Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ

মাওলানা আ. ন. ম. নোমান: যেন তাকওয়ার এক জীবন্ত পিরামিড

মাওলানা আ. ন. ম. নোমান। বর্তমানে তিনি পদুয়া আইনুল উলুম দারুচ্ছুন্নাহ কামিল মাদরাসা-এর সম্মানিত অধ্যক্ষ।


 তিনি এমন এক শিক্ষক পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষ, যে পরিবারের শেকড়েই যেন শিক্ষা ও আলোর চর্চা। তাঁর পিতাও ছিলেন একজন স্বনামধন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর পরিবারের সকলেই শিক্ষক। মানুষ গড়ার কারিগর। 


আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য নিয়ে স্মরণ করছি আমার সেই প্রিয় উস্তাদকে।

তাঁর শেখানো পাঠ আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন। কত বছর পেরিয়ে গেছে—তবুও তাঁর শেখানো অনেক কিছু আজও হুবহু মুখস্থ; কখনো কখনো অজান্তেই ঠোঁটে গুনগুন করে ফিরে আসে। শুধু পাঠ নয়—তিনি শিখিয়েছেন জীবনবোধ, শিখিয়েছেন আদর্শ, শিখিয়েছেন মানুষ হয়ে ওঠার পথ। তাঁর শেখানো সেই আদর্শ আজও জীবনের বাঁকে বাঁকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি।


মাওলানা আ. ন. ম. নোমান: যেন তাকওয়ার এক জীবন্ত পিরামিড


কিছু শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, তাঁরা শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে আদর্শের বীজ বুনে দেন। মাওলানা আ. ন. ম. নোমান তেমনই একজন শিক্ষক, যাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল তাকওয়া, আমল ও ইসলামী তাহযিব-তামাদ্দুনের এক অনন্য সমন্বয়।


২০০০ সালে কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সম্ভবত সে সময়েই তিনি আরবি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। সময়ানুবর্তিতা, নিষ্ঠা ও অসাধারণ পাঠদানশৈলীতে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর ক্লাসে বিরাজ করত পিনপতন নীরবতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শিক্ষার্থীরা শুনত তাঁর পাঠ।


শ্রেণিকক্ষে যেমন ছিলেন দক্ষ, ব্যক্তিজীবনেও তেমনি ছিলেন ইসলামী অনুশাসনে অবিচল পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের ছাঁট, চলাফেরা—সবকিছুতেই শালীনতা ও সুন্নাহর অনুসরণের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। গোড়ালির নিচে প্যান্ট পরা কিংবা চুলের বিশেষ ছাঁটের বিষয়ে প্রায়ই হাদিসের আলোকে আমাদের সতর্ক করতেন।


আলিম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন আমার চুল বড় থাকায় তিনি নিজের পকেটের টাকা দিয়ে আমাকে সেলুন থেকে ২য়বার চুল কাটিয়ে ছিলেন। চুল কাটতে হবে তাঁর নির্ধারিত আদলে—মাথার চারপাশে সমান ছাঁট। আবার একদিন পাঞ্জাবির ভেতরে লাল গেঞ্জি পরায় নিজের টাকায় অন্য রঙের গেঞ্জি কিনে দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে নিয়েছিলেন আর লাল কাপড় না পরার প্রতিশ্রুতি। শাসনের আড়ালে এমন স্নেহ ও দায়িত্ববোধ সত্যিই বিরল।


কুরআন শিক্ষায়ও তাঁর আন্তরিকতা ছিল অসামান্য। আলিম শ্রেণিতে আমাদের শুদ্ধ উচ্চারণ ও তাজবিদসহ কুরআন তিলাওয়াত শেখাতে বিশেষ যত্ন নিতেন। আরবি সাহিত্য পাঠদানের সেই সাবলীলতা ও গভীরতা আজও স্মৃতিতে অমলিন।


শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর ছিল গভীর ভাবনা। একদিন আমার অনুপস্থিতিতে সহপাঠীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কে কী হতে চায়। সাংবাদিকতার কথা কেউ না বলায় তিনি নাকি কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরদিন সহপাঠী কফিলের পরামর্শে আমি জানালাম, সাংবাদিক হতে চাই। শুনে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করেছি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।


তাঁকে দেখলে মনে হতো, তাকওয়া যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অলংকার। কথায়, কাজে ও জীবনাচরণে ইসলামের অনুশীলনই ছিল তাঁর প্রধান সাধনা। প্রতিকূলতা কিংবা ঝড়ঝঞ্ঝা—কোনো কিছুতেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার এক দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর মধ্যে লক্ষ করেছি।


মাওলানা আ. ন. ম. নোমান আমার কাছে কেবল একজন প্রিয় শিক্ষক নন; তিনি শৃঙ্খলা, সুন্নাহর অনুশীলন ও তাকওয়ার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যেন এক সুউচ্চ তাকওয়ার পিরামিড, যার ছায়ায় আমরা শিখেছি আদর্শবান হওয়ার পাঠ। 


তিনি এক অনিঃশেষ আলোকবর্তিকা—যাঁর জ্বালানো আলো আজও আমার পথচলার পাথেয়। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, পথ হারানোর প্রতিটি মুহূর্তে, তাঁকে স্মরণ করি বারবার; তাঁর শেখানো আদর্শের আলোয় পথ চলার চেষ্টা করি।


প্রিয় উস্তাদ, আপনার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা।


হে পরম প্রভু, আমাকে আরও জ্ঞান দাও—যেন প্রিয় উস্তাদকে নিয়ে আরও অনেক কথা লিখতে পারি। স্মৃতিকে আরও প্রখর করে দাও—যেন জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তাঁকে, তাঁর শিক্ষা ও তাঁর আদর্শ হৃদয়ের গভীরে অমলিন করে ধারণ করতে পারি।

শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়—আজকের এই শিক্ষক দিবসে প্রিয় উস্তাদকে স্মরণ করছি


আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘ নেক হায়াত এবং তাঁর ইলম ও আমলে অফুরন্ত বরকত দান করুন। আমিন।


 

মন্তব্য করুন

ব্লগ