সহকারী অধ্যাপক
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
দাম্পত্যে বিরোধ নয়, চাই ভালোবাসা ও বিশ্বাস -মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
দাম্পত্যে বিরোধ নয়, চাই ভালোবাসা ও বিশ্বাস
(পারস্পরিক ভালোবাসা, আস্থা ও ক্ষমায় গড়ে উঠুক শান্তির পরিবার)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
দাম্পত্য জীবন মহান আল্লাহর দেওয়া এক অনন্য নিয়ামত। একজন পুরুষ ও একজন নারী যখন বৈধ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন তারা শুধু স্বামী-স্ত্রীই হন না; তারা একে অপরের সঙ্গী, সহযাত্রী, আশ্রয় ও শান্তির মাধ্যম হয়ে ওঠেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের মধ্য থেকেই তাদের জন্য জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে; আর তিনি তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন—এটি তাঁর নিদর্শন। (সূরা আর-রূম: ২১)
কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক দাম্পত্য জীবনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় অভিমান, বিশ্বাসের জায়গায় জন্ম নেয় সন্দেহ, আন্তরিকতার জায়গায় আসে অনাস্থা, আর সহযোগিতার জায়গায় শুরু হয় দোষারোপ। ছোট একটি বিষয় বড় ঝগড়ায় পরিণত হয়; পুরোনো ভুল বারবার সামনে আসে; একে অপরের ভালো কাজগুলো আড়ালে পড়ে যায়, অথচ সামান্য ভুলও হয়ে ওঠে কঠিন অভিযোগের বিষয়।
তখন প্রশ্ন জাগে—স্বামী-স্ত্রীর এই বিরোধ কবে শেষ হবে? অবিশ্বাস ও অনাস্থা কবে দূর হবে? তারা কবে আবার মনে-প্রাণে একে অপরকে ভালোবাসবে? কবে পরস্পরকে দোষারোপ না করে পরস্পরের পাশে দাঁড়াবে?
এর উত্তর হলো—কোনো নির্দিষ্ট দিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। যে দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের অহংকারের চেয়ে সম্পর্ককে বড় মনে করবেন, অভিযোগের চেয়ে সমাধানকে বেছে নেবেন, সন্দেহের বদলে সত্যতা গ্রহণ করবেন এবং প্রতিশোধের বদলে ক্ষমাকে বেছে নেবেন—সেদিন থেকেই পরিবর্তনের সূচনা হবে।
দাম্পত্যে বিরোধের মূল কারণ
দাম্পত্য কলহ সাধারণত একদিনে সৃষ্টি হয় না। ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি, অপূর্ণ প্রত্যাশা, অবহেলা, কঠিন কথা, আর্থিক চাপ, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, অতীতের ক্ষত, পারস্পরিক অসম্মান কিংবা অযথা সন্দেহ ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
কখনো স্বামী মনে করেন, স্ত্রী তাকে বোঝেন না; আবার স্ত্রী মনে করেন, স্বামী তার অনুভূতির মূল্য দেন না। কেউ মনে করেন, তিনি বেশি করছেন; অন্যজন মনে করেন, তার ত্যাগের কোনো স্বীকৃতি নেই। এভাবে দুজনেই নিজের কষ্ট দেখতে পান, কিন্তু অপরের কষ্টটি বোঝার চেষ্টা করেন না।
অথচ দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—‘আমি কতটা পেলাম’—এর পাশাপাশি ‘আমি কতটা দিলাম’—এই প্রশ্নটিও করতে হবে।
দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা
দাম্পত্যের অনেক সমস্যা আরও গভীর হয় যখন স্বামী-স্ত্রী প্রতিটি সমস্যার জন্য একে অপরকে দায়ী করতে থাকেন।
“তোমার জন্যই সব হয়েছে।”
“তুমি কখনো আমাকে বোঝ না।”
“তুমি সবসময় এমন করো।”
“তোমার কোনো পরিবর্তন হবে না।”
এ ধরনের বাক্য সমস্যার সমাধান করে না; বরং হৃদয়ের দূরত্ব বাড়ায়।
মুমিনের দায়িত্ব হলো আগে নিজের ভুল খুঁজে দেখা। আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১১) আবার তিনি বলেন, “অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয় কিছু ধারণা পাপ।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
তাই স্বামী বলুন—“আমার কোথায় ভুল হয়েছে?”
