সহকারী শিক্ষক
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:১১ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের তিন কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী: জীবন ও শিল্পকর্ম
বাংলাদেশের চারুকলার ইতিহাসে তিন নাম সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান এবং এস এম সুলতান। তাঁরা কেবল চিত্রশিল্পীই নন, ছিলেন সমাজসচেতন মানবিক শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক এবং দেশপ্রেমিক চেতনার প্রতীক। তিন শিল্পীর জীবন, শিক্ষাজীবন, শিল্পধারা, বিখ্যাত কর্ম, পুরস্কার এবং বাংলাদেশের প্রতি অবদান তুলে ধরব।
1. শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন (১৯১৪–১৯৭৬)
জীবনী ও শিক্ষাজীবন
জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার কেন্দুয়ায় (বর্তমানে নেত্রকোনা) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে ব্রহ্মপুত্র নদ ও গ্রামীণ পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তাকে গড়ে তোলে। ১৯৩৩ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট-এ ভর্তি হন এবং প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন । ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
১৯৪৭-এর পর পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় 'গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস' (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে জাতীয় অধ্যাপক উপাধিতে ভূষিত হন।তিনি বাংলাদেশের প্রথম হাতে লেখা সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করেন।
শিল্পধারা ও বৈশিষ্ট্য
জয়নুল আবেদিনের শিল্পধারা বাস্তবধর্মী ও লোকঘেঁষা আধুনিকতার সমন্বয়। তিনি সাঁওতাল জীবন, দুর্ভিক্ষ, গ্রামবাংলার উৎসব ও মুক্তিযুদ্ধের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করেছেন। লোকশিল্পের জ্যামিতিক আকৃতি, মৌলিক রঙ এবং দীর্ঘ স্ক্রল চিত্র তাঁর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
বিখ্যাত শিল্পকর্ম
দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩): ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের ওপর আঁকা চিত্রমালা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
সংগ্রাম (১৯৫৯): সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের প্রতীকী চিত্র।
মই দেয়া, ঝড়, কাক, বিদ্রোহী: মানবিক সংগ্রাম ও প্রতিবাদের চিত্র।
সাঁওতাল রমণী: আদিবাসী নারীর মর্যাদা ও জীবনচিত্র।
নবান্ন (১৯৬৯): ৬৫ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল চিত্র; গ্রামবাংলার উৎসব ও নবান্ন উদযাপনকে কেন্দ্র করে।
মনপুরা-৭০ ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপসহ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানা ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় (‘গোর্কি’ ট্র্যাজেডি) এবং তার পরবর্তী ভয়াবহ ধ্বংসলীলা।
উপাধি ও পুরস্কার
প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৫৮
হিলাল-ই-ইমতিয়াজ (১৯৫৮)
জাতীয় অধ্যাপক (১৯৭৪)
স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭, মরণোত্তর)
বাংলাদেশের প্রতি অবদান
জয়নুল আবেদিন ঢাকায় চারুকলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক শিল্পশিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেন। দুর্ভিক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক মুহূর্তকে শিল্পে নথিবদ্ধ করেছেন। সাঁওতাল ও লোকজীবনের চিত্রাঙ্কনে লোকশিল্পের ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন।
2. পটুয়া কামরুল হাসান (১৯২১–১৯৮৮)
জীবনী ও শিক্ষাজীবন
কামরুল হাসান ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন; পৈতৃক নিবাস পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। কলকাতা মাদ্রাসা ও ইন্সটিটিউট অব আর্টস থেকে চারুকলায় শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৪৭ সালে ফাইন আর্টসে পাস করেন।
দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিনের সাথে মিলে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৮–১৯৬০ পর্যন্ত চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন এবং পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের প্রধান নকশাবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগের শিল্প বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। তিনি নিজে 'পটুয়া' পরিচয়ে পরিচিত হতে পছন্দ করতেন।
শিল্পধারা ও বৈশিষ্ট্য
কামরুল হাসানের শিল্পধারা প্রগতিশীল বাস্তবধর্মী ও প্রতিবাদী শিল্প। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জনজীবন ও রাজনৈতিক চেতনা তাঁর মূল বিষয়বস্তু। স্পষ্ট রেখা, প্রতীকী উপস্থাপন এবং পোস্টার-শৈলীর সরলতা তাঁর শিল্পের বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প হবে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার।
