সহকারী শিক্ষক
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
ইভটিজিং : সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমাদের করণীয়
ইভটিজিং: সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমাদের করণীয়
লেখক: মোহাম্মদ নবী
ভূমিকা
ইভটিজিং বর্তমান সমাজের একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী ছাত্রী ও নারীরা বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে কিংবা জনসমাগমস্থলে এর শিকার হন। অশালীন মন্তব্য, কটূক্তি, অশোভন অঙ্গভঙ্গি, অনাকাঙ্ক্ষিত অনুসরণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা পাঠানোর মতো আচরণ একজন মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি নষ্ট করতে পারে।
একটি সভ্য সমাজে নারী-পুরুষ সবারই নিরাপদে চলাফেরা করার অধিকার রয়েছে। তাই ইভটিজিং প্রতিরোধ করা শুধু ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
ইভটিজিং কী?
ইভটিজিং বলতে সাধারণভাবে নারী বা মেয়েদের উদ্দেশে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন আচরণ, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, উত্ত্যক্ত করা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো আচরণকে বোঝানো হয়। বর্তমানে অনলাইনেও ছবি বা ভিডিও নিয়ে হয়রানি, অশালীন বার্তা পাঠানো এবং বারবার বিরক্ত করার মতো ঘটনা ঘটছে।
এ ধরনের আচরণকে কখনোই নিছক মজা, দুষ্টুমি কিংবা প্রেমের প্রকাশ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারও সম্মতি ছাড়া তাকে বিব্রত বা ভীত করা তার মর্যাদা ও অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।
ইভটিজিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব
ইভটিজিংয়ের প্রভাব শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর কারণে—
১. ভুক্তভোগী মানসিক চাপ, ভয় ও অপমানবোধে ভুগতে পারেন।
২. অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বা পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন।
৩. পরিবারে উদ্বেগ ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
৪. অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে হয়রানির ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
৫. নারীর প্রতি অসম্মান ও বৈষম্যমূলক মনোভাব সমাজে শক্তিশালী হতে পারে।
ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই শালীনতা, সংযম ও অন্যের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
অর্থ: “মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
—সূরা আন-নূর, আয়াত ৩০
পরের আয়াতেও মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই নৈতিকতা ও শালীনতা বজায় রাখতে বলে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
অর্থ: “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০
এই হাদিস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, কথা বা কাজের মাধ্যমে অন্যকে কষ্ট দেওয়া ও হয়রানি করা একজন মুসলিমের চরিত্রের পরিপন্থী।
ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
১. পরিবারকে সচেতন হতে হবে: সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা, শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং অন্যের ব্যক্তিগত সীমারেখা মেনে চলার শিক্ষা দিতে হবে।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে: শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা আয়োজন করা উচিত। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না: কেউ ইভটিজিং করলে তাকে উৎসাহ দেওয়া, হাসাহাসি করা কিংবা ঘটনাকে তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়। নিরাপদভাবে প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তির সহায়তা নিতে হবে।
৪. ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে: কোনো নারী বা শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে সহানুভূতি ও সহযোগিতা দিতে হবে। তার পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তাও রক্ষা করতে হবে।
৫. আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে: ইভটিজিং বা যৌন হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধ করতে হবে: আপত্তিকর বার্তা বা পোস্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, মনে রাখবে—কারও পোশাক, চলাফেরা, চেহারা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করার অধিকার কারও নেই। বন্ধুদের সামনে নিজেকে সাহসী প্রমাণ করতে গিয়ে কাউকে উত্ত্যক্ত করা সাহসিকতা নয়; বরং এটি দায়িত্বহীনতা।
একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ অন্যের সম্মান রক্ষা করতে জানেন। তাই নিজের আচরণ সংশোধন করো, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ো না এবং সহপাঠীদের নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করো।
উপসংহার
ইভটিজিংমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। নারীকে সম্মান করা, অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীলভাবে দাঁড়ানো আমাদের সবার কর্তব্য।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে প্রতিটি মেয়ে ও নারী ভয় ছাড়াই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে পারবেন এবং নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন।
আমাদের অঙ্গীকার হোক—ইভটিজিং নয়, সম্মান ও নিরাপত্তাই হোক সমাজের পরিচয়।
২
২ মন্তব্য