সিনিয়র শিক্ষক
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
হাজার হাজার মানুষের গর্জন। মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম যেন কেঁপে উঠছে। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামা মানুষটিকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানাচ্ছে আর্জেন্টিনা। চারপাশে একটাই ধ্বনি, ‘মেসি...মেসি...মেসি...’
স্লোগান নয়, যেন প্রার্থনার মতো কিছু। যাঁরা গাইছেন, তাঁদের কেউ কেউ শিশু, কেউ কেউ আর শিশু নন। কিন্তু সবাই কাঁদছেন; কারণ, তাঁরা আর্জেন্টিনা দলের কথা ভাবতে গেলে লিওনেল মেসি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন না। ‘ভিনগ্রহী’ এই লোকটা সেই দলে ছিলেন ২১ বছর। অনেকের জন্মের আগে থেকে, অনেকের বড় হওয়ার পুরোটা জুড়ে।
একটা দেশে অনেক ভাগাভাগি থাকে। অনেক দল, অনেক মত। কিন্তু আজ আর্জেন্টিনা কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলে গিয়েছিল সব ভাগাভাগির কথা। আবেগ সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার, হয়তো সেরাই, জাতীয় দলকে বিদায় বলে দিয়েছেন।
মেসি কাঁদছিলেন স্টেডিয়ামে ঢোকার আগেই।
বাসে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলেন। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো দুই দশকের বেশি সময়। নিজের জীবনটাই যেন সিনেমার মতো ছুটে যাচ্ছিল জানালার ওপারে। চোখের পানি মুছে নিচ্ছিলেন বারবার।
মনুমেন্তালে পৌঁছে আরও এক আবেগের ধাক্কা। সাজানো ড্রেসিংরুম। চারপাশে মেসিকে ঘিরে স্মৃতির আবহ। ফোন করে আগেই নিশ্চিত করেছিলেন, স্ত্রী আন্তোনেলা আর ছেলেরা ভিআইপি বক্সে আছে কি না।
তারপর একের পর এক আবেগের মুহূর্ত। ওয়ার্মআপে নামার সময় গ্যালারি যখন উঠে দাঁড়াল, তিনি কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলেন। পারলেন না পুরোপুরি। শুধু হাত তুললেন, এক দিকে, আরেক দিকে, সব দিকে।
মাঠে ঢুকে আকাশের দিকে তাকালেন মেসি। সঙ্গে তিন ছেলে। জাতীয় সংগীত বাজছে। কিন্তু এবার মেসি গাইলেন না। গলায় তখন আবেগের বিশাল এক দলা।
সেই মুহূর্তে যেন ফিরে গেলেন ছোট্ট লিওর কাছে। হয়তো মনে পড়ে গিয়েছিল দাদি সেলিয়ার কথা। হাত ধরে মাঠে নিয়ে যেতেন খেলা দেখতে। প্রথম কোচ সালভাদর আপারিসিওকে একদিন বলেছিলেন, ‘ওকে নামান, ও ম্যাচ বাঁচিয়ে দেবে।’ উত্তরটাও প্রায় স্পষ্ট মনে আছে মেসির, ‘ম্যাডাম, ও খুব ছোট, ওকে মেরে বসবে।’ দাদি তখনও নাছোড়, ‘ওকে নামান।’
দাদির জন্যই মেসি তাঁর সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘লাস্ট ড্যান্স’ উৎসর্গ করেছেন, সঙ্গে বাবা হোর্হের জন্যও। ফুটবলের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা, তার শুরুটাও যেন সেই দিনগুলোতেই। আজ যার সবচেয়ে প্রিয় অধ্যায়টা শেষ হলো।
তাঁকে ছাড়া আর্জেন্টিনা আর কখনো আগের মতো হবে না। যুগের পর যুগ মানুষ মেসির ফুটবল নিয়ে অনেক কথা বলবে। গোলের সংখ্যা নিয়ে বলবে। ট্রফির কথা বলবে। রেকর্ডের কথা বলবে। কিন্তু হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় লিগ্যাসিটা হচ্ছে নিষ্ঠা। ২১ বছরের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার সৌভাগ্য সবার হয় না। মেসি সেটা করে দেখিয়েছেন। নিজের শক্তিতে করেছেন। শেষ পর্যন্তও রেখে গেলেন সেই নিষ্ঠার শিক্ষা। বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছেন। ম্যাচ জিতিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করে পেছনে ফেলেছেন। গ্যালারির প্রতিটি দর্শকের টিকিটের দাম উসুল করেছেন। অথচ জানতেন, বাবা হোর্হে জীবনের শেষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেঁদেছেন গোপনে। এই অবস্থাতেও মেসি খেলেছেন মেসির মতো। এই যে বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ, তার শেষ বাঁশি পর্যন্তও নিজেকে নিংড়ে দিয়ে গেলেন।
মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু মেসি থেকে যাবেন
২
২ মন্তব্য