Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ণ

চেতনা বিজ্ঞান ও দর্শনের নতুন সংশয়


একজন শীর্ষস্থানীয় স্নায়ুবিজ্ঞানী (নিউরোসায়েন্টিস্ট) প্রশ্ন তুলছেন—চেতনা কি মস্তিষ্ক থেকেই সৃষ্টি হয়, নাকি এটি বাস্তবতার কাঠামোর মধ্যেই অন্তর্নিহিত?: 

মানুষের অস্তিত্ব এবং মানসজগতের সবচেয়ে গভীর ও রহস্যময় দিকটি হলো ‘চেতনা’। পাকা স্ট্রবেরির টক-মিষ্টি স্বাদ নেওয়া, পায়ের পাতায় নরম বালুর স্পর্শ পাওয়া কিংবা তুষারাবৃত পর্বতের চূড়ায় রোদের ঝিলিক দেখা—এসবই চেতনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। 

কিন্তু বিজ্ঞানের যত অগ্রগতি হচ্ছে, গবেষকদের মনে ততই একটি মৌলিক প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছে—যাকে ‘চেতনা’ বলছি, তা কি সত্যিই কোনো স্বাধীন বাস্তব সত্তা, নাকি বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই শব্দটির ব্যবহারই ভুল?

সম্প্রতি চিলির সান্টিয়াগোতে আয়োজিত চেতনা-গবেষকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও এই প্রশ্নটি প্রাধান্য পেয়েছে। নবজাতক শিশু, ছোট মৌমাছি, কিংবা আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কি সত্যিই কোনো চেতনা আছে? নাকি বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ‘চেতনা’ ধারণাটিই অনুপযুক্ত?

চেতনা গবেষণা বহু দশক ধরে চললেও গবেষকরা এখনো এর একটি সর্বজনীন বা সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় পৌঁছতে পারেননি। বিভিন্ন গবেষণাক্ষেত্রে শব্দটিকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়। কোনো ক্ষেত্রে এটিকে বলা হয় অনুভূতিশীলতা বা সংবেদনশীলতা। কোনো বিজ্ঞানে এটি সচেতনতা বা অনুধাবন ক্ষমতা। আবার কোথাও একে অবজেক্টিভ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

১৯৯০-এর দশকে এমআইটির দার্শনিক নেড ব্লক এক বিশেষ ধারণা তুলে ধরেন, যাকে বলা হয় ‘ফেনোমেনাল কনশাসনেস’ বা অনুভূতির চেতনা। সহজ কথায়, এটি হলো কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় মনের ভেতরে ‘কেমন লাগছে’ তার উপস্থিতি। যখন জেগে থাকি, তখন আমাদের ভেতরে অনুভূতির একটি অবিরাম ধারা বইতে থাকে। কিন্তু যখন কোনো স্বপ্নহীন গভীর ঘুমে থাকি কিংবা অস্ত্রোপচারের জন্য চেতনানাশক দেওয়া হয়, তখন এই অনুভব পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তিন দশক ধরে এই ধারণাটিই চেতনা-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

 এটি নৈতিকতার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো প্রাণী বা যন্ত্রের যদি অনুভূতি বা ‘কেমন লাগছে’র ভাব থাকে, তবেই তার নৈতিক অধিকার বা সম্মানের বিষয়টি সামনে আসে।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইতিহাসজুড়ে মানব সংস্কৃতিতে ‘চেতনা’ বা ‘ফেনোমেনাল কনশাসনেস’-এর ধারণা সব সময় ছিল না। দার্শনিক ক্যাথলিন ভি. উইলকস তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাচীন গ্রিক, ম্যান্ডারিন, ক্রোয়েশীয় কিংবা ১৭ শতকের পূর্বের ইংরেজিতে এই আধুনিক ‘চেতনা’র সমার্থক কোনো শব্দই ছিল না। এমনকি বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতিতেও মন বা মস্তিষ্ককে বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো, তা আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণার সঙ্গে মেলে না। অর্থাৎ যাকে বর্জনীন মানসিক অবস্থা ভেবে আসছি, তা হয়তো আধুনিক পশ্চিমা দর্শন ও বিজ্ঞানের তৈরি একটি ধারণামাত্র।

বিজ্ঞানীরা যদি চেতনার সুনির্দিষ্ট কোনো ভিত্তি খুঁজে না পান, তবে প্রশ্ন জাগে—বিজ্ঞান কি ভুল কোনো ধারণাকে সত্য ধরে নিয়ে উত্তর খুঁজছে? বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগেও এমন ঘটেছে। একসময় দহন প্রক্রিয়ার জন্য ‘ফ্লজিস্টন’ কিংবা আলো চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ‘ইথার’কে বাস্তব বলে মনে করা হতো। কিন্তু বিজ্ঞান যত উন্নত হয়েছে, এই অবাস্তব ধারণাগুলো বাতিল হয়ে গেছে। 

বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, চেতনার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটা অসম্ভব নয়। ‘চেতনা’ হয়তো একক কোনো বস্তু বা প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি মনোযোগ, স্মৃতি, অনুভূতি ও আত্ম-সচেতনতার মতো মস্তিষ্কের অনেক জটিল কাজের সম্মিলিত ফলাফল। একে একক কোনো জিনিস ভেবে উত্তর খোঁজা বিজ্ঞানের জন্য এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

মানুষের মনোজগৎ ও অনুভবকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানের বর্তমান পরিভাষা বা কাঠামো হয়তো যথেষ্ট নয়। যদি ‘চেতনা’ নামক একটি জটিল শব্দের পেছনে না ঘুরে, মস্তিষ্ক কীভাবে মনোযোগ দেয়, কীভাবে স্মৃতি ধরে রাখে বা কীভাবে অনুভূতি তৈরি করে—সেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোকে আলাদাভাবে বোঝার চেষ্টা করি, তবেই মানব মন, প্রাণিজগৎ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞান আসল অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