১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস এই বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করলেন। জিনিসটা আসলে কী ছিল?
জিনিসটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত। কে জমি চাষ করব, আর কে জমির আয় নিব।
চাষ করব চাষি। আয় নিব এমন একজন, যে জীবনে একদিনও লাঙল ধরে নাই। সে খালি একটা কাগজ ধইরা রাখব।
জমিদারের আয় আসত উৎপাদন থাইকা না, আসত একটা অধিকার দখলে রাখা থাইকা। সে ভালো ফলন চাইত না, সে চাইত কাগজটা তার নামেই থাকুক।
আর ঠিক এই কারণেই তার রাষ্ট্র লাগত না। তার খালি রাষ্ট্রের সিলটা লাগত।
জমিদারি আইন কইরা তুইলা দেওয়া হইসে। জমিদার গেছে, জমিদারি ব্যবস্থার যুক্তিটা যায় নাই। আয়ের উৎস উৎপাদন না, আয়ের উৎস অধিকার দখলে রাখা। খালি কাগজটার নাম বদলাইসে।
আজকে কাগজটার নাম লাইসেন্স। আমদানির অনুমতি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি। ব্যাংকের বোর্ডের একটা চেয়ার। একটা প্লট। একটা ঠিকাদারি। একটা ভালো পোস্টিং। যার হাতে ওই কাগজ, সে উৎপাদন করে না। সে সংগ্রহ করে।
এই দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর জীবন দিয়া দেয় একটা পরীক্ষার পিছনে। বিসিএস। তিরিশ বছর পর্যন্ত বিয়া নাই, ঘুম নাই, বন্ধু নাই।
এখন প্রশ্ন করেন, বেতনটা কত?
বেতনটা আহামরি কিছু না। একই ছেলে ওই দশ বছর একটা ভালো বেসরকারি চাকরিতে বা নিজের ব্যবসায় দিলে তার আয় খারাপ হইত না। একটা অতি সচ্ছল জীবন পাইতো। বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থায় টপ এক্সিকিউটিভের বেতন খারাপ না।
তাইলে পাগলামিটা কীসের জন্য? কারণ সরকারি চাকরির বেতনটাই বেতন না।
পদটাই বেতন। ফাইলটাই বেতন। সইটাই বেতন। কোন জেলা, কোন ক্যাডার, কোন টেবিল, ওইটাই আসল বেতন।
ওই ছেলেটা চাকরির পরীক্ষা দিতেসে না। সে বন্দোবস্তে ঢোকার পরীক্ষা দিতেসে।
কেউ মুখে কয় না, কিন্তু ঘরের ভিতরে সবাই জানে। মেয়ের বিয়ার সময় পাত্র সরকারি চাকুরে হইলে যেই দামটা বাড়ে, ওই দামটা বেতনের হিসাব থাইকা আসে না।
বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে অসৎ হওয়ার জন্য ওই পরীক্ষায় বসে না, বসে নিরাপত্তার জন্য। বাংলাদেশে বন্দোবস্তের পার্ট না হইলে আপনার কোন বেইল নাই।
দখল কাগজে হয় না, দখল মাটিতে হয়। আর মাটিতে দখল রাখতে গায়ের জোর লাগে। ওই জোরটা বিনা পয়সায় পাওয়া যায় না, ওইটা ভাড়া নিতে হয়।
তাই থানা এই দেশের সবচেয়ে ছোট বন্দোবস্তের অফিস। ওইখানে ঠিক হয় কোন দখলটা টিকব আর কোনটা টিকব না। মামলা কার নামে হইব, আর কার নামে হইলেও ফাইল নড়ব না।
ওই কাগজ ঠিক না থাকা, স্যার না থাকা, সার্ভার ডাউন থাকাটা কারও না কারও আয়। দালালের আয়। পিয়নের আয়। বড় কত্তার আয়। ফাইল যদি সাত দিনে আপনাআপনি ছাড়া হইত, ওই আয়ের উৎসটা ওইদিনই নষ্ট হইয়া যাইত।
