০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: ছোটবেলা থেকেই যে অভ্যাসগুলো শেখানো জরুরি
শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় শিশুরা যা শেখে, তার অনেকটাই পরবর্তী জীবনে তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়। তাই বয়স অনুযায়ী কিছু সহজ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তাদের শেখানো উচিত। এতে শিশু যেমন বিভিন্ন জীবাণু ও সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শিখবে, তেমনি নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের প্রতি দায়িত্বশীলও হয়ে উঠবে।
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস
হাত ধোয়া শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসগুলোর একটি। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর, টয়লেট ব্যবহারের পরে এবং খাবার খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
শিশুকে শুধু পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরিবর্তে সাবান ব্যবহার করতে শেখানো ভালো। হাতের তালু, আঙুলের ফাঁক, নখের চারপাশসহ পুরো হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করার বিষয়টিও ধীরে ধীরে শেখানো যায়।
প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা
দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসও ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা প্রয়োজন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস শিশুকে করাতে হবে।
ছোট শিশুরা নিজেরা ঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ করতে না পারলে বাবা-মা পাশে থেকে সাহায্য করতে পারেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করাও দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
পরিষ্কার পোশাক ও শরীরের যত্ন
প্রতিদিন পরিষ্কার পোশাক পরা, নিয়মিত গোসল করা, নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখা এবং চুল পরিষ্কার রাখার অভ্যাস শিশুর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেলাধুলা বা বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হাত-পা পরিষ্কার করার অভ্যাসও তৈরি করা উচিত।
শিশুর ব্যবহৃত তোয়ালে, পোশাক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস নিয়মিত পরিষ্কার রাখা দরকার। এতে শরীরে ময়লা ও জীবাণু জমার ঝুঁকি কমে।
নিরাপদ পানি পান
শিশুর জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপরিষ্কার পানি বিভিন্ন জীবাণু শরীরে প্রবেশের কারণ হতে পারে। তাই পান করার আগে পানি নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে পরিবারের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
শিশুকে বাইরে কোথাও নিয়ে গেলে সম্ভব হলে নিরাপদ পানি সঙ্গে রাখা ভালো। পাশাপাশি নিজের পানির বোতল পরিষ্কার রাখার অভ্যাসও তাকে শেখানো যেতে পারে।
খাবারের আগে ও পরে পরিচ্ছন্নতা
খাবার খাওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করা যেমন জরুরি, তেমনি খাবার খাওয়ার পর হাত ও মুখ পরিষ্কার করাও প্রয়োজন। শিশুকে অপরিষ্কার হাতে খাবার না ধরা, মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার না খাওয়া এবং অপরিষ্কার পাত্রে খাবার না খাওয়ার বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝাতে হবে।
বাবা-মায়েরও শিশুর খাবার তৈরির ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর রাখা উচিত। বিশেষ করে ছোট শিশুদের খাবার ও পানীয় পরিষ্কারভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডিম, মাছ, দুধসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে।
শিশুর খাবারে বৈচিত্র্য রাখা ভালো এবং অতিরিক্ত ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও বেশি চিনি থাকা খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত। শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ বা ফর্মুলা প্রয়োজন হলে Baby Milk & Formula সম্পর্কেও জানতে পারেন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক активতা
শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক নড়াচড়াও শিশুর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা উচিত। দিনের একটি অংশ খেলাধুলা বা শারীরিক কর্মকাণ্ডে কাটানোর সুযোগ দিলে শিশুর শরীর সক্রিয় থাকে।
মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরিবর্তে শিশুকে বাইরে খেলতে বা বয়স উপযোগী শারীরিক কাজে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
অসুস্থ হলে কী করা উচিত
শিশু অসুস্থ হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। জ্বর, বমি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে শিশুর প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে।
অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় তরল দেওয়ার পাশাপাশি উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ছোট শিশুকে নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ দেওয়া নিরাপদ নয়।
বাবা-মায়ের আচরণই শিশুর প্রথম শিক্ষা
শিশুকে শুধু মুখে বলে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শেখানো সবসময় যথেষ্ট নয়। শিশুরা বড়দের দেখে অনেক কিছু শেখে। তাই বাবা-মা নিজেরাও নিয়মিত হাত ধোয়া, দাঁত ব্রাশ করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস অনুসরণ করলে শিশু সেগুলো সহজেই অনুকরণ করবে।
ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা এই অভ্যাসগুলো ভবিষ্যতে শিশুর দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে যেতে পারে। তাই শাসন বা ভয় দেখানোর বদলে আনন্দের সঙ্গে এবং ধৈর্য ধরে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসগুলো শেখানোই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
ছোট অভ্যাস, বড় উপকার
শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় সবসময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত হাত ধোয়া, দাঁত ব্রাশ করা, পরিষ্কার পোশাক পরা, নিরাপদ পানি পান করা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা উচিত। এতে সে শুধু আজ সুস্থ থাকবে না, ভবিষ্যতেও নিজের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আরও সচেতন হয়ে উঠবে।
২
২ মন্তব্য