Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

অনলাইন পাঠদানের প্রয়োজনীয় টুল: গুগল মিট, জুম ও অন্যান্য, যা অনেকেই জানেন না

করোনাকালে আমরা অনেকেই বাধ্য হয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শিখেছিলাম। সে সময় শুধু ভিডিও কলে ক্লাস নেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু অনলাইন টুলগুলোর এমন অনেক সুবিধা আছে, যা আমাদের অনেকেরই অজানা রয়ে গেছে। আজও এসব টুল শুধু দুর্যোগকালীন বিকল্প নয়। অতিরিক্ত ক্লাস, পরীক্ষার আগে বিশেষ সহায়তা, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পাঠ পৌঁছে দেওয়া, অভিভাবক সভা বা সহকর্মীদের সাথে সভা, সব ক্ষেত্রেই এগুলো কাজে লাগে। এই লেখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি অনলাইন টুলের পরিচিতি এবং সেগুলোর কম-জানা কিন্তু কার্যকর কিছু সুবিধা তুলে ধরা হলো।

উল্লেখ্য, বিনামূল্যের সংস্করণের সময়সীমা ও সুবিধাগুলো প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মাঝে পরিবর্তন করে। তাই ব্যবহারের আগে সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।

১. গুগল মিট (Google Meet)

একটি জিমেইল অ্যাকাউন্ট থাকলেই গুগল মিট ব্যবহার করা যায়, আলাদা কোনো সফটওয়্যার লাগে না। ব্রাউজার বা মোবাইল অ্যাপ থেকে সরাসরি যোগ দেওয়া যায়। বিনামূল্যের সংস্করণে তিন বা তার বেশি জনের সভা সাধারণত সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট চলে।

যে সুবিধাগুলো অনেকেই জানেন না:

  • লাইভ ক্যাপশন: শিক্ষকের কথা পর্দায় লেখা আকারে দেখা যায়। এতে দুর্বল ইন্টারনেট বা শব্দের সমস্যায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে না।
  • গুগল ক্যালেন্ডারে আগাম সময়সূচি: ক্লাসের লিংক আগেই তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পাঠিয়ে রাখা যায়। প্রতি সপ্তাহে একই লিংক ব্যবহার করা যায়।
  • স্ক্রিন শেয়ার: নিজের মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দা দেখিয়ে পড়ানো যায়। আইসিটির মতো বিষয়ে সফটওয়্যার ব্যবহার শেখাতে এটা খুবই কার্যকর।

২. জুম (Zoom)

অনলাইন সভার জন্য জুম সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি। বিনামূল্যের সংস্করণে একটি সভা সাধারণত ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলে। বড় ক্লাস হলে দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়।

যে সুবিধাগুলো অনেকেই জানেন না:

  • ব্রেকআউট রুম: ক্লাসের শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে আলাদা কক্ষে পাঠানো যায়। শিক্ষক এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে গিয়ে দলগত কাজ তদারকি করতে পারেন। নতুন শিক্ষাক্রমের দলগত কাজের জন্য এটি বিশেষ উপযোগী।
  • হোয়াইটবোর্ড: পর্দায় সরাসরি লেখা, আঁকা বা চিত্র বোঝানো যায়।
  • রেকর্ডিং: ক্লাস রেকর্ড করে রাখা যায়, যা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পরে দেওয়া যায়।
  • ওয়েটিং রুম: অপরিচিত কেউ যেন ক্লাসে ঢুকে বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য শিক্ষক অনুমতি দিলে তবেই শিক্ষার্থী প্রবেশ করতে পারে।

৩. গুগল ক্লাসরুম (Google Classroom)

ভিডিও কল যদি অনলাইন ক্লাসরুম হয়, তাহলে গুগল ক্লাসরুম হলো অনলাইন খাতা ও নোটিশ বোর্ড। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়।

এর মাধ্যমে শিক্ষক নোট, পিডিএফ ও ভিডিও শেয়ার করতে পারেন, অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা নিতে পারেন, খাতা দেখে নম্বর ও মন্তব্য দিতে পারেন, এবং ঘোষণা পাঠাতে পারেন। গুগল মিটের লিংকও এখানে যুক্ত করে রাখা যায়। ফলে প্রতিবার আলাদা করে লিংক পাঠানোর দরকার হয় না।

৪. গুগল ফর্মস (Google Forms)

অনলাইনে কুইজ বা পরীক্ষা নেওয়ার সহজ টুল এটি। বহুনির্বাচনী প্রশ্ন তৈরি করে সঠিক উত্তর নির্ধারণ করে দিলে শিক্ষার্থী জমা দেওয়ার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বর দেখা যায়। কোন প্রশ্নে বেশি শিক্ষার্থী ভুল করেছে, তার বিশ্লেষণও পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায় কোন বিষয়টি আবার পড়ানো দরকার। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মতামত সংগ্রহ বা ভর্তি-তথ্য সংগ্রহেও এটি ব্যবহার করা যায়।

