সহকারী শিক্ষক
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
অগ্নি/গ/র্ভ দিল্লি, ৫০০০ আ/ন্দো/লনকারী আটক

ভারতের তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ দমনে দিনভর ধরপাকড় করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। এরই মধ্যে ৫ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তেলাপোকারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনে নেমে আটক হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী। পুরো দিল্লি ছিল অগ্নিগর্ভ। মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন; চলে তল্লাশি ও গণগ্রেফতার। অনেক সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। মধ্য দিল্লিতে মেট্রোরেল, বাস-ট্রেন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। বিক্ষোভ-স্লোগান, ধরপাকড় আর নিরাপত্তা বাহিনীর পদচারণায় সৃষ্টি হয় লকডাউন পরিস্থিতি। পরে মমতাসহ কয়েকজন নেতা ও বিক্ষোভকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দীপকেসহ কোনো ককরোচ নেতা মুক্ত হননি। তবে ছাত্রনেত্রী নেহাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক সিজেপির উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য হিন্দু জানায়, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। সে অনুযায়ী আজ রোববারও তারা বিক্ষোভ করবেন। শনিবার দলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান অজিঙ্কা শিন্ডে বলেন, আমরা রোববার আবার ফিরছি এবং যন্তর মন্তরের দিকে যাত্রা করছি। তিনি জানান, দীপকেসহ তাদের নেতাদের অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া হয়েছে। তারা কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য স্ক্রলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শনিবার দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে আটক হয়েছেন হাজারো মানুষ। এর মধ্যে রাজনীতিক, সমাজকর্মী, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ রয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় আর গণগ্রেফতারের মধ্যে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দিল্লিতে কোনো গণজমায়েত ঘটাতে পারেননি আন্দোলনকারীরা। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, গ্রেফতারের সংখ্যা ছয় হাজার। তবে দিল্লিতে ‘লকডাউন’ ও ব্যাপক কড়াকড়ি সত্ত্বেও সিজেপি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে ভারতের বাণিজ্যনগরী মুম্বাইতেও। সেখানে অভিনেতা ইমরান খানসহ অনেকে আটক হন।
শনিবার সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ছাড়াও গ্রেফতার হন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাদের আটকের ভিডিও ভাইরাল হলে তা নিয়ে ভারতজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। দীপকে-কে বলতে শোনা যায়-‘দেশ কোনদিকে এগোচ্ছে দেখুন। ফ্লাইটের ভেতরে তারা এসেছে আমাদের গ্রেফতার করতে। এটা তো ইন্দিরা গান্ধীও করেননি। দিল্লি পুলিশ আমাদের ফ্লাইটের ভেতরে এসেছে গ্রেফতার করতে!’ এরপরই তিনি বলেন, ‘আসো, গ্রেফতার করো। গ্রেফতার হতেই আমরা এসেছি।’
আটক করা হয়েছে ককরোচ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে জার্মানি থেকে ভারতে আসা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে। এছাড়া অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নেহা বোরাও গ্রেফতার হন। পুলিশ বাসে করে নিয়ে যাওয়ার সময় নেহা নানা স্লোগান দেন। এছাড়া শত শত বিক্ষোভকারীকে সাময়িক আটক করা হয়। বাদ যাননি আইনজীবী, সাংবাদিক বা নারী বিক্ষোভকারীরা। অনেক নারী বিক্ষোভকারী দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্তার অভিযোগ তোলেন। তাদের অভিযোগ, পুরুষ পুলিশ তাদের হেনস্তা করেছে। বিক্ষোভকারীদের হাতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদদের ছবি দেখা গেছে; তারা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমমূলক নানা স্লোগান দেন। বিক্ষোভের মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এনআরসির নামে তার বিরুদ্ধে বিজেপিকে ক্ষমতায় রাখতে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে বিরোধী দলের ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রশাসন। মোতায়েন করা হয় প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। একাধিক মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। দিল্লিতে আসা দূরপাল্লার ট্রেনের চলাচল বন্ধ থাকে। জনসমাগম দেখলেই আটক ও মারধর করে নিরাপত্তা বাহিনী।
