জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
‘শিক্ষক’– যাকে গুরু, পণ্ডিত ও ওস্তাদ বলা হয়। জন্মদাতা সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন ঠিকই, কিন্তু তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই শিক্ষককে সন্তানের দ্বিতীয় পিতা-মাতার মর্যাদা দেওয়া হয়। ছোটবেলায় আমরা কবি কাদের নেওয়াজের বিখ্যাত কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ পড়েছি। কবিতাটিতে একজন ছাত্রের তার শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে একজন শিক্ষকের মর্যাদা কতটা উচ্চে– তারও অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থী ও সমাজের শ্রদ্ধা-মর্যাদা যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় বাদশাহ আলমগীর তাঁর পুত্রের শিক্ষককে রাজদরবারে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। শিক্ষক প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও শিক্ষকের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে এক বুক সাহস নিয়ে রাজদরবারে উপস্থিত হন। বাদশাহ আলমগীর অভিযোগ করে বলেন–
“শুনুন জনাব তবে, পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে? বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা, নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকালবেলা।”
এরপর বাদশাহ আলমগীর সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন– শিক্ষক যখন নিজ হাতে তাঁর চরণ প্রক্ষালন করছিলেন, তখন তাঁর পুত্র শুধু পায়ে পানি ঢেলে দিয়েছিল; শিক্ষকের পা নিজ হাতে ধুয়ে দেয়নি। বিষয়টি বাদশাহকে ব্যথিত করেছিল। এখানেই শিক্ষকের মর্যাদার প্রকৃত উচ্চতা প্রকাশ পায়। কিন্তু একালের বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
হয়তো বিদ্যা অর্জনে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠছি কতজন? আজ শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে শাসন করলে কিংবা কোনো দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলে তাঁকেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কখনো অভিভাবকের অভিযোগ শুনতে হয়– কেন সন্তানকে শাসন করেছেন, কেন তাকে কোনো কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, কেন কঠোর হয়েছেন? ফলে শিক্ষকের স্বাভাবিক শাসন ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও এক ধরনের সংকোচ তৈরি হচ্ছে।
একজন গুরুর দোয়া একজন ছাত্রকে বহুদূর এগিয়ে নিতে পারে। আর একজন শিক্ষকের মনে কষ্ট দিয়ে অর্জিত কোনো সাফল্যও কখনো পরিপূর্ণতার অনুভূতি দিতে পারে না।
কিন্তু যুগের পরিক্রমায় আমরা যেন সেই দৃষ্টান্তগুলো ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি। যত কিছুই ভাবি না কেন, শিক্ষক আমাদের শিক্ষা অর্জনের বাহক। তাঁরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। তাই তাঁদের স্থান আমাদের হৃদয়ে, আমাদের জীবনে আমরণ। শিক্ষকের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্তরে জাগ্রত থাকুক। কোনো শিক্ষক যেন তাঁর ছাত্রের আচরণে কষ্ট না পান। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে একান্ত কামনা– পৃথিবীর সকল শিক্ষক ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকুন। হৃদয়ের গভীরে নীরবে-নিভৃতে শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি। স্যালুট জানাই সকল শিক্ষককে– যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্ঞানের আলো জ্বেলে এই সভ্য পৃথিবীকে সভ্যতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
লেখক:
জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
(শিক্ষক ও কলামিস্ট)
মাদারগঞ্জ, জামালপুর
১৮
২৮ মন্তব্য