Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৪০ অপরাহ্ণ

مَوَانِعُ الْإِرْثِ كَمْ هِيَ؟ وَمَا هِيَ؟ بَيِّنْ بِالتَّفْصِيلِ

مَوَانِعُ الْإِرْثِ كَمْ هِيَ؟ وَمَا هِيَ؟ بَيِّنْ بِالتَّفْصِيلِ

প্রশ্ন:সিরাজী-১ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ কয়টি ও কী কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামী শরিয়তে উত্তরাধিকার বা মিরাস (الميراث) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বৈধ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। তবে উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিশেষ কিছু কারণে কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ইসলামী ফিকহে এ কারণগুলোকে مَوَانِعُ الْإِرْثِ (মাওয়ানিউল ইরস) বা উত্তরাধিকারের প্রতিবন্ধকতা বলা হয়।

উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মৌলিক কারণ তিনটি। যথা—

  1. হত্যাকাণ্ড (القتل)

  2. ধর্মের ভিন্নতা (اختلاف الدين)

  3. দাসত্ব (الرّق)

এগুলো সহজে মনে রাখার জন্য ফিকহের প্রচলিত একটি স্মারক হলো عِشْ رِقٌّ (ইশ রিক্কুন)। নিচে কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. হত্যাকাণ্ড (القتل)

কোনো উত্তরাধিকারী যদি তার সম্পত্তির মালিককে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে ফিকহের বিধান অনুযায়ী সে হত্যার কারণে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। যেমন, কোনো সন্তান যদি তার পিতাকে উত্তরাধিকার লাভের উদ্দেশ্যে হত্যা করে, তবে সে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَيْسَ لِلْقَاتِلِ مِنَ الْمِيرَاثِ شَيْءٌ

অর্থ: “হত্যাকারীর জন্য উত্তরাধিকারে কোনো অংশ নেই।”

—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৫৬৪ (বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রয়োগ নিয়ে ফিকহি আলোচনা রয়েছে)।

হত্যাকারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, কেউ যেন সম্পত্তির লোভে উত্তরাধিকারদাতাকে হত্যা করে সম্পদ লাভের সুযোগ না পায়। তবে সব ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিধান এক নয়। হত্যার ধরন, উদ্দেশ্য এবং হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী ফিকহের বিভিন্ন মাজহাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষত হানাফি ফিকহে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে হত্যার প্রকৃতি ও শরিয়ত নির্ধারিত দায় বিবেচনা করা হয়।

২. ধর্মের ভিন্নতা (اختلاف الدين)

উত্তরাধিকারী ও মৃত ব্যক্তির ধর্ম ভিন্ন হলে ইসলামী শরিয়তের সাধারণ বিধান অনুযায়ী তাদের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। অর্থাৎ, মুসলিম ব্যক্তি অমুসলিম ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হন না এবং অমুসলিম ব্যক্তিও মুসলিম ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হন না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ وَلَا الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ

অর্থ: “মুসলিম অমুসলিমের উত্তরাধিকারী হবে না এবং অমুসলিমও মুসলিমের উত্তরাধিকারী হবে না।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১৪।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর অমুসলিম আত্মীয় সাধারণ ইসলামী উত্তরাধিকার বিধান অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন না। একইভাবে কোনো অমুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর মুসলিম আত্মীয়ও সাধারণ বিধান অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারী হবেন না।

৩. দাসত্ব (الرّق)

ইসলামী ফিকহের প্রাচীন বিধান অনুযায়ী দাসত্ব উত্তরাধিকার লাভের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। দাসের পূর্ণাঙ্গ সম্পত্তির মালিকানা ও স্বাধীন আর্থিক অধিকার না থাকায় সে উত্তরাধিকার লাভের যোগ্য হতো না। একইভাবে দাসের নামে থাকা সম্পদও প্রচলিত ফিকহি বিধান অনুযায়ী তার মালিকের অধিকারভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হতো।

তবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় বর্তমান সময়ে এ বিধানের বাস্তব প্রয়োগ নেই। স্বাধীন মানুষের ক্ষেত্রে দাসত্বকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মৌলিক কারণ তিনটি—হত্যাকাণ্ড, ধর্মের ভিন্নতা ও দাসত্ব। এসব বিধানের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তবে বাস্তব কোনো উত্তরাধিকার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মাজহাবের বিধান ও ঘটনার প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করে যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

(১.এ ভাবে ও হবে:

الموانع للارث كم هى؟ وما هى؟ بين بالتفصيل :উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ কয়টি ও কি কি? বিস্তারিত বর্ণনা কর

