত বা কম-বেশিতে দাঁড়াও আপন মনে,
রবের স্মরণে হৃদয় ভরাও অশ্রুসিক্ত ক্ষণে।
নিভৃত রাতে সিজদা করে বলো মনের কথা,
রবের রহমত ছাড়া কোথায় দূর হবে ব্যথা?
ধীরস্থিরে কুরআন পড়ো, তারতীলে তার বাণী,
আয়াতজুড়ে খুঁজে নাও তো হেদায়াতের পানি।
শুধু মুখে তিলাওয়াত নয়, হৃদয় দিয়ে শোনো,
কুরআনেরই আলোয় নিজের জীবনখানি গড়ো।
এ যে রবের গুরুভার সেই মহামূল্য বাণী,
এতে আছে সত্যপথের অমর আলোকখানি।
অন্ধকারে পথ দেখায়, ভাঙে মনের ভয়,
কুরআনেরই ছায়াতলে মুমিন শান্তি পায়।
রাতের ইবাদত অন্তরকে করে আরও পবিত্র,
নফসের বাঁধন শিথিল করে, করে হৃদয় নির্মল।
নীরব রাতে রবের কাছে কাঁদে যে বান্দা প্রাণে,
রহমতেরই আশা জাগে তার অশ্রুভেজা গানে।
দিনের বেলা ব্যস্ত জীবন, কত কাজের ধারা,
জীবিকারই সন্ধানেতে ছুটে মানুষ সারা।
তবু যেন ব্যস্ততায়ও রবকে না যায় ভুলি,
কাজের মাঝে জিকির থাকুক, মুখে থাকুক বুলি।
হালাল পথে রুজি খোঁজা, পরিবারকে দেখা,
সৎ পথে জীবন গড়া—ইবাদতেরই রেখা।
দুনিয়ার কাজ করো, তবে রবকে রেখো মনে,
রবের স্মরণ থাকলে শান্তি আসে প্রাণে।
পূর্ব-পশ্চিম, আসমান-জমিন—সবই তাঁর অধীন,
তাঁরই হুকুমে জগত চলে, তিনিই মহাশক্তিমান।
তিনি ছাড়া সত্য উপাস্য আর তো কেউই নয়,
তাঁরই ওপর ভরসা রাখো, দূর হবে সব ভয়।
তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয় যে কোনো কাল,
চেষ্টা করে রবের ওপর রাখো পূর্ণ আস্থার ঢাল।
বীজ বুনে কৃষক যেমন ফলের আশায় রয়,
চেষ্টা শেষে রবের ওপর ভরসাতেই জয়।
সত্যপথে চলতে গেলে আসবে বাধা-ভয়,
কেউ বলবে কটু কথা, কেউ করবে উপহাসময়।
তবু তুমি ধৈর্য ধরো, হারিয়ো না হুঁশ,
সুন্দরভাবে দূরে থেকো, রাখো না মনে রোষ।
অন্যায়েরও জবাব দিতে হবে ন্যায়ের ভাষায়,
মুমিনের পথ প্রতিহিংসার আগুনে কখনো নাহি ভাসে।
ক্ষমা, ধৈর্য, সংযম নিয়ে থাকো সত্যপথে,
আল্লাহ আছেন—এই বিশ্বাস রাখো দৃঢ়চিত্তে।
ধন-সম্পদ, মান-সম্মান, ক্ষমতা যতই থাক,
আল্লাহর বিধান ভুলে গিয়ে অহংকারে না হাঁট।
আজ যে মানুষ রাজাসনে, কাল সে মাটির ঘরে,
দুনিয়ার সব গর্ব একদিন যাবে ঝরে।
ফিরআউনের কথা স্মরণ করো—ক্ষমতার ছিল জোর,
অহংকারে সত্য অস্বীকার, করেছিল কত গর্ব।
রাসূল এল সত্যের বাণী নিয়ে তারই দ্বারে,
অবাধ্যতার পরিণামে ডুবে গেল সে স্রোতধারে।
ক্ষমতা যদি ন্যায়ের পথে না থাকে নিয়ন্ত্রিত,
সে ক্ষমতা একদিন হবে ধ্বংসেরই কারণ।
ধন যদি রবের পথে না হয় মানুষের কল্যাণ,
সে ধনও একদিন হবে আখিরাতে বিপর্যয়-প্রমাণ।
এসো তবে আখিরাতের দিনের কথা ভাবি,
কী নিয়ে যাব সেদিন আমরা—কী আছে হাতে, দেখি।
সেদিন কাঁপবে পৃথিবী, পর্বত হবে ধূলি,
মিথ্যা আশা ভেঙে যাবে, থাকবে না কোনো বুলি।
আকাশ সেদিন বিদীর্ণ হবে, কেঁপে উঠবে ধরণী,
মানুষ বুঝবে দুনিয়াজুড়ে ছিল কত ক্ষণস্থায়ী।
যে জীবনকে চিরস্থায়ী ভেবে ছিলাম মগ্ন,
সেই জীবনই শেষ হয়ে যাবে, হবে সবই ভগ্ন।
কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিন সামনে যখন আসবে,
সম্পদ, সন্তান, পদ-মর্যাদা কোনো কাজে না আসবে।
ঈমান, আমল, আল্লাহর রহমত—সেই হবে সম্বল,
সৎকর্মে যে জীবন গড়ে, তারই হবে সফল।
তাই আজই সময়, ফিরে এসো তোমার রবের ঘরে,
তাওবার অশ্রু ঝরুক চোখে, পাপের কালিমা ঝরে।
ভুল যদি হয়, ফিরে এসো, বন্ধ নয় তাওবার দ্বার,
রহমতেরই সাগর তিনি, ক্ষমার মালিক অপার।
সালাত কায়েম করো, রাখো রবের সঙ্গে যোগ,
সিজদাতে মাথা নত করে দূর করো অন্তররোগ।
