Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ

কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বাংলাদেশের সম্ভাবনা...



আমাদের চারপাশে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠা উঠে আসে—"এত পড়ালেখা করে সনদ অর্জনের পরও তরুণরা উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না কেন?" উত্তরটি অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এতদিন মূলত তথ্য ও তত্ত্বনির্ভর ডিগ্রি অর্জনের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে ছিল, যা বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব এবং আধুনিক শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সাথে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারছে না। এই বৈষম্য দূর করতে এবং দেশের বিশাল জনশক্তিকে প্রকৃত অর্থে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে আজ বাংলাদেশ জুড়ে নতুন আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখা দিয়েছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (Technical and Vocational Education and Training - TVET)।


১. ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র

বাংলাদেশ বর্তমানে তার জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর এক সুবর্ণ যুগ পার করছে। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কার্যক্ষম তরুণ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও স্থানীয় শিক্ষাতথ্য ব্যুরোর উপাত্ত অনুযায়ী, কেবল তত্ত্বভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ওপর নির্ভর করে তরুণদের একটি বড় অংশ গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পেতে দীর্ঘ বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছে।


অথচ বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার এনরোলমেন্টের হার প্রতিনিয়ত বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে:

 * এনরোলমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা: মাধ্যমিকোত্তর কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের হার ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১৭% থেকে ২০%-এর কাছাকাছি উন্নীত হয়েছে এবং রূপকল্প ২০৩০ অনুযায়ী এটিকে ৩০%-এ নিয়ে যাওয়ার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।


 * নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ: পলিটেকনিক ও বিভিন্ন টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিগত দশকের ৯% থেকে বেড়ে প্রায় ২৫%-৩০%-এ পৌঁছেছে।


 * ইনস্টিটিউশনাল পরিধি: সারাদেশের ৮ হাজারেরও বেশি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ‘টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (TSC)’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রান্তিক তরুণদের হাতের নাগালে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।


২. কেন কারিগরি শিক্ষাই বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা?


ক. দ্রুত কর্মসংস্থান ও ইন্ডাস্ট্রি রেডিনেস

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR)-এর প্রভাবে শিল্পকারখানা ও সার্ভিস সেক্টরে সিএনসি অপারেটিং, অটোমেশন, মেকাট্রনিক্স এবং আইটি দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়েছে। জেনারেল গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে নতুন করে ট্রেনিং বা কাজের উপযোগী করতে সময়ের প্রয়োজন হলেও, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা বা এনএসডিএ (NSDA) স্বীকৃত সার্টিফাইড তরুণরা সরাসরি উৎপাদনশীলতায় যুক্ত হতে পারছেন।


খ. রেমিট্যান্সের গুণগত রূপান্তর

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET)-এর উপাত্ত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রবাসে গমনকারী শ্রমিকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অদক্ষ বা আধা-দক্ষ। বিশ্ববাজারের আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ টেকনিশিয়ান, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান বা স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান ও ইউরোপে কর্মসংস্থান তৈরি হলে একই পরিমাণ জনশক্তি পাঠিয়েই অন্তত ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব।


গ. আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন

কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা কেবল সনাতনী চাকরির পেছনে ছোটে না; তারা নিজেদের ল্যাবরেটরি বা ট্রেনিং অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল সার্ভিসিং কেন্দ্র, স্মল স্কেল ম্যানুফ্যাকচারিং এবং অটোমোবাইল সার্ভিসিং হাব তৈরি করে নিজেরাই কর্মসংস্থানদাতার ভূমিকায় উত্তীর্ণ হচ্ছে।


৩. সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বাধা ও উত্তরণের পদক্ষেপ

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সমীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি:

 * সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: জেনারেল শিক্ষার ডিগ্রির চেয়ে বাস্তব কাজের দক্ষতাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

 * আধুনিক ল্যাব ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিল্পখাতের পরিবর্তনের গতি অনুযায়ী পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোর ল্যাবরেটরি আধুনিক করতে হবে এবং প্রশিক্ষকদের নিয়মিত শিল্পকারখানার সাথে সংযুক্ত রাখা আবশ্যক।

 * ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন: স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারের প্রকৃত চাহিদার আলোকে প্রতি বছর টেকনিক্যাল কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ মডিউল পরিমার্জন করতে হবে।


শেষ কথা


ডিগ্রিনির্ভর বেকার সমাজ তৈরি না করে দক্ষ, আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গড়ে তোলাই এখন আমাদের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সময়োপযোগী বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং যথাযথ সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।


তথ্যসূত্র ও রেফারেন্সসমূহ (Information References):


 * প্রথম আলো (Prothom Alo - Editorial & Column): ‘সবার জন্য মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা’ (০৭ নভেম্বর ২০১৯) এবং ‘কারিগরি শিক্ষা কেন এখনো শেষ বিকল্প’ (০৩ অক্টোবর ২০২৬)।

 * দৈনিক ইত্তেফাক (Daily Ittefaq - Report): ‘কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৪.৫% আর্থিক সহায়তার বাইরে’ (বিবিএস ও এনএসডিএ যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা)।

 * ইউনেস্কো এবং বিশ্বব্যাংক (UNESCO UNEVOC & World Bank Group): Dynamic TVET Country Profiles - Bangladesh (2024–2026 Reports) & Building Better Formal TVET Systems Study।

 * বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS): বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান রিপোর্ট এবং বিটিইবি (BTEB) এনরোলমেন্ট ডাটা।

 * জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET): বৈদেশিক কর্মসংস্থান, দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণ ও রেমিট্যান্স পর্যালোচনা ডাটাবেজ। 

  


         ...... চলবে.......

মন্তব্য করুন