আসল ফলাফলগুলি দেখুন

দ্বিতীয়ত: বাংলা ভাষায় বিস্তারিত (Bengali)

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী উত্তরাধিকার বা মিরাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার মৌলিক কারণ ৩টি। ওলামায়ে কেরাম এটি সহজে মনে রাখার জন্য সংক্ষেপে (عِشْ رِقٌّ - ইশ রিক্কুন) শব্দ দিয়ে প্রকাশ করেন। কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. হত্যাকাণ্ড (القتل):

যদি কোনো ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী) তার মরিসকে (যার সম্পত্তি সে পাবে, যেমন পিতা বা কোনো আত্মীয়) অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে সে ওই ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে কোনো মিরাস পাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হত্যাকারীর জন্য মিরাসের কোনো অংশ নেই।" এর পেছনের যুক্তি হলো, কেউ যেন সম্পত্তি তাড়াতাড়ি পাওয়ার লোভে কাউকে হত্যা না করে।

২. ধর্মের ভিন্নতা (اختلاف الدين):

মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোনো উত্তরাধিকার সম্পর্ক চলে না। অর্থাৎ, কোনো মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার অমুসলিম আত্মীয় (তা সে সন্তান বা পিতা যাই হোক) তার সম্পত্তি পাবে না। একইভাবে কোনো অমুসলিম মারা গেলে তার মুসলিম আত্মীয় সম্পত্তি পাবে না। হাদিসে এসেছে: "মুসলিম অমুসলিমের ওয়ারিশ হবে না এবং অমুসলিমও মুসলিমের ওয়ারিশ হবে না।"

৩. দাসত্ব (الرّق):

কোনো ব্যক্তি ক্রীতদাস বা দাসী হলে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ দাসের নিজস্ব কোনো মালিকানা থাকে না, তার সব সম্পত্তি তার মনিবের। (বর্তমান বিশ্বে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় এই কারণটি এখন আর কার্যকর নয়)।)

 

৩

ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের প্রসিদ্ধ কিতাব আল-ফিরাইযুল সিরাজী (السراجي في الميراث) অনুযায়ী, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার মৌলিক কারণ বা প্রতিবন্ধকতা (مَوَانِعُ الْإِرْثِ) হলো ৪টি।

আপনি যে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন (দাসত্ব, হত্যাকাণ্ড ও ধর্মের ভিন্নতা), সিরাজী কিতাবের মূল বিন্যাস ও হানাফী ফিকহ অনুযায়ী এর সাথে "দার বা রাষ্ট্রের ভিন্নতা" যুক্ত হয়ে মোট ৪টি কারণ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এগুলোকে সহজে মনে রাখার জন্য ফিকহের পরিভাষায় "عِشْ رِقٌّ" (আইন, শীন, রা, ক্বাফ) সংকেত দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

নিচে সিরাজী ১-এর আলোকেই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. দাসত্ব (الرِّقُّ)

কোনো ব্যক্তি দাস বা ক্রীতদাস হলে সে তার কোনো মুক্ত আত্মীয়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না। একইভাবে কোনো মুক্ত ব্যক্তিও দাসের সম্পত্তির ওয়ারিশ হয় না।

• প্রকারভেদ: দাসত্ব পূর্ণ হোক (যেমন: আবদুম মাহয) কিংবা আংশিক বা চুক্তিবদ্ধ হোক (যেমন: মুকাতাব, মুদাব্বার, উম্মে ওয়ালাদ), সবক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য।

• কারণ: দাস নিজে কোনো সম্পত্তির মালিক হতে পারে না; দাসের অর্জিত সবকিছুর মালিক তার মনিব। তাই দাসকে উত্তরাধিকার দিলে প্রকারান্তরে মনিবই সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়, যা শরিয়তের নিয়মের পরিপন্থী।

২. হত্যাকাণ্ড (الْقَتْلُ)

যদি কোনো উত্তরাধিকারী তার এমন কোনো আত্মীয়কে হত্যা করে, যার কাছ থেকে সে সম্পত্তি পাওয়ার কথা ছিল, তবে সে উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হত্যাকারী উত্তরাধিকারী হতে পারে না।"

• শর্ত ও প্রকারভেদ: হানাফী মাজহাব এবং সিরাজী কিতাবের বিবরণ অনুযায়ী, যে হত্যাকাণ্ডের কারণে কিসাস (রক্তের বদলা) বা দিয়াত (রক্তপণ/জরিমানা) ওয়াজিব হয় এবং কাফফারা দিতে হয়, কেবল সেই হত্যাকাণ্ডই উত্তরাধিকারের প্রতিবন্ধক। এর মধ্যে রয়েছে:

