Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ

একুশ নিয়ে লেখা (একুশের চেতনা ও আমাদের মুক্তির আন্দোলন

একুশের চেতনা ও আমাদের মুক্তির আন্দোলন

“একুশের চেতনা” ও “বাংলাদেশের স্বাধীনতা”শব্দ দুটির অর্থবোধক মানে আলাদা হলেও একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক গভীর ভাবে জড়িত।  একটি ছাড়া অন্যটি আমরা ভাবতে পারি না, পারাও সম্ভব নয় । বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের ঊষালগ্নের পাক-ভারত উপমহাদেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চিয়তার ঝড় উঠে তার প্রথম প্রতিফলন ফুটে ওঠে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে । আর বাঙালির সেই প্রথম স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পাথেয় হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । ১৯৪০ সালে গৃহীত লাহোর প্রস্তাবে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিলো :- “That geographically contiguous unit are demarcated into regions which shall be so constituted, with such territorial re-adjustment as may be necessary; that the areas in which the Muslims are numerically in a majority as in the north-western and eastern zones on India should be grouped to constituent units shall be autonomous and sovereign.”

 

একুশ মানে চেতনা আমার/ মায়ের ভাষায় কথা বলা,/ একটা স্বাধীন দেশের জন্য/ সবাই মিলে যুদ্ধ করা ।”-কবির এ চেতনার ধারায় পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষারকথা বলার অধিকার আর একটি স্বাধীন-সার্বভেীম জাতির স্বীকৃতি । একুশের রক্তাক্ত সেই স্মৃতিময় দিনটিকে কেন্দ্র করেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ।

 

‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!/ তোমার কোলে, তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা।’ মাতৃভাষা, মা ও মাতৃভূমির মতোই আমাদের বড় প্রিয়- তাই এদের ওপর যখন আঘাত আসে, তখন আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাকে প্রতিহত করি। কারণ মাতৃভাষা নিঃশ্বাস-বায়ুর মতো আমাদের মানবিক সত্তার এক অপরিহার্য অংশ।

 

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার স্মৃতিকথা “হোম ইন দ্যা ওয়াল্ড” এ তার শ্রীলংকান বন্ধু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ লাল আর জয়বর্ধানে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন একদিন সকালে লাল তাঁকে খুব উদ্বেগের সঙ্গে এসে বললেন, গতকাল রাতে তিনি ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখেছেন যা শ্রীলংকার জনগনের কাজ থেকে অনেকদূর সরিয়ে দিয়েছে । লাল আর জয়বর্ধানে অমর্ত্য সেনকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কোন ভাষায় স্বপ্ন দেখো ? অমর্ত্য সেন প্রতিউত্তরে বলেন, অধিকাংশ সময় বাংলা ভাষায় । অমর্ত্য সেন বলেন তুমি তো বাংলা জানো না, বাংলায় স্বপ্ন দেখতে পারবা না । লাল তাঁর প্রতিউত্তরে বলেন, আমি কোন ভাষায় স্বপ্ন দেখবো সেই ব্যাপারে আমার কী কোনো নিয়ন্ত্রন আছে ? সত্যি, বাংলায় কথা বলা, জীবিকা নির্বাহ করা এবং স্বপ্ন দেখার জন্য মানুষ 1952 সালের 21 ফেব্রুয়ারি রক্ত দিয়েছিল ।

 

একুশ মানে প্রতিজ্ঞা, একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ আমাদের মুক্তির চেতনা। একুশের চেতনা আমাদের মনের চেতনা। সাহিত্যে একুশের চেতনা জাগ্রত হয়েছে সর্বাধিক। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টির সঙ্গে এ চেতনা মিশে আছে স্বাভাবিকভাবে। প্রগতিশীল লেখকগোষ্ঠী এ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই সাহিত্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। কথাসাহিত্য, নাটক, ছোটগল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, গান অর্থাৎ সাহিত্যের প্রতিটি ধারায় একুশের চেতনাকে তুলে ধরেছেন এ দেশের সচেতন লেখকসমাজ।

 

বাংলা ভাষা নিয়ে পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠীর টালবাহানার মূল বিষয় ছিল বাঙালীদের নতুন করে শেকলবন্দী । তৎকালীন বাঙালী শিল্পী-সাহিত্যিক-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠীর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মূখর হয়ে উঠে । উর্দুকে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি যে কতোটা হাস্যকর ছিল তা প্রমান করতে বেগ পেতে হয়নি । খুব সহজে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার পক্ষে তারা জোরালো যুক্তি হাজির করে । সকল শ্রেণি পেশা মানুষের কাছে এ যুক্তি গ্রহনযোগ্যতা পায় । 1952 সালের 21 ফেব্রুয়ারি ভাষার প্রশ্নটি বাঙালি ফয়সালা করে ফেলে । এ আন্দোলন ভাষার প্রশ্নে হলেও গভীরে ছিল স্বরাজের রুপকল্প । বাঙালির মুক্তির বীজমন্ত্র বাংলা ভাষার অন্তঃপ্রাণজুড়ে । ভাষা যখন বন্ধ হয়েছে বাঙালি তখন পিছিয়ে পড়েছে । আর ভাষা যখন ভিন্ন অভিব্যক্তি নিয়ে দাড়িয়েছে তখন তার মুক্তির দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে । শোষক, শাসক, নিপীড়কদের উচ্ছেদ করার মূল চালিকা শক্তি বাংলা ভাষার প্রাণজুড়ে । ভাষার অভ্যস্ততায় ও মিথোস্ক্রিয়ায় সেই পথের নিশানা মিলেছে । ভাষার উজ্জ্বীবিত শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে বাঙালির মুক্তির সনদে । 

মন্তব্য করুন