Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৮ পূর্বাহ্ণ

আইএলও–ইউনেস্কো সনদের ছয় দশক: শিক্ষক সুরক্ষায় আমাদের অবস্থান কোথায়?

১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তসরকার সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল শিক্ষকতার মর্যাদা ও অধিকারসংক্রান্ত ঐতিহাসিক আইএলও–ইউনেস্কো সুপারিশমালা। শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, দায়িত্ব ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত সেই দলিলের এবার ছয় দশক পূর্ণ হচ্ছে। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যও সেই মাইলফলককে স্মরণ করিয়ে দেয়—“Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures” (“শিক্ষকদের পাশে—শিক্ষকতা পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছর”)। আন্তর্জাতিক এই সনদের ৬০ বছর পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে: শিক্ষক সুরক্ষায়, মর্যাদায় এবং অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশে আমাদের অবস্থান আজ কোথায়?

জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে, আর নৈতিকতা সেই দক্ষতাকে পরিচালিত করে সর্বজনীন কল্যাণের পথে। তাই মানবিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল আগামী বিনির্মাণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষক কেবল সফল শিক্ষার্থী তৈরি করেন না; তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে সৎ, বিবেকবান ও সহমর্মী মানুষ। প্রকৃত শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা উৎসারিত হয় জীবনের সত্যকে ধারণ করা, নিয়ম ও দায়িত্বে শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং যেকোনো সংকটে বিবেকের কণ্ঠ শোনার শিক্ষা থেকে। নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার এই বীজ পরিবারে উপ্ত হলেও তার পরিপূর্ণ যত্ন ও বিকাশ ঘটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আর সেই বিকাশের মূল কারিগর শিক্ষক।

অথচ আমাদের দেশের বাস্তবতায় একই শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয়ে আছে এক বিরাট বৈষম্যের দেওয়াল। একই দেশে দুজন শিক্ষক পাঠদান করছেন; দুজনেরই অভিন্ন লক্ষ্য—শিক্ষার্থীকে জ্ঞান দেওয়া, চিন্তাশীল করা এবং জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। কিন্তু একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং অন্যজন বেসরকারি এমপিওভুক্ত কিংবা এমপিওবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানে কাজ করায় তাঁদের কর্মপরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা ও অবসর-নিরাপত্তায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শিক্ষকতার দায়িত্বে পরিপূর্ণ মিল থাকলেও কর্মজীবনের সুযোগে এমন বৈষম্য শিক্ষক-মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে রেখেছে।

শিক্ষক সংকট এবং পেশাগত আকর্ষণ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আজ কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষক প্রয়োজন। এমনকি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতেও শিক্ষকতা পেশার আকর্ষণ হ্রাস পাওয়া এবং যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। OECD-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, সদস্য দেশগুলোর সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রকৃত বেতন উচ্চশিক্ষিত অন্যান্য কর্মীদের গড় আয়ের প্রায় ৮৭ থেকে ৯৫ শতাংশ। সরকারি কাঠামোর ওপর তৈরি এই পরিসংখ্যানের সাথে বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের চিত্র সরাসরি মিলবে না ঠিকই, তবে এটি প্রমাণ করে যে বিশ্বজুড়েই শিক্ষকদের ন্যায্য মূল্যায়ন ও পেশাগত আকর্ষণ রক্ষায় জোরালো নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও বহুমাত্রিক ও জটিল। এখানে সরকারি বিদ্যালয়-কলেজের পাশাপাশি রয়েছে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও এমপিওবহির্ভূত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও চাকরিবিধি এক নয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগ সরকারি অংশ পান এবং কিছু নির্দিষ্ট ভাতাও পান। সম্প্রতি নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধার আওতায় তাঁদের আনার প্রক্রিয়াগুলো ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে মূল বেতনের শতভাগ পাওয়া আর সরকারি চাকুরির অনুরূপ পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যে এক বিষয় নয়—তা স্পষ্ট।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে অবসর-সুবিধার দিকে তাকালে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর-সুবিধা বোর্ডে ৮০ হাজার ৩২০টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আটকে ছিল। সারা জীবন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের রক্ত-ঘামের ন্যায্য পাওনা পেতে দীর্ঘ বছর অপেক্ষা করতে হওয়া যে কোনো শিক্ষকের জন্যই চরম মানবিক উদ্বেগের ও মর্যাদাহানিকর।

ঠিক এই কারণেই শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি—পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যকার এই ব্যবধান দূর করা। জাতীয়করণের এই দাবি কেবল বেতনের অঙ্কের দাবি নয়; এর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত চাকরির সার্বিক নিশ্চয়তা, সম্মানজনক বাসস্থান ও চিকিৎসাভাতা, দ্রুততম সময়ে অবসর-ভাতার প্রাপ্তি এবং একটি সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। নিঃসন্দেহে জাতীয়করণ রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল নীতিগত ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এর জন্য অবকাঠামো মূল্যায়ন, স্বচ্ছ ধাপ নির্ধারণ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ-পদোন্নতির সমন্বিত নীতিমালা এবং শিক্ষার মান ধরে রাখার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ আবশ্যক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা, অবসর-সুবিধার দীর্ঘসূত্রতা নিরসন এবং ন্যায্য ভাতার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষককে শুধু ব্ল্যাকবোর্ডে পাঠ শেখালেই চলে না; তথ্য যাচাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল প্রয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং গবেষণাধর্মী কর্মপরিবেশ।

আইএলও–ইউনেস্কো সনদের ছয় দশক পেরিয়ে এসে বিশ্ব যখন শিক্ষকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধির নতুন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন আমাদের কেবল আনুষ্ঠানিক দিবসভিত্তিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সরকারি, এমপিওভুক্ত কিংবা নন-এমপিও—সব শিক্ষকই এ দেশের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশের স্বাচ্ছন্দ্য এবং মর্যাদাপূর্ণ অবসর-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা করুণা নয়, সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ শিক্ষকদের সুরক্ষা ও মর্যাদার প্রশ্নে কার্যকরভাবে দাঁড়ানো মানেই প্রকারান্তরে বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যতের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানো।

তথ্যসূত্র: ১. ইউনেস্কো, World Teachers’ Day—দিবসের প্রতিপাদ্য ও ১৯৬৬ সালের আইএলও–ইউনেস্কো সুপারিশ।

২. ইউনেস্কো, Global Report on Teachers: Addressing Teacher Shortages and Transforming the Profession—২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক শিক্ষক-চাহিদা।

৩. OECD, Education at a Glance 2026: How much are teachers and school heads paid?

৪. প্রথম আলো, “এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও পাবেন নতুন বেতনকাঠামোর সুবিধা,” ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

৫. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), “বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জট নিষ্পত্তি কার্যক্রম জোরদার: শিক্ষামন্ত্রী,” ২৩ এপ্রিল ২০২৬।

৬. প্রথম আলো, “এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি।”



লেখক:

খুরশীদুজ্জামান আহমেদ

প্রধান শিক্ষক, কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।

মন্তব্য করুন

ব্লগ