Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:০৩ পূর্বাহ্ণ

অন্যের ক্ষতি নয়, অন্যের কষ্টে ধৈর্য : ইসলামের আলোকে মহৎ জীবনদর্শন - মোঃ মুজিবুর রহমান

অন্যের ক্ষতি নয়, অন্যের কষ্টে ধৈর্য : ইসলামের আলোকে মহৎ জীবনদর্শন

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানুষের জীবনের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদায় নয়; বরং তার চরিত্র, সংযম, উদারতা ও অন্যের প্রতি আচরণে প্রকাশ পায়। যে মানুষ নিজের দ্বারা অন্যের ক্ষতি হতে দেয় না, অন্যের অধিকার নষ্ট করে না এবং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ন্যায় ও সংযমের পথ বেছে নেয়, সে মানবিক মহত্ত্বের পরিচয় দেয়। আবার কেউ কষ্ট দিলে সেই কষ্টের প্রতিশোধ না নিয়ে ধৈর্য ধারণ করা, ক্ষমার সুযোগ থাকলে ক্ষমা করা এবং মন্দ আচরণের জবাবে মন্দ আচরণ না করা—এসবও উন্নত চরিত্রের লক্ষণ।

তবে মহৎ জীবনদর্শনের অর্থ এই নয় যে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না, নিজের অধিকার বিসর্জন দেবে কিংবা সব কষ্ট নীরবে নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখবে। ইসলামের শিক্ষা হলো—নিজে অন্যায় না করা, অন্যের প্রতি ন্যায়বিচার করা, অন্যায়ের শিকার হলে ধৈর্য ধারণ করা এবং প্রয়োজন হলে ন্যায়সংগত উপায়ে নিজের অধিকার রক্ষা করা। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শন মানুষকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, সহনশীল ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশী করে তোলে।

নিজের দ্বারা কারও ক্ষতি না হোক

মানুষের অন্যতম বড় গুণ হলো নিজের কথা, কাজ ও আচরণের মাধ্যমে অন্যকে নিরাপদ রাখা। মানুষের হাত ও জিহ্বা যেন কারও কষ্টের কারণ না হয়, তার সম্পদ যেন অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ না হয়, তার সম্মান যেন অপমানিত না হয় এবং তার অধিকার যেন পদদলিত না হয়—এ বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতন থাকা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এই শিক্ষা মানুষের আচরণে দায়িত্বশীলতা, সংযম ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলে। রাগের মুহূর্তে কঠোর কথা না বলা, মতের অমিল হলে অপমান না করা, ক্ষমতা পেলে দুর্বলকে নির্যাতন না করা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট না করা—এসবের মধ্য দিয়েই উত্তম চরিত্রের প্রকাশ ঘটে।

একজন মানুষ হয়তো পৃথিবীর সব মানুষের উপকার করতে পারবে না; কিন্তু সে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কারও ক্ষতির কারণ না হয়, সেই চেষ্টা করতে পারে। অন্যের জীবনে আলো জ্বালাতে না পারলেও অন্ধকার বাড়িয়ে না দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব। মানুষের প্রতি এই দায়িত্ববোধ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।

অন্যের দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধারণ

জীবনে কষ্ট আসবেই। কখনো প্রিয়জনের কথায় মন ভেঙে যায়, কখনো বন্ধুর আচরণে বিশ্বাস নষ্ট হয়, কখনো উপকার করার পরও অবহেলা কিংবা অপবাদ সহ্য করতে হয়। আবার কখনো নিজের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না। এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দুঃখ, ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু একজন বিবেকবান মানুষের পরিচয় হলো, সে কষ্ট পেলেও নিজের নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলে না। অন্যের অন্যায়ের কারণে নিজে অন্যায়কারী হয়ে ওঠে না। কেউ অপমান করলে সে অপমানের ভাষায় জবাব দেওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে; কেউ প্রতারণা করলে সে প্রতারণাকে নিজের চরিত্রের অংশ হতে দেয় না।

মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৩)