যাকাত দিয়ে সম্পদ শুদ্ধ করো, মুছে দাও কৃপণতা,
অসহায়ের মুখে হাসি ফুটুক—এও মুমিনের মহত্ত্বতা।
আল্লাহর পথে দান করো, মনে রেখো তাঁর কথা,
যা কিছু দাও তাঁরই জন্য, হারাবে না তার ব্যথা।
দুনিয়াতে যা দাও তুমি তাঁর সন্তুষ্টির তরে,
আখিরাতে পাবে তার ফল বহুগুণে ফিরে।
মানুষ ভাবে সঞ্চয় করে হবে ভবিষ্যৎ নিরাপদ,
কিন্তু আসল সঞ্চয় হলো নেক আমলের সম্পদ।
বাড়ি-গাড়ি, ধন-দৌলত পড়ে থাকবে একদিন,
আমলনামার নেকি হবে সেদিন আসল সঙ্গী।
একটি ভালো কথা হয়তো বদলে দেবে প্রাণ,
একটি দান মুছে দিতে পারে দুঃখের অবসান।
একটি ক্ষমা, একটি হাসি, একটি সেবার হাত,
আল্লাহর কাছে হয়ে যেতে পারে মহামূল্যবান রাত।
অসুস্থ হলে সহজ করো, সাধ্যের বাইরে নয়,
দূর সফরে দায়িত্ব থাকে, তবু রবকে ভুলো না কভু।
জীবিকার তাগিদে ছুটো, বৈধ পথে করো কাজ,
আল্লাহর পথে চেষ্টা করো—এটাই মুমিনের সাজ।
কুরআন থেকে যতটুকু সহজ, ততটুকু পড়ো,
আয়াতের আলো হৃদয়ে নিয়ে জীবনখানি গড়ো।
কম হলেও নিয়মিত হও, আন্তরিক হও প্রাণে,
নেক আমলের সৌরভ ছড়াক তোমার জীবনখানে।
রাতের শেষে ভোর যেমন অন্ধকারকে হারায়,
কুরআনের আলো তেমনি অন্তরজগত ভরায়।
যে হৃদয়ে রবের স্মরণ, সে হৃদয় হয় নির্মল,
যে জীবনে কুরআন আছে, সে জীবন হয় সফল।
দুনিয়ার পথে যতই থাকুক ঝড়-ঝঞ্ঝা-বাধা,
রবের ওপর ভরসা রাখলে কাটবে মনের ব্যথা।
হতাশ হয়ো না কখনো, আল্লাহ আছেন সাথে,
সত্যের পথে অবিচল থাকো, দৃঢ় হয়ে প্রাতে।
অন্যায় দেখে নীরব থেকো না, ন্যায়ের পথে চলো,
নিজের ভুলও চিনে নিয়ে সংশোধনের আলো জ্বালো।
নিজেকে আগে শুদ্ধ করো, পরে দাও উপদেশ,
চরিত্র দিয়ে প্রমাণ করো ইসলামেরই রেশ।
কথায় যেন মধুরতা থাকে, আচরণে বিনয়,
বড়-ছোটের হক আদায়েই ফুটুক সত্য পরিচয়।
অহংকারের উঁচু দেয়াল ভেঙে দাও আজ,
ভ্রাতৃত্ব আর ভালোবাসায় সাজাও জীবনের সাজ।
পরিবারে শান্তি আনো, সত্য কথা বলো,
স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সবার হক যথাযথ চলো।
মাতা-পিতার সেবা করো, আত্মীয়তার বন্ধন,
মানুষের হক আদায় করাই মুমিনের অলংকার-ধন।
শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞান ছড়াও, সততারই আলো,
শিক্ষকের সম্মান রেখো, শিক্ষার্থীরও ভালো।
জ্ঞান যদি চরিত্রে না আসে, সে জ্ঞান কেবল ভার,
কুরআনের শিক্ষা জীবনজুড়ে করুক পথের পার।
লোভের কাছে হার মানো না, হারাম পথে নয়,
সামান্য হালাল রিজিকেই লুকিয়ে থাকে জয়।
অন্যের হক কেড়ে নিয়ে গড়া সুখ ক্ষণিকের,
ন্যায়ের পথে অর্জিত রুটিই শান্তি দেয় অন্তরের।
সময় বড় অমূল্য ধন, ফিরবে না সে আর,
আজকের কাজ কালকে রেখে করো না অহংকার।
যে সময় যায়, আর ফিরে আসে না কোনো দিন,
তাই আমল দিয়ে ভরাও জীবনের প্রতিটি ক্ষণ।
কুরআন শুধু তাকের মাঝে সাজিয়ে রেখো না,
তার আলোকে জীবন গড়ো, ভুল পথে আর থেকো না।
আয়াত যদি হৃদয় ছোঁয়, চরিত্রে দাও স্থান,
তবেই হবে কুরআনের সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধন।
যে ঘরে কুরআনের ধ্বনি, সে ঘরে শান্তি জাগে,
যে মনে রবের ভয় থাকে, পাপ তার কাছে ভাগে।
যে চোখে আখিরাতের চিন্তা, সে চোখ পাপ থেকে ফেরে,
যে প্রাণে আল্লাহর প্রেম, সে প্রাণ সত্যপথে ফেরে।
এসো তবে রাতের শেষে জাগি রবের ডাকে,
অশ্রুসিক্ত সিজদা হোক অন্তরেরই ফাঁকে।
“হে আমার রব, ক্ষমা করো”—বলুক মনের ভাষা,
তোমার রহমত ছাড়া প্রভু কোথায় আমার আশা?