স্ত্রীও বলুন—“আমার আচরণে কোথায় কষ্ট পেয়েছে আমার জীবনসঙ্গী?”
যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সে সম্পর্ককে বাঁচানোর প্রথম দরজাটি খুলে দেয়।
অবিশ্বাস ও অনাস্থা কীভাবে দূর হবে?
বিশ্বাস দাম্পত্যের ভিত্তি। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু “আমাকে বিশ্বাস করো” বললেই তা ফিরে আসে না। বিশ্বাস ফিরে আসে সত্যবাদিতা, স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ধারাবাহিক সুন্দর আচরণের মাধ্যমে।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত—
- অপ্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা;
- আর্থিক বিষয়ে যথাসম্ভব স্বচ্ছ থাকা;
- প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করা;
- সন্দেহ সৃষ্টি করে এমন আচরণ এড়িয়ে চলা;
- কোনো বিষয়ে সংশয় হলে অনুমান না করে সরাসরি শান্তভাবে কথা বলা;
- একে অপরের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা।
কারণ সন্দেহের ওপর সংসার দাঁড়ায় না; সত্যতা ও আস্থার ওপর সংসার টিকে থাকে।
ইসলামও অমূলক সন্দেহ ও গোপন অনুসন্ধান থেকে সতর্ক করেছে। তাই কোনো প্রমাণ ছাড়া জীবনসঙ্গীকে অপরাধী মনে করা, প্রতিটি আচরণের নেতিবাচক ব্যাখ্যা করা কিংবা অকারণে নজরদারি করা দাম্পত্য শান্তির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
পুরোনো ভুলের বিচারসভা বন্ধ হোক
অনেক সংসারে একটি বড় সমস্যা হলো—আজকের ঝগড়ায় দশ বছর আগের ঘটনাও হাজির করা হয়।
একটি ভুলের জন্য মানুষ যদি বারবার বিচারাধীন থাকে, তাহলে সে সংশোধনের সুযোগ পায় না। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু প্রতিটি নতুন সমস্যায় পুরোনো ভুলের তালিকা খুলে বসা ঠিক নয়।
কেউ যদি সত্যিই ভুল করে থাকে, ভুল স্বীকার করে তওবা করে এবং সংশোধনের চেষ্টা করে, তাহলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আল্লাহ ক্ষমাশীলতা ও উত্তম আচরণকে পছন্দ করেন।
তাই দাম্পত্যে একটি নীতি হতে পারে—
“পুরোনো ক্ষতকে শিক্ষা হিসেবে রাখব, অস্ত্র হিসেবে নয়।”
ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, আচরণে প্রকাশ পায়
ভালোবাসা শুধু “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার নাম নয়। ভালোবাসা প্রকাশ পায়—
একটু সম্মানে,
একটু কোমল কথায়,
একটু সময় দেওয়ায়,
ক্লান্তির সময় পাশে দাঁড়ানোয়,
ভুল হলে ক্ষমা চাওয়ায়,
অসুস্থতায় সেবা করায়,
দুঃখের সময় সান্ত্বনা দেওয়ায়,
এবং সঙ্গীর ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উত্তম আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।” —তিরমিযি।
অতএব বাইরে মানুষের সঙ্গে ভদ্র আর ঘরে জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কঠোর—এটি মুমিনের আদর্শ হতে পারে না।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
দাম্পত্য কোনো আদালত নয়, যেখানে একজন বাদী আর অন্যজন আসামি। এটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রও নয়, যেখানে একজনের জয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।
বরং স্বামী-স্ত্রী একই নৌকার যাত্রী। একজন নৌকায় ছিদ্র করলে দুজনেরই ক্ষতি হবে; একজন নৌকাটি রক্ষা করলে দুজনই নিরাপদ থাকবেন।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“কে জিতবে?” নয়;
“আমাদের সম্পর্ক কীভাবে জিতবে?”
স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি নম্র হন এবং স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তাহলে অনেক বিরোধ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।
কথার আঘাত অনেক গভীর
দাম্পত্যে অনেক ক্ষত শরীরে দেখা যায় না; কিন্তু কথার আঘাত হৃদয়ে দীর্ঘদিন থেকে যায়।
অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, কটূক্তি, ব্যঙ্গ, তুলনা, হেয় করা কিংবা অন্যের সামনে জীবনসঙ্গীকে ছোট করা—এসব ভালোবাসাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে।
তাই রাগের সময়ও ভাষা সংযত রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” —সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
কখনো কখনো একটি মুহূর্তের নীরবতা একটি দীর্ঘ দাম্পত্যকে রক্ষা করতে পারে।
রাগের সময় সিদ্ধান্ত নয়
রাগের সময় মানুষ এমন কথা বলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো কখনো বলত না। তাই রাগের মুহূর্তে তালাকের হুমকি, বিচ্ছেদের ঘোষণা, অপমান কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
রাগ এলে কিছুক্ষণ নীরব থাকা, স্থান পরিবর্তন করা, ওজু করা, নামাজ পড়া, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর আলোচনা করা অধিক নিরাপদ পথ।
কারণ এক মুহূর্তের উত্তেজনায় বলা একটি বাক্য অনেক বছরের ভালোবাসাকে আহত করতে পারে।
“আমি” দিয়ে কথা বলা, “তুমি” দিয়ে আক্রমণ নয়
দাম্পত্যের আলোচনায় একটি সুন্দর পদ্ধতি হলো অভিযোগের পরিবর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা।
“তুমি আমাকে কখনো সময় দাও না”—এর পরিবর্তে বলা যায়—
“তুমি একটু সময় দিলে আমি নিজেকে আরও আপন মনে করি।”
“তুমি আমাকে বোঝো না”—এর পরিবর্তে বলা যায়—
“আমার কথা একটু মন দিয়ে শুনলে আমি খুব স্বস্তি পাই।”
এতে অপর পক্ষকে আক্রমণ করা হয় না; বরং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা হয়। ফলে প্রতিরোধ কমে, বোঝাপড়ার সুযোগ বাড়ে।
ক্ষমা দাম্পত্যের সৌন্দর্য
দাম্পত্য জীবনে এমন কোনো স্বামী নেই যার কোনো ভুল নেই; এমন কোনো স্ত্রীও নেই যার কোনো ত্রুটি নেই। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক।
মহান আল্লাহ বলেন—
“তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?”
—সূরা আন-নূর: ২২
তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। গুরুতর অন্যায় হলে তার সংশোধন, সীমারেখা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু যেখানে ক্ষমা করা সম্ভব, সেখানে প্রতিটি ভুলকে আজীবন শাস্তির কারণ বানানো উচিত নয়।
দাম্পত্যে গোপন কথা রক্ষা করা আমানত
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক ব্যক্তিগত কথা থাকে, যা বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজেদের অন্তরঙ্গ বিষয় বন্ধু, আত্মীয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অন্যের কাছে প্রচার করা সম্পর্কের মর্যাদা নষ্ট করতে পারে।
সমস্যা হলে সমাধানের জন্য বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ অভিভাবক বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে মানুষের আলোচনার বিষয় বানানো উচিত নয়।
আর্থিক চাপেও ভালোবাসা যেন হারিয়ে না যায়
সংসারে অর্থের প্রয়োজন আছে, কিন্তু অর্থই শান্তির একমাত্র উৎস নয়। সীমিত আয় ও অসীম চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে দাম্পত্যে অশান্তি বাড়ে।
স্বামীকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং স্ত্রীকেও পরিবারের সামর্থ্য ও বাস্তবতা বুঝতে হবে। অপচয়, অযথা তুলনা, অন্যের জীবন দেখে নিজের সংসারকে ছোট মনে করা—এসব থেকে উভয়ের বিরত থাকা প্রয়োজন।
মহান আল্লাহ বলেন—
“তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না; বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করে।”
—সূরা আল-ফুরকান: ৬৭
সংসারে সামর্থ্য অনুযায়ী চাহিদা নির্ধারণ করা, পরস্পরের সহযোগিতা করা এবং কৃতজ্ঞ থাকা দাম্পত্য শান্তির অন্যতম চাবিকাঠি।
সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও দাম্পত্যে শান্তি প্রয়োজন
স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ শুধু তাদের দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব সন্তানদের মনেও পড়ে। বাবা-মায়ের প্রতিনিয়ত ঝগড়া, অপমান, সন্দেহ ও দূরত্ব সন্তানকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
অন্যদিকে বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা, ক্ষমা ও সহযোগিতা সন্তানের সামনে একটি সুন্দর পারিবারিক আদর্শ তৈরি করে।
তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ, চরিত্র ও মানসিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেও স্বামী-স্ত্রীর উচিত নিজেদের সম্পর্ককে যত্ন করা।
ইসলাম দাম্পত্যকে শান্তি ও মমতার বন্ধন হিসেবে গড়ে তোলে
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
—সূরা আন-নিসা: ১৯
আর স্ত্রী-স্বামী সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”
—সূরা আল-বাকারা: ১৮৭
পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদন করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং নিরাপত্তা দেয়, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের দোষ-ত্রুটি আড়াল করবেন, সম্মান রক্ষা করবেন, নিরাপত্তা দেবেন এবং জীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবেন—এটাই এই আয়াতের গভীর তাৎপর্যের একটি দিক।
অতএব জীবনসঙ্গীকে প্রকাশ্যে অপমান করা, তার দুর্বলতা মানুষের কাছে প্রচার করা কিংবা প্রতিনিয়ত হেয় করা ইসলামী দাম্পত্যের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সমাধানের জন্য দুজনকেই এগিয়ে আসতে হবে
দাম্পত্যের সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু স্বামী পরিবর্তিত হলে হবে না, শুধু স্ত্রী পরিবর্তিত হলেও হবে না। অধিকাংশ পারস্পরিক বিরোধের স্থায়ী সমাধানের জন্য উভয় পক্ষেরই আন্তরিক ভূমিকা প্রয়োজন।
একজন বলবেন—
“তুমি আগে বদলাও, তারপর আমি বদলাব”—
এভাবে অপেক্ষা করলে পরিবর্তন বিলম্বিত হবে।
বরং একজনই আগে ভালো আচরণ শুরু করুন।
একজনই আগে ক্ষমা চান।
একজনই আগে কোমলভাবে কথা বলুন।
একজনই আগে বলুন—
“চলো, আমরা ঝগড়া নয়, সমাধানের পথে যাই।”
অনেক সময় একজনের আন্তরিক পরিবর্তন অপরজনের হৃদয়েও পরিবর্তনের দরজা খুলে দেয়।
সমাধানের একটি বাস্তব পারিবারিক অঙ্গীকার
স্বামী-স্ত্রী চাইলে নিজেদের মধ্যে কয়েকটি অঙ্গীকার করতে পারেন—
প্রথমত: আমরা রাগের সময় অপমানজনক কথা বলব না।
দ্বিতীয়ত: আমরা অমূলক সন্দেহ করব না।
তৃতীয়ত: কোনো সমস্যা হলে তৃতীয় ব্যক্তির কাছে যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে শান্তভাবে আলোচনা করব।
চতুর্থত: পুরোনো ভুলকে বারবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করব না।
পঞ্চমত: আমরা একে অপরের ভালো কাজের প্রশংসা করব।
ষষ্ঠত: আমরা একে অপরের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করব।
সপ্তমত: আমরা সন্তানদের সামনে ঝগড়া ও অপমান থেকে বিরত থাকব।
অষ্টমত: আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী সংসার পরিচালনা করব এবং অযথা তুলনা করব না।
নবমত: আমরা ভুল হলে ক্ষমা চাইব এবং ক্ষমা করতে শিখব।
দশমত: আমরা নামাজ, দোয়া, তওবা ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে নিজেদের অন্তর সংশোধনের চেষ্টা করব।
বিরোধ বেশি হলে সালিশ ও পরামর্শের পথ
যদি কোনো দাম্পত্য সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং স্বামী-স্ত্রী নিজেরা সমাধান করতে না পারেন, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“তোমরা যদি তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে তার পরিবারের পক্ষ থেকে একজন সালিশ এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো; তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে সমন্বয় করে দেবেন।”
—সূরা আন-নিসা: ৩৫
এ থেকে বোঝা যায়, সমস্যা যখন গভীর হয়, তখন ন্যায়পরায়ণ ও বিচক্ষণ অভিভাবক বা উপযুক্ত পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া ইসলামীভাবে গ্রহণযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
তবে সালিশ এমন হতে হবে, যিনি আগুনে ঘি ঢালবেন না; বরং ন্যায়, গোপনীয়তা, পারিবারিক কল্যাণ ও শরিয়তের নীতিকে সামনে রেখে সমাধানের চেষ্টা করবেন।
কখন ভালোবাসা ফিরে আসবে?
