অধ্যক্ষ
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৯ পূর্বাহ্ণ
আল্লাহর পরিকল্পনা বুঝতে না পারলেও বিশ্বাস রাখা
আল্লাহর পরিকল্পনা বুঝতে না পারলেও বিশ্বাস রাখা
জীবনের প্রতিটি ঘটনা আমরা বুঝতে পারি না। কখনো এমন কিছু ঘটে, যার জন্য আমরা একেবারেই প্রস্তুত থাকি না। যাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ ভেবেছিলাম, সে-ই একদিন দূরে চলে যায়। যে স্বপ্ন পূরণের জন্য রাতের পর রাত দোয়া করেছি, সেই স্বপ্নই হয়তো ভেঙে যায়। অনেক চেষ্টা করেও যখন কিছু পাওয়া যায় না, তখন মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন জাগে। মনে হয়, আল্লাহ কি আমার দোয়া শুনছেন না? আমার চোখের পানি কি তাঁর কাছে পৌঁছায় না? এত চাওয়ার পরও কেন আমার জীবনে সবকিছু এমন হচ্ছে?
কিন্তু বিশ্বাসের সৌন্দর্য এখানেই, সবকিছু বুঝতে না পারলেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
আমরা জীবনের একটি ছোট্ট অধ্যায় দেখে পুরো গল্পের বিচার করে ফেলি। আজ যা আমাদের কাছে কষ্টের, আগামীকাল হয়তো সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। আজ যে দরজাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা কাঁদছি, হয়তো সেই দরজার ওপাশে আমাদের জন্য কোনো কল্যাণ ছিল না। আর যে পথটি আজ আমাদের কাছে অন্ধকার মনে হচ্ছে, আল্লাহ হয়তো সেই পথ দিয়েই আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবেন, যেখানে পৌঁছানোর কথা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি।
আমরা শুধু বর্তমানটা দেখি, কিন্তু আল্লাহ আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই জানেন। আমরা জানি কী চাই, কিন্তু সব সময় জানি না কোনটি আমাদের জন্য সত্যিই ভালো। কখনো কখনো আমরা এমন কিছুর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি, যা পেলে হয়তো আমাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে যেত। আবার কখনো এমন কিছু হারিয়ে ফেলি, যাকে ছাড়া বেঁচে থাকাই অসম্ভব মনে হয়। সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারি, কিছু হারানোও জীবনের অংশ, কিছু বিচ্ছেদও আমাদের বেড়ে ওঠার কারণ।
তাই বলে বিশ্বাস রাখা মানে এই নয় যে আমাদের কখনো কষ্ট হবে না, চোখে পানি আসবে না কিংবা মন ভেঙে যাবে না। বিশ্বাসী মানুষও কাঁদে, একাকিত্ব অনুভব করে, রাতের নীরবতায় বুকভরা কষ্ট নিয়ে আল্লাহর কাছে নিজের অভিযোগগুলো প্রকাশ করে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, কষ্টের মধ্যেও সে আল্লাহর দরজা ছেড়ে যায় না। সে জানে, মানুষ তার ব্যথা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও আল্লাহর কাছে তার মনের কোনো কথাই অজানা নয়।
কখনো কখনো দোয়ার উত্তর পেতে দেরি হয়। আমরা চাই আজই সব ঠিক হয়ে যাক, আজই আমাদের অপেক্ষার অবসান হোক, আজই আমাদের জীবনে সুখ ফিরে আসুক। কিন্তু জীবনের সবকিছু আমাদের চাওয়ার সময় অনুযায়ী ঘটে না। ধৈর্য ধরতে হয়, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয়। কারণ দোয়া করার পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। শুধু অপেক্ষা নয়, সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়াও বিশ্বাসের একটি অংশ।
হয়তো তুমি এখন জীবনের এমন একটি সময় পার করছ, যেখানে কোনো কিছুই তোমার মনের মতো হচ্ছে না। হয়তো অনেকের সামনে হাসছ, অথচ একা হলে নিজের কষ্ট লুকাতে পারছ না। হয়তো প্রতিদিন আল্লাহর কাছে একই কথা বলছ, কিন্তু এখনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছ না। তবুও নিজেকে একা ভেবো না। তোমার কষ্টের কথা আল্লাহ জানেন। তোমার প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং তোমার অন্তরের প্রতিটি আকুতি তাঁর অজানা নয়।
মনে রেখো, আল্লাহর পরিকল্পনা বুঝতে না পারা মানেই এই নয় যে তোমার জীবনে কোনো কল্যাণ নেই। তবে প্রতিটি কষ্টের পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে, তা আমরা সব সময় জানতে পারি না। তাই প্রতিটি দুঃখকে নিশ্চিতভাবে কোনো বিশেষ পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি মনে না করে, সেই দুঃখের মধ্যেও আল্লাহর রহমতের আশা রাখো। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নাও, প্রয়োজনে সাহায্য চাও, হালাল পথে চেষ্টা করো এবং দোয়া চালিয়ে যাও।
জীবন সব সময় আমাদের ইচ্ছেমতো সাজানো হয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগে, কিছু ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে, আর কিছু বাস্তবতা মেনে নিতে হৃদয়কে অনেকবার বোঝাতে হয়। তবুও আল্লাহর প্রতি সুধারণা রেখো। কারণ মুমিনের আশা শুধু তার ইচ্ছা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার আশা আল্লাহর রহমত, ক্ষমা এবং চিরস্থায়ী আখিরাতের কল্যাণের মধ্যেও নিহিত।
আজ হয়তো তুমি বুঝতে পারছ না কেন তোমার সঙ্গে এমন হচ্ছে। হয়তো আজকের রাতটা তোমার কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। তবুও মনে রেখো, রাত যত দীর্ঘই হোক, সময় থেমে থাকে না। নিজের রবের কাছে ফিরে যাও, সিজদায় মনের কথা বলো, ধৈর্য ধরো এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাও।
সব পরিকল্পনার ব্যাখ্যা আজই জানতে হবে না। সব দোয়ার উত্তর নিজের পছন্দমতো পেতেই হবে, এমনও নয়। শুধু এতটুকু বিশ্বাস রেখো, তোমার রবের রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। 🤍
আল্লাহর পরিকল্পনা হয়তো আজ তোমার বোধগম্য নয়, কিন্তু তুমি তাঁর কাছে দোয়া করতে পারো, তাঁর ওপর ভরসা রাখতে পারো এবং আশা নিয়ে আগামী দিনের পথে এগিয়ে যেতে পারো।
কারণ কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও বিশ্বাস ধরে রাখাটাই হয় আমাদের সবচেয়ে সুন্দর ইবাদত।
০
০ মন্তব্য