সহকারী শিক্ষক
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:০১ পূর্বাহ্ণ
দ্বৈত শাসন কী: ১৭৬৫ সালের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা, কারণ, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল | Dual Government System in Bengal
📖 ১৭৬৫ সালের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা, কারণ, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল
📖 Dual Government System in Bengal
দ্বৈত শাসন কী: ১৭৬৫ সালের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা, কারণ, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল | Dual Government System in Bengal
দ্বৈত শাসন কী — এই প্রশ্ন SSC ও HSC পরীক্ষায় বারবার আসে। ১৭৬৫ সালে বাংলায় প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual Government System) ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পোস্টে দ্বৈত শাসন বলতে কী বোঝায়, কে এটি প্রবর্তন করেন, কেন প্রবর্তন করা হয়েছিল, এর বৈশিষ্ট্য, গুণ-দোষ এবং ফলাফল — সবকিছু সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দ্বৈত শাসন বলতে কী বোঝায়?
দ্বৈত শাসন (Dual Government) হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে একই অঞ্চলে দুটি পৃথক কর্তৃপক্ষের শাসন চলে। ১৭৬৫ সালে বাংলায় এই ব্যবস্থা চালু হয় — একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা (দেওয়ানি) লাভ করে, অন্যদিকে নবাবের হাতে থাকে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা (নিজামত)। অর্থাৎ, ক্ষমতা ভাগ হয়ে যায় দুই পক্ষের মধ্যে — এজন্যই এর নাম দ্বৈত শাসন।
দ্বৈত শাসন কে প্রবর্তন করেন?
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন রবার্ট ক্লাইভ। ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ক্লাইভই এই দ্বৈত শাসনের রূপকার।
পটভূমি: কেন দ্বৈত শাসন চালু হলো?
পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭): নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলায় কোম্পানির প্রভাব বাড়ে।
বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪): মীর কাসিম, সুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলমের মিত্রবাহিনীর পরাজয় কোম্পানিকে অপ্রতিরোধ্য করে।
এলাহাবাদ চুক্তি (১৭৬৫): শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি দেন; বিনিময়ে কোম্পানি সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা দেয়।
ক্লাইভ সরাসরি শাসনভার নিতে চাননি (ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপের ভয়), তাই নবাবকে নামমাত্র শাসক রেখে প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে নেওয়ার এই কৌশল নেন।
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
ক্ষমতার বিভাজন: দেওয়ানি (রাজস্ব) কোম্পানির হাতে; নিজামত (প্রশাসন, বিচার, শান্তিরক্ষা) নবাবের হাতে।
নবাবের ভাতা: নবাব নাজমউদ্দৌলাকে বার্ষিক ৫৩ লক্ষ টাকা ভাতা দেওয়া হয় — শাসক হয়েও তিনি কোম্পানির বেতনভুক্ত কর্মচারীতে পরিণত হন।
উপ-দেওয়ান: রাজস্ব আদায়ের জন্য দুজন নায়েব-দেওয়ান নিযুক্ত হন — বাংলায় রেজা খাঁ ও বিহারে শিতাব রায়।
দায়িত্বহীনতা: যার হাতে টাকা নেই তার হাতে প্রশাসন, আর যার হাতে টাকা তার কোনো প্রশাসনিক দায় নেই — ফলে কেউ কারো কাছে জবাবদিহি করত না।
কোম্পানির কর্মচারীদের লুটপাট: দায়িত্বের অস্পষ্টতায় কোম্পানির কর্মচারীরা অবাধে শোষণ চালায়।
দ্বৈত শাসনের ফলাফল
অর্থনৈতিক ফলাফল
রাজস্ব আদায়ের নামে কৃষকদের উপর অমানবিক চাপ; খাজনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পসহ দেশীয় শিল্প ধ্বংসের পথে যায়।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০): এই শোষণমূলক ব্যবস্থার চরম পরিণতি — ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়।
প্রশাসনিক ফলাফল
শাসনে চরম বিশৃঙ্খলা; নবাব ক্ষমতাহীন, কোম্পানি দায়িত্বহীন।
বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; দুর্নীতি সর্বগ্রাসী হয়।
রাজনৈতিক ফলাফল
বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
মুঘল সম্রাট ও নবাব — উভয়েই নামসর্বস্ব হয়ে পড়েন।
দ্বৈত শাসনের অবসান
১৭৭২ সালে গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটান। তিনি নায়েব-দেওয়ানদের সরিয়ে কোম্পানির সরাসরি শাসন (দেওয়ানি ও নিজামত উভয়) প্রতিষ্ঠা করেন।
পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত নোট
বিষয় | তথ্য |
প্রবর্তক | রবার্ট ক্লাইভ |
সাল | ১৭৬৫ |
চুক্তি | এলাহাবাদ চুক্তি |
দেওয়ানি দাতা | মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম |
অঞ্চল | বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা |
নবাবের ভাতা | বার্ষিক ৫৩ লক্ষ টাকা |
নায়েব-দেওয়ান | রেজা খাঁ (বাংলা), শিতাব রায় (বিহার) |
অবসান | ১৭৭২, ওয়ারেন হেস্টিংস |
বড় পরিণতি | ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০) |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দ্বৈত শাসন কী?
১৭৬৫ সালে বাংলায় চালু ব্যবস্থা যেখানে রাজস্ব ক্ষমতা (দেওয়ানি) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও প্রশাসন (নিজামত) নবাবের হাতে থাকে।
দ্বৈত শাসন কে চালু করেন?
রবার্ট ক্লাইভ, ১৭৬৫ সালে।
দেওয়ানি কী?
রাজস্ব আদায়ের অধিকার। ১৭৬৫ সালে শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি দেন।
নিজামত কী?
প্রশাসন, বিচার ও শান্তিরক্ষার দায়িত্ব — যা নবাবের হাতে ছিল।
দ্বৈত শাসনের কুফল কী ছিল?
দায়িত্বহীন শাসন, কৃষক শোষণ, দুর্নীতি এবং ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর।
দ্বৈত শাসনের অবসান কে ঘটান?
ওয়ারেন হেস্টিংস, ১৭৭২ সালে।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কবে হয়?
১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬ সন)।
পরীক্ষায় ভালো করতে উপরের টেবিলটি মুখস্থ রাখুন এবং কারণ-বৈশিষ্ট্য-ফলাফল এই তিন ভাগে উত্তর সাজান।
১৮
২৯ মন্তব্য