            • ক্বাতলে আমদ (ইচ্ছাকৃত হত্যা): কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা।

            • ক্বাতল শিহবুল আমদ (ইচ্ছাকৃত সদৃশ হত্যা): লাঠি বা পাথর দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে হত্যা করা (যা সাধারণত প্রাণঘাতী নয়)।

            • ক্বাতলে খতা (ভুলবশত হত্যা): শিকার করতে গিয়ে বা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যা করা।

            • ক্বাতল কায়েম মাক্বামে খতা (ভুলের স্থলাভিষিক্ত হত্যা): যেমন ঘুমের ঘোরে কারও ওপর গড়িয়ে পড়ে তাকে মেরে ফেলা।

• ব্যতিক্রম: পরোক্ষ বা কারণগত হত্যা (যেমন: রাস্তায় গর্ত খোঁড়ার কারণে কেউ পড়ে মারা যাওয়া) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বা পাগল ব্যক্তির দ্বারা হত্যাকাণ্ড হানাফী ফিকহে উত্তরাধিকারের প্রতিবন্ধক নয়।

৩. ধর্মের ভিন্নতা (اخْتِلَافُ الدِّينَيْنِ)

মুসলিম এবং অমুসলিমের মধ্যে একে অপরের উত্তরাধিকার স্বত্ব সাব্যস্ত হয় না। কোনো মুসলমান ব্যক্তি অমুসলিম আত্মীয়ের এবং অমুসলিম ব্যক্তি কোনো মুসলমান আত্মীয়ের সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে পারে না।

• দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মুসলমান কোনো কাফেরের উত্তরাধিকারী হবে না এবং কাফেরও কোনো মুসলমানের উত্তরাধিকারী হবে না।" (সহীহ বুখারী)।

৪. রাষ্ট্রের ভিন্নতা (اخْتِلَافُ الدَّارَيْنِ)

আবাসভূমি বা রাষ্ট্রের ভিন্নতাও উত্তরাধিকারের একটি বড় প্রতিবন্ধক। তবে এটি কেবল অমুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

• বিবরণ: অমুসলিমদের ক্ষেত্রে যদি একজন 'দারুল ইসলাম' (ইসলামী রাষ্ট্র) এবং অন্যজন 'دار الحرب' (শত্রুভাবাপন্ন অমুসলিম রাষ্ট্র) এর অধিবাসী হয়, তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার বন্ধ হয়ে যাবে।

• মুসলমানদের ক্ষেত্রে নিয়ম: সারা বিশ্বের মুসলমানরা ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাস করলেও তারা ধর্মীয় দিক থেকে এক 'দার' বা এক সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত। তাই এক দেশের মুসলিম নাগরিক অন্য দেশের মুসলিম আত্মীয়ের সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ হবেন।

স্মারক শব্দের ব্যাখ্যা (عِشْ رِقٌّ)

সিরাজী ও ফিকহের কিতাবসমূহে এই চার প্রতিবন্ধকতা সহজে মুখস্থ রাখার জন্য হরফ বা অক্ষরের একটি সমষ্টি তৈরি করা হয়েছে: عِشْ رِقٌّ

• ع (আইন): اِلْتِبَاسُ الْعِلْمِ বা عَدَمُ الْعِلْمِ (মৃত্যুর অগ্রাধিকারের অজ্ঞতা - যেমন দুই আত্মীয় একসাথে দুর্ঘটনায় মারা গেলে কে আগে মারা গেছে তা না জানা)। অনেক ফকীহ একেও প্রতিবন্ধক ধরেন।

• ش (শীন): شَبْهُ الْقَتْلِ বা الْقَتْلُ (হত্যাকাণ্ড)।

• ر (রা): رِدَّةٌ বা اخْتِلَافُ الدِّينِ (মুরতাদ হওয়া বা ধর্মের ভিন্নতা)।

• ق (ক্বাফ): রিকের 'ক্বাফ' দ্বারা الرِّقُّ (দাসত্ব) বোঝানো হয়।

উপসংহার: ইসলামী মিরাস আইনে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো আরোপ করার মূল উদ্দেশ্য হলো সামাজিক সুবিচার রক্ষা করা, অপরাধ প্রবণতা (যেমন সম্পত্তির লোভে হত্যা) বন্ধ করা এবং আদর্শিক সংহতি বজায় রাখা।)

মন্তব্য করুন