৫. মাইক্রোসফট টিমস (Microsoft Teams)

যেসব প্রতিষ্ঠানে মাইক্রোসফটের অফিস সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়, সেখানে টিমস একটি ভালো বিকল্প। ভিডিও ক্লাস, চ্যাট, ফাইল শেয়ার ও অ্যাসাইনমেন্ট, সব এক জায়গায় পাওয়া যায়।

৬. হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপ

বড় প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত টুল হতে পারে শ্রেণিভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার গ্রুপ। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এগুলো আগে থেকেই ব্যবহার করেন। নোটিশ, বাড়ির কাজ, ছোট ভিডিও বা ভয়েস মেসেজে ব্যাখ্যা পাঠাতে এগুলো খুব কার্যকর। দুর্বল ইন্টারনেটেও চলে। তবে গ্রুপের নিয়ম আগেই ঠিক করে দেওয়া উচিত, যেমন শুধু পড়াশোনা সংক্রান্ত আলোচনা হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর বার্তা পাঠানো যাবে না।

৭. ইউটিউব

নিজের পাঠের ছোট ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করে রাখলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো সময়, যতবার খুশি দেখতে পারে। ভিডিওকে "আনলিস্টেড" করে রাখলে শুধু যাদের কাছে লিংক আছে তারাই দেখতে পারবে। সাধারণ মানুষ খুঁজে পাবে না।

৮. দেশীয় প্ল্যাটফর্ম: শিক্ষক বাতায়ন ও মুক্তপাঠ

আমাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মগুলোর কথাও ভুলে গেলে চলবে না। শিক্ষক বাতায়নে সারা দেশের শিক্ষকদের তৈরি হাজার হাজার কনটেন্ট রয়েছে, যা ক্লাসে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। আর মুক্তপাঠ প্ল্যাটফর্মে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য বিনামূল্যে বিভিন্ন অনলাইন কোর্স রয়েছে।

দুর্বল ইন্টারনেটে অনলাইন ক্লাস: কিছু কার্যকর কৌশল

আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় বাধা দুর্বল ইন্টারনেট ও ডেটার খরচ। কয়েকটি কৌশল এ সমস্যা কিছুটা কমাতে পারে।

শিক্ষার্থীদের ক্যামেরা বন্ধ রাখতে বলুন। এতে ডেটা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং সংযোগ স্থিতিশীল থাকে। যে শিক্ষার্থী কথা বলছে না, সে মাইক্রোফোন বন্ধ রাখবে। ক্লাস ৩০–৪০ মিনিটের মধ্যে সীমিত রাখুন। দীর্ঘ ক্লাসে মনোযোগ ও ডেটা দুটোই কমে যায়। ক্লাসের পর মূল বিষয়গুলোর সারসংক্ষেপ লিখিত আকারে বা ছোট ভয়েস মেসেজে পাঠিয়ে দিন, যাতে যারা সংযোগ সমস্যায় পিছিয়ে পড়েছে তারাও পাঠ পায়। আর সম্ভব হলে ক্লাসের সময় এমনভাবে ঠিক করুন, যখন নেটওয়ার্ক তুলনামূলক ভালো থাকে।

অনলাইন নিরাপত্তা ও শিষ্টাচার

অনলাইন ক্লাসের লিংক জনসমক্ষে, যেমন ফেসবুকের পাবলিক পোস্টে, শেয়ার করবেন না। সম্ভব হলে পাসওয়ার্ড বা ওয়েটিং রুম চালু রাখুন। ক্লাস রেকর্ড করার আগে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দিন। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি গ্রুপে শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। আর অনলাইনেও শ্রেণিকক্ষের মতো আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শুরুতেই নির্দেশনা দিন।

উপসংহার

অনলাইন টুল কখনোই সরাসরি শ্রেণিকক্ষের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। একটি ভালো পরিকল্পনা হতে পারে: শ্রেণিকক্ষে মূল পাঠ, গুগল ক্লাসরুম বা গ্রুপে উপকরণ ও বাড়ির কাজ, গুগল ফর্মসে নিয়মিত ছোট কুইজ, আর প্রয়োজনে গুগল মিট বা জুমে অতিরিক্ত ক্লাস। প্রযুক্তির এই মিশ্র ব্যবহার আমাদের পাঠদানকে আরও কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলতে পারে।

আপনি অনলাইন পাঠদানে কোন টুল ব্যবহার করেন এবং কী অভিজ্ঞতা হয়েছে, মন্তব্যে জানালে সহকর্মীরা উপকৃত হবেন।

মোছাঃ তাছলিমা জাহান লাকী
প্রভাষক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
সুফিয়া মতিন মহিলা কলেজ, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ

মন্তব্য করুন

ব্লগ