এসো তবে কুরআনেরই ছায়াতলে দাঁড়াই,
মিথ্যা-লোভ-অহংকারের বন্ধনগুলো ছাড়াই।
সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা হৃদয়ে করি ধারণ,
ঈমানেরই আলোয় গড়ি জীবন ও চরিত্র-গঠন।
যে শিক্ষা মুযযাম্মিল দেয়—জাগো, রবকে ডাকো,
রাতের নীরব সিজদাতে অন্তরখানি রাখো।
দিনের কাজে দায়িত্বশীল, সত্য পথে দৃঢ় হও,
বিপদ এলে ধৈর্য ধরো, আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
আখিরাতের ভয় হৃদয়ে, দুনিয়াতে সৎকর্ম,
মানুষের হক আদায় করো, এটাই মুমিনের ধর্ম।
সালাত, যাকাত, দান-সদকা—জীবন করো পবিত্র,
ইস্তিগফারে ধুয়ে ফেলো অন্তরের যত মলিন চিত্র।
হে আল্লাহ, দাও আমাদের কুরআনেরই আলো,
তোমার পথে চলার তাওফিক দাও নির্মল ভালো।
রাতের ইবাদতে দাও মন, দিনে দাও সৎকাজ,
তোমার সন্তুষ্টির পথেই হোক আমাদের জীবনের সাজ।
পাপ থেকে ফিরিয়ে নাও, সত্যপথে রেখো,
অহংকারের অন্ধকারে যেন আমাদের না দেখো।
জিহ্বায় দাও সত্যবাণী, অন্তরে দাও ভয়,
মানুষের হক আদায়ের তাওফিক দাও নির্ভয়।
যে আমল আজ পাঠাব আমরা আখিরাতের তরে,
তার উত্তম প্রতিদান দিও রহমতেরই ঘরে।
ক্ষমাশীল তুমি, দয়াময় তুমি—আশ্রয় তোমারই,
তোমার রহমত ছাড়া প্রভু আর তো গতি নাই।
মুযযাম্মিলের এই আহ্বান জাগুক প্রাণের মাঝে,
কুরআনের আলো ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে আজকে।
ঈমান হোক জীবনশক্তি, তাকওয়া হোক ঢাল,
সৎকর্মে ভরে উঠুক জীবন—এটাই হোক কাল।
রাতের নীরব আকাশ নিচে উঠুক মোনাজাত,
সিজদাতে ঝরে পড়ুক চোখের নীরব অশ্রুপাত।
রবের পথে জীবন দিই, রবের জন্য বাঁচি,
কুরআনেরই আলো নিয়ে সত্যের পথে হাঁটি।
শেষ প্রহরে যদি জাগি, জাগুক অন্তরও,
শুধু চোখের ঘুম ভাঙলেই তো জাগরণ নয় গো।
রবের ডাকে সাড়া দিয়ে বদলে যাক জীবন,
মুযযাম্মিলের শিক্ষা হোক আমাদের পাথেয় অনন্তক্ষণ।
হে আল্লাহ,
কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের আলো,
সালাতকে আমাদের প্রশান্তি,
তাকওয়াকে আমাদের পাথেয়,
তাওয়াক্কুলকে আমাদের শক্তি,
সবরকে আমাদের সৌন্দর্য
এবং নেক আমলকে আমাদের আখিরাতের সম্বল বানিয়ে দাও।
আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি যেন হয় তোমার সন্তুষ্টি;
তোমার রহমতের ছায়ায় যেন পাই চিরস্থায়ী শান্তি।
হে পরম দয়ালু, আমাদের ক্ষমা করো,
সত্য ও সুন্দর পথে অবিচল থাকার তৌফিক দাও—
আমিন।
২
২ মন্তব্য