আটকদের বিভিন্ন বাসে তুলে নিয়ে অস্থায়ী কারাগারে রাখা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিক্ষোভ শুরুর আগেই বিভিন্ন স্থানে পুলিশ অভিযান চালায়। সন্দেহের ভিত্তিতে অনেককে আটক করে বাসে তোলা হয়। তাদের মধ্যে কেউ বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছিলেন, কেউ সংবাদ সংগ্রহ করতে। একজনের দাবি, আত্মীয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়েছে।
দিল্লির বাওয়ানা এলাকার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামের একাংশকে অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে। আটক কয়েকজন জানান, বিক্ষোভের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যন্তর মন্তরের কাছাকাছি ভিডিও ধারণের সময় দুই কনটেন্ট নির্মাতাকে আটক করা হয়। অন্যদিকে আরও কয়েকজনকে শালিমারবাগ এলাকার সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বিদ্যালয়কেও অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে। আটক হন নিউজলন্ড্রি ও স্ক্রলের কয়েকজন সাংবাদিক।
সিজেপি নেতাদের আটকের প্রতিবাদ জানিয়েছেন লাদাখের অধিকারকর্মী সুনম ওয়াংচুক। আজ রোববারের মধ্যে তাদের মুক্তি না দিলে ফের অনশনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এছাড়া ব্যাপক ধড়পাকড়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচির অধিকারকে ‘সম্মান জানানোর’ কথা বলেছে। সেই আটকদের অবিলম্বে মুক্তিরও দাবি জানিয়েছে।
বিক্ষোভ করে আটকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও রয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস এটাকে ভারতের ‘গণতন্ত্রের জন্য কালো দিন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। পরে মমতাসহ নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে নাগরিক অধিকার সংগঠন সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে পথে নেমে পুলিশের হাতে আটক হন সুপ্রিমকোর্টের শতাধিক আইনজীবী। তাদের মধ্যে নারী আইনজীবীরাও আছেন। তাদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও হেনস্তার অভিযোগ তুলে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। আটক আইনজীবীদের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।
ভারতের অন্তত দুটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দিল্লিতে শনিবার বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় তাদের সাংবাদিকদের দিল্লি পুলিশ আটক করেছে। নিউজলন্ড্রি জানায়, তাদের তিনজন প্রতিবেদক-অশ্বিন সিং, সব্যসাচী আস্তা ও আনমোল প্রীতমকে আটক করা হয়েছে; তাদের কাজে ব্যবহৃত ফোনগুলো জব্দ করা হয়েছে। এক্স-এ এক পোস্টে সংবাদমাধ্যমটি অভিযোগ করে, ওই সাংবাদিকদের বিক্ষোভকারীসহ প্রায় ৩০ জনের সঙ্গে একটি বাসে তোলা হয়েছিল। স্ক্রলও তাদের এক সাংবাদিককে আটকের কথা জানিয়েছে।
দিল্লিতে সিজেপির শনিবারের আন্দোলন ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগে থেকেই হাজার হাজার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচরা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির ঘোষণা করলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণদের এ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাপক ধরপাকড়ে তা গণজমায়েতে রূপ নেয়নি। সূত্র জানায়, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মিলিয়ে ৩৫ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা যেসব পথ দিয়ে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেন, সেগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়। বিভিন্ন এলাকায় যানবাহনে নজরদারি ও সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ বিভিন্ন হোটেল, অতিথিশালা, ছাত্রাবাস ও অন্য আবাসনে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন বলেও খবর আসছে। বিশেষ করে অন্য রাজ্য থেকে আসা তরুণ-তরুণীদের দলবদ্ধ উপস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে। এর আগে শুক্রবার রাতেই যন্তর মন্তরসংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করে জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়। জারি করা হয় গণজমায়েতবিরোধী আইন ১৬৩ ধারা। জনপথ ও কর্তব্যপথের সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।


২
২ মন্তব্য