বিখ্যাত শিল্পকর্ম
এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে (১৯৭১): মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিবাদী শিল্পকর্ম; পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রোশ।
দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে (১৯৮৮): মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে আঁকা শেষ স্কেচ; রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ।
তিন কন্যা: নারী ও পারিবারিক জীবনের কোমল দিক; ডাকটিকিটেও মুদ্রিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা (১৯৭২): শিবনারায়ণ দাসের নকশাকে পরিমার্জনা করে বর্তমান রূপ দেন।
উপাধি ও পুরস্কার
রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক (১৯৬৫)
প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬৫)
স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৯)
বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ (১৯৮৫)
বাংলাদেশের প্রতি অবদান
কামরুল হাসান মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের শিল্প বিভাগের দায়িত্বে থেকে পোস্টার, প্রচারণা ও জাতীয় পতাকার নকশায় ভূমিকা রাখেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক ভূমিকায় থেকে শিল্পশিক্ষাকে প্রসারিত করেন। 'পটুয়া' পরিচয়ে লোকচিত্রের সরলতা ও প্রতীকী ভাষাকে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তরিত করেন।
3. এস এম সুলতান (১৯২৩–১৯৯৪)
জীবনী ও শিক্ষাজীবন
শেখ মোহাম্মদ সুলতান ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামে একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই ছবি আঁকার প্রতিভা প্রকাশ পায়। স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় এবং তাঁর ভাইপো অরুণ রায়ের উৎসাহে শিল্পচর্চায় এগিয়ে যান।
১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং কয়েক বছর পর অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা সম্পন্ন করে ভারত ভ্রমণে বের হন। কাশ্মীর, দিল্লি, লাহোর, শিমলাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ছবি আঁকেন এবং বিক্রি করেন। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান। পরে নড়াইলে ফিরে গ্রামীণ জীবন ও শিশুশিক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
শিল্পধারা ও বৈশিষ্ট্য
এস এম সুলতানের শিল্পধারা গ্রামীণ ও মহাকাব্যিক বাস্তবতা। কৃষক, কৃষিজীবন, প্রকৃতি ও গ্রামের মহিমা তাঁর মূল বিষয়বস্তু। তেলরঙে ইম্পাস্টো, পেশীবহুল দেহ, উজ্জ্বল রঙ এবং পূর্ণ ক্যানভাস জুড়ে চিত্রাঙ্কন তাঁর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন কৃষকই জাতির মেরুদণ্ড এবং গ্রামকে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করতেন।
বিখ্যাত শিল্পকর্ম
প্রথম বৃক্ষরোপণ (১৯৭৫): গ্রামীণ পরিবেশ ও মানুষের সম্পৃক্ততাকে মহিমামণ্ডিত করে।
চরদখল (১৯৭৬): পেশীবহুল কৃষকদের সম্মিলিত শ্রম ও অধিকার আদায়ের প্রতীক।
জমি চাষ/কর্ষণ (১৯৮৬): কৃষকের শ্রমকে জাতির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন।
হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭): শ্রেণীদ্বন্দ্ব ও গ্রামীণ বঞ্চনার ক্রূর বাস্তবতা।
মাছ কাটা, বন্যার পর, শাপলা তোলা: গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
উপাধি ও পুরস্কার
ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট (কেমব্রিজ, ১৯৮২)
ম্যান অব এশিয়া (এশিয়া উইক, ১৯৮২)
একুশে পদক (১৯৮২)
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৩)
বাংলাদেশের প্রতি অবদান
এস এম সুলতান গ্রামীণ কৃষক ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেন। নড়াইলে ফিরে গ্রামীণ জীবন ও শিশুশিক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কৃষকদের পেশীবহুল, মহাকাব্যিক রূপে চিত্রিত করে শিল্পে দার্শনিক ও রেনেসাঁ-ঘেঁষা মানবিকতা ফুটিয়ে তোলেন।
জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও এস এম সুলতান তিনজনেই বাংলাদেশের চারুকলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। তাঁদের শিল্পকর্ম কেবল সৌন্দর্য নয়, ইতিহাস, সংগ্রাম ও আশার দলিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই শিল্পকর্ম শিক্ষার পাশাপাশি দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা।
নিজস্ব শিল্পভাষা গড়ে তোলা জয়নুলের 'বাংলা রীতি', কামরুলের 'পটুয়া-প্রতীকী' ভাষা, সুলতানের 'মহাকাব্যিক কৃষক'। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও জাতীয় পরিচয় গঠনে শিল্পকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। সাধারণ মানুষ, কৃষক, আদিবাসী ও নারীর জীবনকে শিল্পে মর্যাদা দেওয়া।অন্যায়, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে শিল্পের মাধ্যমে কণ্ঠস্বর তোলা।
পাশ্চাত্য ধারার অনুকরণ না করে স্থানীয় বিষয় ও রীতিকে আধুনিক রূপ দেওয়া।
১৮
২৮ মন্তব্য