সহকারী শিক্ষক
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৪৭ অপরাহ্ণ
অর্থনীতিতে নোবেল': একটি বহুল প্রচলিত বিভ্রান্তি ও এর আসল ইতিহাস Robiul Rana
'
আমরা সচরাচর যাকে "অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার" বলি, তার দাপ্তরিক নাম হলো:
"Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel" (আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে স্বেরিগেস রিকসব্যাংক অর্থনীতিতে স্মারক পুরস্কার)।
১. এটি কেন মূল নোবেল পুরস্কার নয়?
উইলে উল্লেখ না থাকা: ১৮৯৫ সালে আলফ্রেড নোবেল যখন তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কারের তহবিল ও ক্ষেত্রগুলো (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও শান্তি) নির্ধারণ করে যান, তখন তাতে অর্থনীতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
অর্থায়নের ভিন্নতা: মূল নোবেল পুরস্কারগুলোর অর্থ দেওয়া হয় আলফ্রেড নোবেলের গঠিত নোবেল ফাউন্ডেশনের মূল ফান্ড থেকে। কিন্তু অর্থনীতির এই পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ ও পরিচালনা ব্যয় যোগান দেয় সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—Sveriges Riksbank।
নামকরণের শর্ত: ১৯৬৮ সালে ব্যাংকের ৩০০ বছর পূর্তিতে এই পুরস্কার প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৬৯ সাল থেকে তা প্রদান শুরু হয়। আলফ্রেড নোবেলের পরিবারের শেষ জীবিত বংশধরদের একজন, মার্তা নোবেল-ওলেইনিকফ (Marta Nobel-Oleinikoff) যখন এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন, তখন কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে—এটিকে কোনোভাবেই "নোবেল পুরস্কার" বলা যাবে না, বলতে হবে "আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে ব্যাংক পুরস্কার"।
২. ব্যাকগ্রাউন্ড: এই পুরস্কার তৈরির পেছনের আসল লড়াই
পুরস্কারটির সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছিল সুইডেন সরকার এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার লড়াই:
সুদের হার ও ব্যাংকের স্বাধীনতা: বিশ্বের প্রাচীনতম কেন্দ্রীয় ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও 'স্বেরিগেস রিকসব্যাংক'-এর কোনো নীতিগত স্বাধীনতা ছিল না। সামাজিক-গণতন্ত্রী সুইডিশ সরকার নিজেদের পছন্দমতো সুদের হার সবসময় কম রাখতে বাধ্য করত।
'ইন্টারেস্ট রেট রেভল্যুশন' (১৯৫৭): ব্যাংকের গভর্নর পার অ্যাসব্রিঙ্ক (Per Åsbrink) ১৯৫৭ সালে সরকারের অনুমতি ছাড়াই একতরফাভাবে দেশের সুদের হার বাড়িয়ে দেন। এতে সরকারের সাথে ব্যাংকের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।
জনসমর্থন ও কৌশলগত পদক্ষেপ: এই বিরোধের জের ধরে ব্যাংকের আয়ের ওপর সরকার নজর দেয়। গভর্নর পার অ্যাসব্রিঙ্ক তখন কৌশল নেন—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিবিদদের জন্য একটি বড় স্মারক পুরস্কার চালু করার। তার উদ্দেশ্য ছিল:
১. কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক গবেষণা ও নীতি প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরা।
২. জনসমর্থন তৈরি করে সরকারের রাজকীয় চাপ সামলানো।
৩. অনুমোদন ও নোবেল সম্মাননার ছোঁয়া
গভর্নর পার অ্যাসব্রিঙ্কের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে অনুমোদন নেওয়া হয়:
সুইডেনের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টাগণ।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস (যারা পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের নোবেল নির্বাচন করে)।
নোবেল ফাউন্ডেশন এবং নোবেল পরিবার (কঠোর শর্তসাপেক্ষে)।
যদিও এটি মূল নোবেল নয়, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া (রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস দ্বারা পরিচালিত) এবং ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে অন্যান্য নোবেল বিজয়ীদের সাথেই এই পুরস্কার তুলে দেওয়ার কারণে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের স্থান লাভ করেছে।
তথ্যসূত্র (Sources)
১. The Nobel Prize Official Website:
Nobel Prize in Economic Sciences Overview - নোবেল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট উল্লেখ আছে: "The Prize in Economic Sciences is not a Nobel Prize."
২. The Sveriges Riksbank Official Archives:
Offerdal, C. (2018). The History of the Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel. Sveriges Riksbank.
৩. Academic & Historical Papers:
Offerdal, C. (2014). How the Code Was Cracked: The Creation of the Prize in Economic Sciences. Scandinavian Economic History Review. (গভর্নর পার অ্যাসব্রিঙ্ক এবং সুইডিশ সরকারের বিরোধ নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ)।
৪. Nobel Family Stance:
Peter Nobel (আলফ্রেড নোবেলের প্রপৌত্র/উত্তরাধিকারীদের মুখপাত্র): Statements on the distinction between Nobel Prizes and the Bank Prize (বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টির বিভ্রান্তি দূর করার জন্য কথা বলেছেন)।
১
০ মন্তব্য