সহকারী শিক্ষক
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫১ পূর্বাহ্ণ
কড়া পাহারায় তৈরি প্রশ্ন, তাও ফাঁস

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কীভাবে ঘটলো, তা খতিয়ে দেখছে সরকার। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মাধ্যমে জানা গেছে, পরীক্ষার আগের দিন রাতে রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একটি কক্ষে সারারাত ধরে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর মূল কাজ চলে। গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা পুরো সময় ওই কক্ষেই অবস্থান করছিলেন।
সূত্রমতে, মূল কক্ষটিতে নিয়োগ কমিটির পাঁচজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং তারাই প্রশ্নপত্র তৈরির কাজটি সম্পন্ন করেন। এছাড়া তাদের সার্বিক সহায়তায় ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী সেখানে কাজ করছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করতে শুরুতেই তাদের সবার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং কক্ষে থাকা সব ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়।
কঠোর নিরাপত্তার পরও শেষ রক্ষা হয়নি। রাতের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরীক্ষাটি স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন উঠেছে, এত কড়াকড়ির মধ্যেও প্রশ্নপত্র বাইরে গেল কীভাবে? নিয়োগ কমিটির সদস্য, নাকি প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজে যুক্ত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মী- কার মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে? নাকি অন্য কোনো দুর্বলতা ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ওএমআরডিএম সিস্টেমের কর্মীদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। তদন্তে সহায়তার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) যুক্ত করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, প্রধান কার্যালয় থেকে বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়েছিল। নিয়োগ কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মীও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় তাদের কেউ জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সিআইডি জবানবন্দি গ্রহণ করছে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, এ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাই কেবল প্রশাসনিক তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফৌজদারি মামলা করে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এটি তদন্ত করতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তিনি।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রশ্নপত্র আগে থেকে তৈরি না করে পরীক্ষার আগের রাতে প্রস্তুত, মুদ্রণ ও প্যাকেটজাত করা হয়। এই কার্যক্রমে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব ডি এম আতিকুর রহমান। সদস্য সচিব ছিলেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন-১) আতিকুর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনের দুজন প্রতিনিধি। তাদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউ পদ্ধতির এই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন বা ওএমআর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর জন্য একটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। এর নাম ওএমআরডিএম সিস্টেম। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের নাম জহাদুর রহমান।
প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও মুদ্রণের কাজে কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি এই ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জহাদুর রহমান বলেন, আমরা কর্মী দিতে চাইনি। অধিদপ্তর আমাদের কাছে লোক চেয়ে নিয়েছে। এ জন্য চুক্তিপত্রে ফটোকপি মেশিনের অপারেটর ও বাইন্ডিংয়ের জন্য আলাদা লোক দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, কর্মীরা শুক্রবার সন্ধ্যায় অধিদপ্তরে গেছে। এরপর রাত ১০টায় তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং কক্ষে প্রবেশ করানো হয়।
প্রশ্নপত্রের যে ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে মনে হচ্ছে, কেউ একজন হাতের ওপর রেখে প্রশ্নপত্রের ছবিটি তুলেছেন। ছবিতে আঙুলের সামান্য অংশ আছে বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এখন ওই আঙুল এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
স্থগিত হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় পরীক্ষা নেওয়া হবে।


১৮
২৮ মন্তব্য