ধৈর্য মানে দুর্বলতা নয়; ধৈর্য হলো আবেগের তাড়নায় ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়ার শক্তি। এটি এমন এক মানসিক দৃঢ়তা, যা মানুষকে দুঃখের মধ্যেও সত্য, ন্যায় ও সংযমের পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।

তবে ধৈর্য ধারণের অর্থ এই নয় যে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। বরং ধৈর্যশীল মানুষ উত্তেজনার পরিবর্তে বিবেচনা, প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং হঠকারিতার পরিবর্তে প্রজ্ঞার পথ বেছে নেয়।

ব্ল্যাক হোলের রূপক ও মানুষের অন্তর্জগৎ

মহাবিশ্বের ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর এমন এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু, যার মহাকর্ষ এত প্রবল যে নির্দিষ্ট সীমার ভেতর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। এই বৈজ্ঞানিক ধারণাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝানো যায়।

ধরা যাক, একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নিলেন—তিনি অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াবেন না, কষ্টের জবাবে কষ্ট দেবেন না এবং নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে নিজের চরিত্র নষ্ট করার সুযোগ দেবেন না। অন্যের রূঢ় আচরণ তাঁর হৃদয়ে দুঃখ সৃষ্টি করলেও তিনি সেই দুঃখকে প্রতিহিংসায় রূপান্তরিত হতে দেবেন না। বরং আত্মসমালোচনা, ধৈর্য, প্রার্থনা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি নিজেকে সামলে নেবেন।

এই মানসিকতাকে রূপক অর্থে বলা যায়, তিনি যেন নেতিবাচকতার একটি নৈতিক কৃষ্ণগহ্বর—যেখানে অন্যের মন্দ আচরণ প্রবেশ করলেও তা তাঁর কাছ থেকে নতুন মন্দ আচরণ সৃষ্টি করে বেরিয়ে আসে না।

তবে রূপকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা রয়েছে। মানুষের মন কোনো কৃষ্ণগহ্বর নয়, যেখানে সব কষ্ট চিরতরে আটকে রাখা সম্ভব। দুঃখ, অপমান, হতাশা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ জমে থাকলে তা মানুষের সুস্থতা ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নেতিবাচকতার জবাবে নেতিবাচকতা না ছড়ানোর পাশাপাশি নিজের কষ্টকে সুস্থভাবে সামলানোও জরুরি।

ইসলাম মানুষকে পাথরের মতো অনুভূতিহীন হতে শেখায় না; বরং অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও ন্যায়, সংযম ও কল্যাণের পথে চলতে শেখায়। কষ্ট পাওয়া মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, কিন্তু সেই কষ্টের কারণে অন্যের প্রতি অন্যায় করা কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।

ক্ষমা মহত্ত্বের পরিচয়, তবে ন্যায়বিচারও অধিকার

ক্ষমা মানুষের চরিত্রকে মহিমান্বিত করে। কেউ ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, ব্যক্তিগত আঘাতের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করা এবং সম্পর্ক রক্ষার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া—এসব মহৎ গুণের অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ বলেন, “যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)

এই আয়াত রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমার মর্যাদা তুলে ধরে। তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ দূর করার একটি মহৎ উপায় হতে পারে, কিন্তু অপরাধের বিচার, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার প্রয়োজনকে তা অস্বীকার করে না।

কেউ যদি বারবার প্রতারণা করে, অপমান করে, শোষণ করে কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তবে তার আচরণ সম্পর্কে সতর্ক হওয়া, প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা এবং ন্যায়সংগত প্রতিকার চাওয়া দোষের নয়। বরং অন্যায় বন্ধ করার জন্য বিবেচনাপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া অনেক সময় নিজের ও অন্যের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।” (সুরা আশ-শূরা, আয়াত ৪০)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ন্যায়সংগত প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; পাশাপাশি ক্ষমা ও সংশোধনের পথও মহৎ। তাই কোথায় ক্ষমা করা কল্যাণকর, কোথায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন এবং কীভাবে অন্যায় বন্ধ করা যায়—তা পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার ও পরিণতি বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হবে।

