সহকারী শিক্ষক
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
সীমা যখন ১.৪৪: কেন এই সংখ্যার কাছে হার মানে মহাজাগতিক দানবরা?
সীমা যখন ১.৪৪: কেন এই সংখ্যার কাছে হার মানে মহাজাগতিক দানবরা?
মহাবিশ্বের বিশালতায় আমরা প্রতিদিন কত শত বিস্ময় দেখি। তেমনই একটি বিস্ময় লুকিয়ে আছে নক্ষত্রদের জন্ম এবং মৃত্যুর পেছনে। আমাদের রাতের আকাশের মিটিমিটি তারাগুলো আসলে একেকটি জ্বলন্ত চুল্লির মতো, যারা নিজেদের মহাকর্ষের টানে বিপরীতে নিজেদের আকার ধরে রাখে। কিন্তু এই ধরে রাখারও একটা সীমা আছে। এই সীমাটিকে আমরা বলি 'চন্দ্রশেখর লিমিট', যার মান হলো সূর্যের ভরের ১.৪৪ গুণ। এটি মহাকাশের এক অদ্ভুত নিয়ম, যা আমাদের চোখে নক্ষত্রদের দানব মনে হলেও, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার কাছে তাদের হার মানতেই হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ১.৪৪ সংখ্যাটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনের গল্পটি চমকপ্রদ। নক্ষত্রদের মৃত্যু হয় প্রধানত দুটি শক্তির টানাটানির ফলে। একটি হলো তাদের নিজেদের ভরের কারনে প্রচণ্ড মহাকর্ষ শক্তি, যা তাদের কেন্দ্রের দিকে সব কিছুকে টেনে আনতে চায়। আর অন্যটি হলো নক্ষত্রের নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় বিপুল তাপ ও শক্তি উৎপন্নের ফলে ভেতরের কণার চাপ, যা বাইরের দিকে ঠেলে নক্ষত্রকে স্থিতিশীল রাখে। যতক্ষণ এই দুটি শক্তি ভারসাম্য বজায় থাকে, ততক্ষণ নক্ষত্র একটি স্থিতিশীল আকার ধারণ করে।
যখন নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটানোর জন্য কোনো নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন তার ভেতরের চাপ কমে আসতে শুরু করে। তখন মহাকর্ষ শক্তি বিজয়ী হতে শুরু করে এবং নক্ষত্রটি নিজের কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত হতে থাকে। ছোট থেকে মাঝারি আকারের নক্ষত্রগুলো, যেমন আমাদের সূর্য, যখন তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন তারা উলটো ফুলে ওঠে একটি লোহিত দানবে (Red Giant) পরিণত হয় এবং পরে নিজেদের বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়ে একটি সাদা বামন (White Dwarf) নক্ষত্রে পরিণত হয়। একটি সাদা বামন নক্ষত্র আকারে ছোট হলেও এটি অবিশ্বাস্যরকম ঘন হয়। এর পদার্থের ভেতরের ইলেকট্রনগুলো একে অপরের সাথে এতটাই চেপে থাকে যে তারা একটি বিশেষ চাপ তৈরি করে, যা নক্ষত্রটিকে আরও সংকুচিত হওয়া থেকে বাঁচায়। এটাই হলো ইলেকট্রন ডিজেনারেসি চাপ।
কিন্তু, যদি নক্ষত্রটির ভর সূর্যের ভরের ১.৪৪ গুণের বেশি হয়, তাহলে কী হবে? এখানেই আসে সেই ১.৪৪ সংখ্যাটির গুরুত্ব। এই সীমাটি হলো সেই অতিরিক্ত ভর, যার কারণে ইলেকট্রন ডিজেনারেসি চাপ আর মহাকর্ষের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। ইলেকট্রনগুলো আর চাপ ধরে রাখতে পারে না। তখন মহাকর্ষের টান এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে ঢুকে গিয়ে প্রোটনের সাথে মিশে নিউট্রন তৈরি করে। এর ফলে নক্ষত্রটি মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে এবং একটি ভয়ংকর বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়, যাকে আমরা সুপারনোভা বলি।
সুপারনোভার পর নক্ষত্রটির বাকি অংশ নিউট্রন স্টারে পরিণত হয়, যা এতটাই ঘন যে এর এক চামচ পদার্থের ওজন হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতের সমান হতে পারে। অথবা, যদি নক্ষত্রের মূল ভর আরও বেশি হয়, তবে সেটি এমনভাবে সংকুচিত হতে থাকে যে এটি সিংগুলারিটিতে পরিনত হয় এবং এর মহাকর্ষ এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে আলোও এর থেকে পালাতে পারে না, যা ব্ল্যাকহোল নামে পরিচিত।
এই যুগান্তকারী তত্ত্বটি আবিষ্কার করেছিলেন একজন ভারতীয় তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যাঁর নাম সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর। তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে জাহাজের ডেকের উপর বসে গণিতের সাহায্যে এই সীমারেখাটি খুঁজে বের করেন। তার এই আবিষ্কার মহাকাশ বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছিল এবং এর জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মহাকাশের এই দানবীয় নক্ষত্রগুলোও আসলে একটি গাণিতিক সংখ্যার কাছে অসহায়, এবং এই সংখ্যাটিই নির্ধারণ করে তাদের চূড়ান্ত ভাগ্য।
তথ্যসূত্র (গবেষণাপত্র) :
Chandrasekhar, S. (1931).
Title: "The Maximum Mass of an Ideal White Dwarf."
The Astrophysical Journal, 74, 81.
১৮
২৮ মন্তব্য