এখন নিজের এলাকার দিকে তাকান, নাম ধইরা ধইরা মিলান। যারা চাকরি পাবেনা লেখাপড়াও করে নাই, তারা রাজনীতিতে আসে। ওই বন্দোবস্তের পার্ট হইতে আসে। ওই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যে নিজের বখড়া নিশ্চিত করতে আসে।
বাজারের ইজারা। ফুটপাতের চাঁদা। বাসস্ট্যান্ডের লাইনম্যান। ঘাটের ইজারা। জলমহাল। বালুমহাল। রাস্তার পাশের সরকারি জায়গায় দোকান। খাসজমি।
এখন একটা জিনিস খেয়াল করেন। এইগুলার একটাও কেউ বানায় নাই।
জলমহালের মাছ ইজারাদার বানায় নাই। নদীর বালু কেউ তৈরি করে নাই, নদী নিজে আনসে। রাস্তাটা বানাইসে আপনার টাকায়। বাজারটা বসে কারণ চাষি ফসল আনে আর মানুষ কিনতে আসে।
কেউ কিছু বানায় নাই। সবাই খালি ঢোকার দরজায় বইসা আছে।
জমিদার লাঙল ধরত না, খালি কাগজটা ধইরা রাখত। বালুমহালের ইজারাদার নদী বানায় না, খালি ইজারার কাগজটা ধইরা রাখে।
দুইশ বছরে যন্ত্রটা বদলায় নাই। খালি সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত টুকরা টুকরা কইরা সবার হাতে বিলি করা হইসে।
বন্দোবস্ত মানে ক্ষমতাবানদের নিজেদের মধ্যে একটা মীমাংসা, কে কী পাইব। এইটা দুর্ঘটনা না। একটা দলকে ক্ষমতায় তুলতে আর ক্ষমতায় রাখতে টাকা লাগে, লোক লাগে, আনুগত্য লাগে। ওগুলা বেতন দিয়া কেনা যায় না।
ওগুলা কেনা হয় অনুমতি দিয়া।
কাউকে একটা লাইসেন্স, কাউকে একটা ঠিকাদারি, কাউকে ব্যাংকের একটা চেয়ার, কাউকে একটা প্লট, কাউকে একটা পোস্টিং, কাউকে ঘাটের ইজারা। এইগুলাই আঠা। এইগুলা দিয়াই জোটটা জোড়া লাগানো থাকে।
তার মানে যেইটারে আমরা নৌকার ফুটো ভাবি, ওইটা ফুটো না।
আর এইটা পাঁচশ লোকের লোভ না, এইটা একটা পিরামিড। উপরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি, মাঝখানে একটা ভালো পোস্টিং, নিচে বালুমহাল, আর সবার নিচে ওই বারান্দার দালালটা। প্রত্যেকের ভাগ ছোট, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের ভাগটা প্রাণ দিয়া পাহারা দেয়।
এইজন্যই রাষ্ট্রের কোন সংস্কার হয়না। এখন বুঝেন আপনার কথা কেউ শোনে না কেন। এই কারণেই সংস্কারের কথা শুনলে ক্ষমতার লোক মাথা নাড়ে, কয় ঠিক কথা, খুবই ঠিক কথা, তারপর কিছু হয় না।
সে বোকা না। সে আপনার চাইতে অনেক ভালো বুঝসে আপনি আসলে কী চাইতেসেন। সে জানে, আপনি তারে আকাশের চাঁদ ভালোবাইস্যা দেখাইতেছেন না। সে জানে আপনি তার পিছে আইক্কাওয়ালা দিবেন। তার আয় রোজগার নিয়া টান দিবেন। তার যুগযুগান্তর ধরে তৈরি করা সাম্রাজ্য ভাঈঙ্গা দিবেন।
তাই সরকার বদলাইলে কী হয়?
ঘাটটা থাকে, ইজারাদার বদলায়। থানাটা থাকে, নামটা বদলায়। বারান্দাটা থাকে, খালি যুগযুগ ধইরা ওই সরকারি দপ্তরের বারান্দায় দাঁড়ায়ে থাকা ওই হতভাগ্য লোকটার নাম বদলায় না।
ওইটা আবুল হোসেনই থাকে। সবাইরে "আবুল" বানায়ে রাখাই বন্দোবস্তের প্রধান কাজ।
১৮
২৮ মন্তব্য