স্বামী-স্ত্রী যদি প্রশ্ন করেন—“আমাদের মধ্যে আবার আগের মতো ভালোবাসা কবে ফিরবে?”
উত্তর হলো—
যেদিন অভিযোগের আগে বোঝার চেষ্টা হবে,
যেদিন সন্দেহের আগে সত্য যাচাই হবে,
যেদিন রাগের আগে সংযম আসবে,
যেদিন ভুলের আগে ক্ষমা মনে পড়বে,
যেদিন নিজের অধিকারের পাশাপাশি অপরের অধিকারও মনে থাকবে,
যেদিন “আমি” ও “তুমি”-র দেয়াল ভেঙে “আমরা” তৈরি হবে—
সেদিন থেকেই ভালোবাসা ফিরে আসতে শুরু করবে।
ভালোবাসা হঠাৎ ফিরে আসে না; ছোট ছোট সুন্দর আচরণে ধীরে ধীরে ফিরে আসে। একটি কোমল কথা, একটি আন্তরিক ক্ষমা, একটি সত্য স্বীকার, একটি কৃতজ্ঞতা, একটি পাশে দাঁড়ানো—এসবই ভাঙা সম্পর্কের ইট-পাথর দিয়ে নতুন করে ভালোবাসার ঘর নির্মাণ করে।
উপসংহার
দাম্পত্য জীবন আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। এখানে কেউ সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। স্বামী যেমন ভুল করতে পারেন, স্ত্রীও ভুল করতে পারেন। তাই একজন আরেকজনের ভুলের হিসাবরক্ষক না হয়ে একে অপরের সংশোধনের সহযাত্রী হওয়া উচিত।
সংসারে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে বিদ্বেষ থাকা জরুরি নয়। রাগ আসতে পারে, কিন্তু অপমান করা প্রয়োজন নেই। ভুল হতে পারে, কিন্তু ক্ষমার দরজা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। অভিমান হতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে দেওয়াই সমাধান নয়।
দাম্পত্যের সৌন্দর্য হলো—দুজন মানুষ একে অপরের পরিপূর্ণতা নয়, বরং একে অপরের সহযাত্রী হয়ে জীবনকে সুন্দর করে তোলা।
তাই আসুন, আমরা দাম্পত্যে দোষারোপের পরিবর্তে আত্মসমালোচনা, সন্দেহের পরিবর্তে আস্থা, অনাস্থার পরিবর্তে স্বচ্ছতা, কঠোরতার পরিবর্তে কোমলতা, অভিমানের পরিবর্তে আন্তরিকতা এবং বিচ্ছেদের চিন্তার পরিবর্তে সংশোধনের চেষ্টা করি।
স্বামী বলুক—
“আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসতে চাই না, তোমাকে বুঝতেও চাই।”
স্ত্রী বলুক—
“আমি শুধু তোমার কাছে অধিকার চাই না, তোমার কষ্টও বুঝতে চাই।”
দুজন মিলে বলুক—
“আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে নই; আমরা সমস্যার বিরুদ্ধে। আমরা পরস্পরকে হারাতে চাই না; আমরা আমাদের সংসারকে জিতাতে চাই।”
যে ঘরে আল্লাহর স্মরণ আছে, যেখানে নামাজ আছে, যেখানে ক্ষমা আছে, যেখানে পরস্পরের মর্যাদা রক্ষা করা হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করে—সেই ঘরেই ধীরে ধীরে ফিরে আসে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমত।
হে আল্লাহ! আমাদের দাম্পত্য জীবন থেকে বিরোধ, অবিশ্বাস, অনাস্থা, অহংকার ও দোষারোপ দূর করে দিন। স্বামী-স্ত্রীর অন্তরে পারস্পরিক ভালোবাসা, আস্থা, মমতা, সম্মান, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা দান করুন। আমাদের পরিবারগুলোকে শান্তি, রহমত ও বরকতে ভরে দিন এবং আমাদের সন্তানদের জন্য সুন্দর, নিরাপদ ও আদর্শ পরিবার গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
৮
৮ মন্তব্য