আত্মসম্মান রক্ষা করাও দায়িত্ব

অন্যের ক্ষতি না করার সংকল্প যেমন মহৎ, তেমনি নিজেকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের প্রতি অবিচার করে অন্যের প্রতি সদাচার দেখানো দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে না।

অনেকে মনে করেন, প্রতিবাদ করলে সম্পর্ক নষ্ট হবে; নিজের কষ্টের কথা বললে মানুষ কষ্ট পাবে; কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাঁকে খারাপ ভাবা হবে। ফলে তাঁরা সবকিছু নীরবে সহ্য করেন। কিন্তু নীরবতা সব সময় সমাধান নয়। কখনো তা অন্যায়কারীর আচরণকে আরও উৎসাহিত করতে পারে এবং ভুক্তভোগীর কষ্ট বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাই প্রয়োজন হলে শান্তভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে হবে। বলতে হবে—কোন আচরণে কষ্ট পেয়েছি, কোন বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করি। তর্ক বাড়ানোর পরিবর্তে স্পষ্ট ও সম্মানজনক ভাষায় নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত।

ইসলাম মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেয়। অতএব, নিজের সম্মান রক্ষা করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষার জন্য ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নেওয়া মহত্ত্বের পরিপন্থী নয়। বরং আত্মসম্মান ও বিনয়কে পাশাপাশি ধারণ করাই পরিণত চরিত্রের পরিচয়।

কষ্টকে কল্যাণে রূপান্তরের উপায়

মানুষের জীবনে সব ঘটনা নিজের ইচ্ছামতো ঘটে না। কারও আচরণ, পরিস্থিতির প্রতিকূলতা কিংবা জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতার পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা অনেকাংশে নিজের বিবেচনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়।

প্রথমত, রাগের মুহূর্তে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। এতে ভুল কথা বলা কিংবা এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা কমে, যার জন্য পরে অনুশোচনা করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, নিজের কষ্টের কথা বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। ডায়েরিতে লেখা, সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করাও উপকারী হতে পারে।

তৃতীয়ত, দোয়া, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি খোঁজা যায়। মহান আল্লাহ বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সুরা আর-রা‘দ, আয়াত ২৮)

চতুর্থত, ঘটনার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কে বিশ্বাসযোগ্য, কোথায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কোন সিদ্ধান্তে ভুল হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে একই ধরনের ক্ষতি এড়ানো যায়—এসব বিষয় ভেবে দেখা আত্মোন্নয়নের অংশ।

পঞ্চমত, প্রতিটি মানুষের আচরণ নিজের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও নিজের নৈতিক অবস্থান নিজের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অন্যের অসদাচরণ যেন নিজের চরিত্রের মান নির্ধারণ না করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

এভাবেই মানুষ কষ্টকে অস্বীকার না করে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং নিজের ভেতরে আরও সংযত, বিচক্ষণ ও সহনশীল হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিশোধ নয়, সংশোধন ও কল্যাণের প্রত্যাশা

প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। যে মানুষ অন্যের দ্বারা কষ্ট পেয়েছে, সে যদি একইভাবে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে অন্যায়ের একটি নতুন চক্র তৈরি হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি অন্যায়ের জবাবে ন্যায়সংগত পথ বেছে নেয়, তাহলে সে অন্তত নিজের পক্ষ থেকে সেই চক্রকে এগিয়ে যেতে দেয় না।

একজন মহৎ মানুষ প্রতিটি বিরোধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করেন না; তিনি চেষ্টা করেন নিজের নীতি ও বিবেককে অক্ষুণ্ণ রাখতে। তিনি জানেন, সব মানুষের কাছে নিজের সততা প্রমাণ করা সম্ভব নয়, সব ভুল বোঝাবুঝি দূর করা সম্ভব নয় এবং সব সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। তবু তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেন, সত্যের পক্ষে থাকেন এবং অন্যের প্রতি অযথা বিদ্বেষ পোষণ না করার চেষ্টা করেন।

