প্রধান শিক্ষক
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ণ
পাথরের বুকে জীবন্ত ইতিহাস ডাম্বুলায়
পাথরের বুকে জীবন্ত ইতিহাস ডাম্বুলায়
একে তো তীব্র গরম। সঙ্গে অতিরিক্ত আদ্রতা। পাথরের পাশে পাথর সাজানো পথ বেয়ে উঠতে দরদরিয়ে ঘাম ছুটছে। উর্দ্ধমুখী পথটা থেকে বহু দূর অবধি দৃষ্টি চলে। দিগন্তে নীল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের নান্দনিক সব নকশা। তার নিচে সবুজে ছাওয়া পাহাড় শ্রেণি। ঢেউখেলানো। সবুজে ছাওয়া। খাড়া সিঁড়ি বাওয়ার কষ্ট উবে গেলো উপরের চত্বরে উঠে। চারপাশের গাছগুলোতে খেলা করছে বুনো বানরের দল। লাফিয়ে ছুটছে এক গাছ থেকে আর এক গাছে।
এখান থেকে দিগন্তের আকাশ যেনো আরো সুন্দর রূপ নিয়ে ঝুলে রইলো চোখের সামনে। নিচের পাহাড় শ্রেণিও আরো মেলে দিয়েছে তার রূপের বাহার। দূরে সিগিরিয়া রকও দিব্যি নজরে আসে। সামনে অতিকায় পাহাড়ের মসৃণ দেয়াল। তার নিচে ডাম্বুলা গুহা মন্দির। শ্রীলঙ্কার কালচারাল ট্রায়াঙ্গেলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র তীর্থস্থান, স্বর্ণমন্দির নামেও পরিচিতি আছে এর।পাঁচটি গুহার গুচ্ছ মন্দিরে ২২ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটেছে। সমভূমি থেকে প্রায় ১৬০ মিটার উঁচুতে একটি বিশাল গ্রানাইট পাথরের পাহাড় কেটে মন্দিরগুলো তৈরি। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে এটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান ঘোষণা করা হয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে অনুরাধাপুরার রাজা ছিলেন ভালা গাম্বা। দক্ষিণ ভারতীয়দের আক্রমণে সিংহাসনচ্যুত হন তিনি। তারপর দীর্ঘ ১৪ বছর এই দুর্গম গুহাগুলোতে আত্মগোপনে থাকেন। গুহাবাসী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাকে রক্ষা করেন। পরবর্তীতে রাজা ভালা গাম্বা সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। সন্ন্যাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই প্রাকৃতিক গুহাগুলোকে এক একটি চমৎকার উপাসনালয় বা শৈল বিহারে রূপান্তরিত করেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে নিসাঙ্কমল্ল, সেনারাত্ন ও কীর্তি শ্রী রাজাসিংহের মতো মহান সিংহলি রাজারা এই মন্দিরের শিল্পকলা ও স্থাপত্যের সম্প্রসারণ ঘটান।এই গুহা কমপ্লেক্সটি মূলত ৫টি প্রধান গুহাকক্ষ নিয়ে গঠিত। সিংহলি বৌদ্ধ শিল্পকলার সেরা নিদর্শনগুলো এই গুহাগুচ্ছেই সংরক্ষিত।
পাথরের পাহাড় কেটে তৈরি করা ১৪ মিটার দীর্ঘ বুদ্ধের শায়িত এক মূর্তি এখানে দ্যুতি ছড়াচ্ছে দেবারাজা বিহার বা ঈশ্বর রাজার মন্দিরে। সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় গুহা মহারাজা বিহার যেন প্রাচীন শ্রীলঙ্কার ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক। এখানে বুদ্ধ মূর্তিগুচ্ছের পাশাপাশি হিন্দু দেবতা বিষ্ণু ও গণেশের মূর্তি রয়েছে। ক্যান্ডির রাজা কীর্তি শ্রী রাজাসিংহের আমলে নির্মিত মহা আলুথ বিহার বা মহান নতুন মন্দিরে ক্যান্ডিয়ান শৈলীর অসংখ্য বুদ্ধ মূর্তি। চমৎকার ছাদচিত্র বিমুদ্ধতা ছড়ায়। পাশ্চিমা বা পশ্চিমের গুহা আকারে কিছুটা ছোট হলেও কেন্দ্রে একটি ছোট স্তূপ বা চেতিয়া রয়েছে। আর তুলনামূলকভাবে নতুন গুহা,দেবনা আলুথ বিহার বা দ্বিতীয় নতুন মন্দিরে মূলত ইটের আস্তরণে তৈরি বুদ্ধের বিভিন্ন ভঙ্গিমার ভাস্কর্য।গুহাগুলোর সিলিং ও দেয়ালে প্রায় দুই হাজার ১০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে আছে প্রাচীন ফ্রেসকো বা রঙিন দেয়ালচিত্র। এই চিত্রগুলোতে বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক যুদ্ধের কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ডাম্বুলা যেন শত শত বছরের জীবন্ত মঠ। যেখানে শত শত বছর ধরেই সন্ন্যাসীরা ধ্যান ও ধর্মচর্চা করে আসছেন।
গুহাগুলোর ভেতরে এক ধরণের গভীর নিস্তব্ধতা, পরম আধ্যাত্মিক প্রশান্তির অনুভূতি।
এখানে একটি গুহার ভেতরে পাহাড়ের ছাদ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তে থাকে। অনবরত পড়ে। পড়তেই থাকে। তীব্র খরাতেও কখনো বন্ধ হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই পানিকে অত্যন্ত পবিত্র বলে জ্ঞান করে। এই পানি ধর্মীয় আচারে কাজে লাগায়।ডাম্বুলা গুহা মন্দির শ্রীলংকার কালচারাল ট্রায়াঙ্গেল বা সাংস্কৃতিক ত্রিভুজের অন্যতম আকর্ষণ। আর সাংস্কৃতিক ত্রিভুজ শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রস্থলে প্রাচীন ইতিহাস, রাজকীয় ঐতিহ্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এই এলাকাটি মূলত প্রাচীন সিংহলী সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যা ঐতিহাসিকভাবে 'রাজারাতা' বা রাজাদের ভূমি নামে পরিচিত। মানচিত্রে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও পর্যটন প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯৭০-এর দশকে শ্রীলঙ্কা সরকার সাংস্কৃতিক ত্রিভূজ নামটি প্রচলন করে। শ্রীলঙ্কার তিনটি ঐতিহাসিক রাজধানী শহরকে মানচিত্রে রেখা দিয়ে যুক্ত করলে একটি নিখুঁত ত্রিভুজ আকৃতি তৈরি হয়। এ কারণেই এর নাম ত্রিভূজ। এর শীর্ষ বা উত্তর বিন্দুতে অনুরাধাপুরা।পূর্ব বিন্দুতে পোলোন্নারুয়া ও দক্ষিণ বিন্দুতে ক্যান্ডি।
এই ত্রিভুজাকার অঞ্চলের ভেতরেই শ্রীলঙ্কার আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি, বৌদ্ধ ধর্মীয় নিদর্শন ও রাজকীয় ইতিহাসের অভূতপূর্ব সমাবেশ।খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর দিকে শ্রীলঙ্কার প্রথম প্রাচীন রাজধানী ছিল অনুরাধাপুরা। এখানে বিশাল সব বৌদ্ধ স্তূপ ওপৃথিবীর প্রাচীনতম মানব-রোপিত গাছ 'শ্রী মহা বোধি'র অবস্থান।অনুরাধাপুরার পতনের পর শ্রীলংকার প্রাচীন রাজধানীর হয়ে ওঠে পোলোন্নারুয়া। এখানে পাথরের গায়ে খোদাই করা বুদ্ধের বিশাল মূর্তি ও রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো অতীতের গৌরব বইছে। এ দুই প্রাচীন রাজধানীর পর সিংহলী রাজাদের শেষ রাজধানী শহর ক্যান্ডি। পাহাড়ের ওপরে পাহাড় ঘেরা এই সুন্দর শহরে বিখ্যাত বুদ্ধের পবিত্র দাঁতের মন্দির অবস্থিত।
এই ত্রিভুজের ঠিক মাঝখানে সিগিরিয়া লায়ন রক। আস্ত এক খাড়া পাহাড় জুড়ে পাথরের দুর্গ। রাজা কাশ্যপ মাটির প্রায় ২০০ মিটার উঁচুতে এই পর্বতদুর্গ ও রাজপ্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। এই দুর্গ প্রাচীন প্রকৌশল বিদ্যার এক বিস্ময় হয়ে আছে।
এছাড়াও সাংস্কৃতিক ত্রিভূজের আর একটি অন্যতম আকর্ষণ ডাম্বুলা গুহা মন্দির। এটি পাহাড়ের ভেতরের পাঁচটি প্রাকৃতিক গুহা নিয়ে গঠিত অপূর্ব এক মন্দির কমপ্লেক্স।
১৮
২৮ মন্তব্য