প্রভাষক
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
স্মার্টফোন যেভাবে ইবাদতের সহায়ক হতে পারে
স্মার্টফোন এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের ফাইল আদান-প্রদান, আর্থিক লেনদেন, জরুরি মিটিং, পড়াশোনা, চিকিত্সাসেবা, পণ্য কেনাবেচা—কত কাজই না মুহূর্তে করা যাচ্ছে হাতের মুঠোয় থাকা এই ছোট্ট যন্ত্রটির মাধ্যমে। বলা যায়, স্মার্টফোনের ইতিবাচক ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে এই প্রযুক্তির আরেকটি দিকও আছে, তা হলো, অপব্যবহার কারো কারো জন্য সময় নষ্ট, অশ্লীলতা ও গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একজন সচেতন মুমিন চাইলে একই স্মার্টফোনকে ইবাদত ও কল্যাণের সহায়ক বানাতে পারেন। যেমন, স্মার্টফোন ইবাদতের কথা মনে করিয়ে দেওয়া, ইবাদত শেখা, তা পালনে সহযোগিতা করা এবং অন্যকে নেক কাজে উত্সাহিত করার কাজে সহায়ক হতে পারে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সত্কাজ ও তাকওয়ায় একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২)
এই আয়াতের উপর আমল করার ক্ষেত্রগুলোতে স্মার্টফোনকে সহযোগী বানানো অনেক সহজ।
নামাজের সময় মনে করিয়ে দেওয়া: ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় মানুষ কাজের চাপে নামাজের সময়ের কথা ভুলে যায়। স্মার্টফোনে নামাজের সময়সূচি ও আজানের নোটিফিকেশন চালু থাকলে যথাসময়ে নামাজের কথা মনে পড়ে। এছাড়াও এর মাধ্যমে তাহাজ্জুদ কিংবা সাহরির জন্য অ্যালার্ম দিয়ে ভোর রাতে জাগ্রত হওয়া সহজ করা যায়।
কিবলা নির্ণয়ে সহায়তা: সফরে বা অপরিচিত কোনো স্থানে গেলে কিবলার দিক জানা কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্মার্টফোনের কম্পাসভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই কিবলা নির্ণয় করা যায়। ফলে হোটেল, বিমানবন্দর কিংবা ভ্রমণের সময়ও নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
কোরআন তিলাওয়াত ও হিফজ: স্মার্টফোনে কোরআনের নির্ভরযোগ্য অ্যাপ থাকলে যেকোনো সময় তিলাওয়াত করা যায় (বিশেষ করে সফরে বা কোথাও অপেক্ষারত থাকলে)। পাশাপাশি যেকোনো আয়াতের অনুবাদ, তাফসির ইত্যাদি খুব সহজে বের করা যা। যাতায়াতের সময় কোরআন তিলাওয়াত শোনার সুযোগও রয়েছে। যারা কোরআন মুখস্থ করছেন, তাদের জন্য প্রযুক্তি আরও কিছু সুযোগ তৈরি করেছে। এখন এমন কিছু অ্যাপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি রয়েছে, যেখানে মুখস্থ আয়াত পড়ে শোনালে সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত করতে সহায়তা করে (এটি তাদের জন্য, যাদের কোরআন শুদ্ধ আছে, অবসর সময়ে একাকি বসে কিছু আয়াত মুখস্থ করছেন)। তবে মনে রাখতে হবে, এই অ্যাপগুলো শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং অনুশীলনের জন্য একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে। তবে যারা এমন দেশে আছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষক পাওয়া কষ্টকর, তারা স্মার্টফোনের মাধ্যমে কোরআন শিখা ও শেখানোর ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারে, যা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
জিকির ও দোয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া: স্মার্টফোনে কিছু অ্যাপ এমন আছে, যেগুলোর মাধ্যমে সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির, ইস্তিগফার, দরুদ ও বিভিন্ন দোয়া নিয়মিত পড়ার জন্য রিমাইন্ডার দেওয়া যায়। প্রতিদিন একটি করে দোয়া, আয়াত বা হাদিস শেখার জন্যও নির্দিষ্ট সময়ে নোটিফিকেশন রাখা সম্ভব। এতে ব্যস্ততার মধ্যেও নেক আমলের কথা মনে পড়ে।
নেক কাজে একে অন্যকে উত্সাহ দেওয়া: একটি ফোনকল বা ছোট্ট বার্তাও কখনো কারো জন্য বড় কল্যাণের কারণ হতে পারে। কাউকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া, তাহাজ্জুদের জন্য বন্ধুকে ফোন করা (যদি তার অনুমতি থাকে), কোরআন পড়তে উত্সাহ দেওয়া কিংবা কোনো কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে আহ্বান জানানো—সবই স্মার্টফোনের মাধ্যমে করা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, তার জন্য আমলকারীর অনুরূপ সওয়াব রয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস :২৬৭১)
সদকা ও সদকায়ে জারিয়ার সুযোগ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া, সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪১১৫)
স্মার্টফোনের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পে অংশ নেওয়া যায়। মসজিদ নির্মাণ, কোরআন শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, খাদ্য বিতরণ, এতিম ও অসহায়দের সহায়তাসহ বিভিন্ন কাজে অনলাইনে দান করা সম্ভব। এমনকি বাংলাদেশে বসে যাচাই-বাছাই করে মক্কা, মদিনা বা ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য সুপেয় পানি ও খাবারের ব্যবস্থায় সহযোগিতা করাও যায়। তবে অনলাইনে দানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প ও অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
জাকাত ও নেক আমলের হিসাব রাখা: স্মার্টফোনে নির্ভরযোগ্য জাকাত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে স্বর্ণ, রৌপ্য, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক সম্পদের হিসাব করা যায়। জাকাত দেওয়ার সময়ের জন্য রিমাইন্ডারও রাখা সম্ভব। তবে জটিল সম্পদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মুফতি বা ফতোয়া বিভাগের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য নেক আমলের ব্যক্তিগত হিসাব রাখাও সম্ভব। এতে নিজের আমলের ঘাটতি বুঝে সংশোধনের চেষ্টা করা যায়।
ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও সময়ের সুরক্ষা: স্মার্টফোনে কোরআন, হাদিস, সীরাত, ফিকহ ও ইসলামী ইতিহাসের অসংখ্য বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনর্থক স্ক্রল করার পরিবর্তে অবসর সময়ে উপকারী বই পড়া কিংবা নির্ভরযোগ্য আলেমদের আলোচনা শোনা যেতে পারে। কোনো আয়াত বা হাদিস দেখলে তা শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য উত্স থেকে যাচাই করাও সহজ হয়েছে।
ক্ষতিকর কন্টেন ফিল্টার অ্যাপ: আমাদের বেশির ভাগ সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অনর্থক কেটে যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)
তাই প্রযুক্তিকে নেক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি গুনাহ থেকে বাঁচার ব্যবস্থাও করা দরকার। স্মার্টফোনের জন্য এখন এমন অ্যাপ পাওয়া যায়, যেগুলো অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করা, স্ক্রিন-টাইম নির্ধারণ করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট ফিল্টার করতে সহায়ক। এতে প্রযুক্তি শুধু ইবাদত করার সুযোগই তৈরি করছে না, বরং গুনাহ থেকে আত্মরক্ষারও সুযোগ তৈরি করেছে। এর জন্য ব্যবহারকারীর মধ্যে তাকওয়া থাকতে হবে।
উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা বোঝা যায়, মানুষ চাইলে তার হাতে থাকা স্মার্টফোনকে ইবাদতের সহযোগী বানাতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে; এখন আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সহজতাকে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহেও কাজে লাগানো। কেউ যদি তাকে ইবাদতের সহযোগী না বানিয়ে শুধু গুনাহের চোরাবালিতে হাবুডুবু খায়, তবে তার উচিত, স্মার্টফোন থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা।
১৮
২৮ মন্তব্য