তবে সংশোধনের প্রত্যাশা মানে অন্যায়কারীর ওপর অন্ধভাবে আস্থা রাখা নয়। কেউ আন্তরিকভাবে ভুল স্বীকার করলে, ক্ষতি পূরণে উদ্যোগী হলে এবং আচরণ পরিবর্তনের প্রমাণ দিলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর যদি অন্যায় চলতেই থাকে, তবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ অনুসরণ করা উচিত।

এই জীবনদর্শনের উদ্দেশ্য কাউকে শত্রু বানানো নয়, আবার অন্যায়ের সামনে অসহায় হয়ে থাকাও নয়। উদ্দেশ্য হলো—নিজের অন্তরকে বিদ্বেষের ভার থেকে রক্ষা করা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ন্যায় ও কল্যাণের পথ অনুসরণ করা।

আল্লাহর ওপর ভরসা ও অন্তরের প্রশান্তি

মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে, যার পূর্ণ সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। কখনো মানুষ নিজের বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরেও অন্যের কাছে ভুল বোঝা হয়; কখনো আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত ফল আসে না। এসব পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা মানুষকে ধৈর্য ও আশাবাদ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

তাওয়াক্কুলের অর্থ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়। বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করা, সঠিক উপায় অবলম্বন করা, পরামর্শ নেওয়া, নিজের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই তাওয়াক্কুলের বাস্তব শিক্ষা।

একজন মুমিন অন্যের প্রতি জুলুম করেন না, নিজের ওপর জুলুমকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেন না। তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, কিন্তু সীমা অতিক্রম করেন না; ক্ষমা করেন, কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা অনুভব করেন না; কষ্ট পান, কিন্তু কষ্টকে নিজের চরিত্র ধ্বংসের কারণ হতে দেন না।

তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের বিচার সীমিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও ন্যায়বিচার সর্বব্যাপী। এই বিশ্বাস তাঁকে দায়িত্ব পালন, ধৈর্য ধারণ এবং কল্যাণের পথে অবিচল থাকার প্রেরণা দেয়।

উপসংহার

অন্যের ক্ষতি না করা এবং অন্যের দেওয়া কষ্টের জবাবে অন্যায় না করা—এ দুটি নীতি একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক জীবনের ভিত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে আত্মসম্মান, ন্যায়বিচার, বিবেচনাবোধ ও নিজের মানসিক সুস্থতার প্রতি দায়িত্বশীলতা।

মহৎ মানুষ তিনি নন, যিনি কখনো কষ্ট পান না; বরং তিনি, যিনি কষ্ট পেয়েও নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দেন না। তিনি অন্যের ভুলকে নিজের অন্যায়ের অজুহাত বানান না, আবার নিজের উদারতাকে অন্যের সীমাহীন অন্যায়ের সুযোগও হতে দেন না।

ব্ল্যাক হোলের রূপক আমাদের নেতিবাচকতাকে নিজের মধ্যে থামিয়ে দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য কষ্টকে চেপে রাখায় নয়, বরং তা প্রজ্ঞার সঙ্গে সামলে নিয়ে কল্যাণের পথে এগিয়ে চলায়। অন্যের অন্ধকার নিজের অন্তরে ছড়িয়ে না দিয়ে সত্য, ন্যায়, ক্ষমা ও সহমর্মিতার আলো জ্বালিয়ে রাখাই প্রকৃত সাফল্য।

আসুন, আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি—যাঁদের হাত থেকে অন্যেরা নিরাপদ থাকে, যাঁদের জিহ্বা কাউকে অকারণে আঘাত করে না, যাঁদের হৃদয়ে প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা জাগে এবং যাঁরা কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ খোঁজেন। মহান আল্লাহ আমাদের অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার, অন্যায়ের শিকার হলে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নেওয়ার এবং ক্ষমা ও সদাচরণের মাধ্যমে সুন্দর জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন