অধ্যক্ষ
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৫৩ অপরাহ্ণ
যা হারিয়েছেন, তার জন্য কাঁদছেন; যা পেয়েছেন, তার জন্য কি শুকরিয়া করছেন?
যা হারিয়েছেন, তার জন্য কাঁদছেন; যা পেয়েছেন, তার জন্য কি শুকরিয়া করছেন?
মানুষের জীবনের এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলো, আমরা যা হারাই, তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি; আর যা প্রতিদিন পাই, তা যেন আমাদের চোখেই পড়ে না। একটি স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমরা কাঁদি, প্রিয় কেউ দূরে চলে গেলে কষ্ট পাই, অর্থ হারালে দুশ্চিন্তায় ডুবে যাই। অথচ প্রতিদিন সকালে নতুন একটি দিন, নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ, পরিবারের কারও ভালোবাসা, দুমুঠো খাবার কিংবা মাথার ওপর একটি ছাদ পাওয়ার জন্য কতবার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি?
একবার নিজের জীবনটার দিকে তাকিয়ে দেখুন। আপনি হয়তো এমন কিছু হারিয়েছেন, যা ফিরে পাওয়ার জন্য আজও অপেক্ষা করছেন। হয়তো কোনো সম্পর্ক ভেঙেছে, কোনো প্রিয় মানুষ দূরে চলে গেছে, কোনো চাকরি হাতছাড়া হয়েছে কিংবা বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আপনার কষ্ট সত্যি, আপনার চোখের পানিরও মূল্য আছে। ইসলাম আপনাকে কষ্ট অস্বীকার করতে বলে না। কিন্তু সেই কষ্টের ভেতরেই যে অসংখ্য নিয়ামত আপনার জীবনে রয়ে গেছে, সেগুলো ভুলে যেতে নিষেধ করে।
আপনি যে আজও বেঁচে আছেন, সেটাই এক বিরাট সুযোগ। আপনার ভুল সংশোধনের সুযোগ আছে, তওবা করার সুযোগ আছে, নতুন করে শুরু করার সুযোগ আছে। আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি নিঃশ্বাস, চোখের দৃষ্টি, কানে শোনার ক্ষমতা এবং বিবেক দিয়ে ভালো-মন্দ বোঝার শক্তি, এসব কি কম নিয়ামত?
একবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির কথা ভাবুন, যিনি সুস্থ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন। আবার সেই মানুষটির কথা ভাবুন, যিনি সুস্থ শরীর পেয়েও সারাক্ষণ নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিচ্ছেন। পার্থক্যটা কোথায়? একজন যা হারিয়েছেন, তা ফিরে পেতে চান; অন্যজন যা পেয়েছেন, তার মূল্য বুঝতে পারছেন না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১৮)
তবু আমরা নিয়ামত ভুলে গিয়ে অভাবের হিসাব কষতে ব্যস্ত থাকি। অন্যের বাড়ি, অন্যের সম্পদ, অন্যের সুখ দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। অথচ যাকে দেখে আপনি হিংসা করছেন, তার জীবনেও এমন কিছু কষ্ট থাকতে পারে, যার কথা আপনি জানেন না।
মনে রাখবেন, শুকরিয়া মানে এই নয় যে জীবনে আর কোনো চাওয়া থাকবে না, কষ্ট থাকবে না কিংবা উন্নতির চেষ্টা বন্ধ হয়ে যাবে। শুকরিয়া হলো, অপূর্ণতার মাঝেও প্রাপ্তির মূল্য বুঝতে শেখা। যা নেই, তার জন্য চেষ্টা করুন; কিন্তু যা আছে, তার অবমূল্যায়ন করবেন না। দুঃখ এলে ধৈর্য ধরুন, সুখ এলে কৃতজ্ঞ হোন, ভুল হলে তওবা করুন, আর প্রতিটি নতুন দিনকে নিজেকে বদলে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করুন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন, মুমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক। সুখের সময় সে শুকরিয়া আদায় করে, আর দুঃখের সময় ধৈর্য ধারণ করে। উভয় অবস্থাতেই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯)
তাই আজ নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন: আমি যা হারিয়েছি, তার জন্য কতটা কেঁদেছি? আর আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তার জন্য কতবার সিজদায় মাথা নত করেছি?
জীবন শুধু হারানোর গল্প নয়, প্রাপ্তিরও এক বিশাল উপাখ্যান। অতীতের শূন্যতা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বর্তমানের সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবেন না। যে দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে, তার জন্য দুঃখ হতে পারে; কিন্তু যে দরজাগুলো এখনো খোলা আছে, সেগুলোও দেখুন।
আজ থেকে অভিযোগের পাশাপাশি শুকরিয়া আদায় করুন। কারণ আপনি যা হারিয়েছেন, তা হয়তো আপনার জীবনের একটি অধ্যায়; কিন্তু আল্লাহ আপনাকে যে নিয়ামতগুলো দিয়েছেন, সেগুলো আপনার পুরো জীবনকে নতুন অর্থ দিতে পারে।
আলহামদুলিল্লাহ বলুন শুধু মুখে নয়, হৃদয়ে, আচরণে এবং কাজে। মনে রাখবেন, প্রকৃত ধনী সে নয়, যার সবকিছু আছে; বরং সে-ও ধনী, যে নিজের প্রাপ্তির মূল্য বুঝতে শিখেছে।
যা হারিয়েছেন, তার জন্য চোখ ভিজতে পারে; কিন্তু যা পেয়েছেন, তার জন্য হৃদয় যেন শুকরিয়ায় ভরে থাকে।
১৮
২৮ মন্তব্য