Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৮ অপরাহ্ণ

শিক্ষার সমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা: বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের রূপান্তরকামনা

শিক্ষার সমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা: বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের রূপান্তরকামনা


মুফিদুল আলম

সিনিয়র শিক্ষক, রামু, কক্সবাজার


---


ভূমিকা


"শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড"—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি কেবল একটি আলংকারিক বাক্য নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সার্বিক মুক্তি, প্রগতি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সমাজের প্রতিটি স্তরের নাগরিককে মেধা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে সমতার সুযোগ প্রদান করা। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রকে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও গণমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘকাল ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বৈষম্যমূলক ধারা চলে আসছে, তার অন্যতম প্রধান প্রকাশ হলো বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ মানদণ্ড।


ঐতিহ্য, প্রতিষ্ঠার বয়স, কিংবা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের যে নীতি এতদিন প্রচলিত ছিল, তা মূলত রাষ্ট্রে বিদ্যমান শ্রেণিভেদ ও আঞ্চলিক বৈষম্যকেই দীর্ঘায়িত করেছে। শিক্ষা যখন পণ্যে পরিণত হয় এবং সুযোগ যখন ভৌগোলিক ও আর্থিক সীমারেখায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সমতার দর্শন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।


---


প্রথাগত মানদণ্ডের অন্তঃসারশূন্যতা ও বৈষম্যের রূপ


একটি রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত, এবং এই সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টনই সুশাসনের মূল পরীক্ষা। অথচ অতীতের অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জন্মগতভাবেই শহুরে আবহে গড়ে উঠেছে—যাদের নিজস্ব বিশাল ভূসম্পত্তি, প্রাচুর্যময় আর্থিক তহবিল এবং শহরের অভিজাত অভিভাবক সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে—মূলত বয়সের জ্যেষ্ঠতা বা সম্পদের বহর দেখিয়ে কেবল সেগুলোকেই জাতীয়করণের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের একটি বড় অংশ চলে গেছে ইতিমধ্যে সচ্ছল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে, যেখানে বিনিয়োগের প্রকৃত প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে কম।


এটি একধরনের নীতিগত বিচ্যুতি। প্রশ্ন জাগে—যে প্রতিষ্ঠানটি নিজের শক্তিতে বা স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দানে ইতিমধ্যে স্বাবলম্বী, তাকে রাষ্ট্র কেন নতুন করে সরকারি অনুদান বা জাতীয়করণের ছাতায় আশ্রয় দেবে? অন্যদিকে, দেশের যে প্রান্তিক জনপদে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানেরা অর্থের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেখানে একটি জরাজীর্ণ স্কুল অর্থের অভাবে ধুঁকছে—রাষ্ট্রের নজর সেখানে পৌঁছায় না। এই বৈষম্যমূলক নীতি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে শিক্ষাঙ্গনেও স্থায়ী রূপ দিচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, শহরের অভিজাত স্কুলের শিক্ষার্থী যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী মৌলিক শিক্ষা উপকরণের অভাবে তার সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারছে না।


---


মানদণ্ডের আমূল পরিবর্তন: প্রয়োজন জনকল্যাণমুখী ও সমতার দর্শন


রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের সমতল ভূমি তৈরি করতে হলে জাতীয়করণের মানদণ্ডকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার। তাই জাতীয়করণের মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত:


১. ভৌগোলিক অনগ্রসরতা ও প্রান্তিকতা


দেশের যে সমস্ত জনপদে মাধ্যমিক স্তরের মানসম্মত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটিও নেই—যেমন দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, নদীভাঙা চর এলাকা, উপকূলীয় জনপদ কিংবা হাওরাঞ্চল—সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভৌগোলিক বৈষম্য দূরীকরণই হবে জাতীয়করণের প্রথম ধাপ।


২. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচক


এলাকার মানুষের গড় জীবনমান, সাক্ষরতার হার এবং অভিভাবকগণের আর্থিক সক্ষমতা বিচার করে জাতীয়করণের মাপকাঠি নির্ধারণ করা উচিত। যে এলাকায় মানুষের ব্যক্তিগত অনুদানে স্কুল টিকিয়ে রাখা অসম্ভব, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন কেবল সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পাশাপাশি, জাতীয়করণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর (যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তান) উপস্থিতির হারও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।


৩. সুযোগের সমতা ও মেধার বিকাশ


শহরের একটি অভিজাত স্কুলের শিক্ষার্থী যে বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং দক্ষ শিক্ষক পায়, মফস্বলের একটি স্কুলের গরিবের সন্তানকেও ঠিক একই সুযোগ দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। জাতীয়করণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এই সুযোগের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া—যাতে শিক্ষার্থীর জন্মস্থান বা পারিবারিক আর্থিক অবস্থা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে।


৪. জনসংখ্যার ঘনত্ব ও ভবিষ্যৎ চাহিদা


এলাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী সংখ্যার সম্ভাব্য বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয়করণের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা উচিত। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।


৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা


জাতীয়করণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না হয়। একটি স্বাধীন কমিশন বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে অগ্রাধিকার তালিকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।


---


উপসংহার


একটি মেধাভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাখাতের এই কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা আজ সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। বয়স, সম্পদ বা লবিংয়ের পুরোনো মাপকাঠি ছুড়ে ফেলে রাষ্ট্রকে নিতে হবে প্রকৃত জনকল্যাণমুখী ও সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদের চেতনা বাস্তবায়ন করে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4) অনুসারে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত এলাকাকে উন্নয়নের মূল ধারায় টেনে আনার মাধ্যমেই কেবল শিক্ষাখাতে সত্যিকারের সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব, যা নিশ্চিত করবে একটি প্রগতিশীল, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।


---


লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, রামু, কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