প্রভাষক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৪৬ অপরাহ্ণ
কীভাবে একজন শিক্ষক গুণী হয়ে ওঠেন: শিক্ষকতার দর্শন ও অনুশীলন
গুণী শিক্ষক জানেন, শিক্ষার্থীর মাথায় জ্ঞান ঢেলে দেওয়া যায় না। তাকে এমন পরিবেশ দিতে হয় যেখানে সে নিজেই জ্ঞান নির্মাণের অংশীদার হতে পারে। তৃতীয় দৃশ্যটি একটি বড় শ্রেণিকক্ষের। প্রায় সত্তরজন শিক্ষার্থী। সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক। প্রযুক্তির কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। স্মার্ট বোর্ড নেই, পর্যাপ্ত উপকরণও নেই। একজন শিক্ষক হয়তো এই সীমাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে প্রচলিত বক্তৃতায় ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু গুণী শিক্ষক সীমাবদ্ধতাকে পেডাগজিক্যাল কৌশলে রূপান্তর করেন।
একজন শিক্ষক প্রতিদিন কতজন শিক্ষার্থীকে পড়ান, তার হিসাব রাখা যায়। কতজন পাস করল, কতজন জিপিএ-৫ পেল, সেটিও মাপা যায়; কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর কোনো ফলাফলপত্র দেয় না: কতজন শিক্ষার্থী তার কারণে বদলে গেল? একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বললেন, ‘ভুল উত্তর দিলে ভয় পেয়ো না।’ একটি নীরব শিক্ষার্থী প্রথমবার হাত তুলল। তার উত্তর ভুল হলো। শিক্ষক হাসলেন, “ভুল হয়েছে, এবার বলো তো, কেন এমন ভেবেছ?” সেদিন হয়তো পরীক্ষার নম্বর বাড়েনি, কিন্তু একটি শিশুর ভয় কমেছিল, কৌতূহল বেড়েছিল, আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল। এখানেই শিক্ষকতা পেশা ছাড়িয়ে প্রভাব হয়ে ওঠে। আর এই প্রভাবের গভীরতাতেই লুকিয়ে থাকে গুণী শিক্ষকতার প্রকৃত পরিচয়।
একজন শিক্ষক প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। কেউ তার আগমনে বই খুলে, কেউ খাতা খোলে, কেউ চোখ নামিয়ে রাখে, কেউ আবার মনে মনে অপেক্ষা করে কখন ঘণ্টা বাজবে; কিন্তু একই শ্রেণিকক্ষে এমন একজন শিক্ষকও আসেন, যার প্রবেশে শুধু বই খোলে না, মনও খুলে যায়। তার একটি প্রশ্ন শিক্ষার্থীকে ভাবায়, একটি মন্তব্য আত্মবিশ্বাস জাগায়, একটি ভুলকে তিনি ব্যর্থতা না বানিয়ে শেখার সিঁড়িতে পরিণত করেন। বছর শেষে তার শিক্ষার্থীরা হয়তো সব সূত্র, সংজ্ঞা কিংবা তারিখ মনে রাখতে পারে না, কিন্তু তাকে মনে রাখে। কেন? কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেননি, শিক্ষার্থীর ভেতরের মানুষটিকে স্পর্শ করেছিলেন। এখানেই গুণী শিক্ষকতার সূচনা। প্রশ্ন হলো, কখন একজন শিক্ষক সত্যিকার অর্থে গুণী হয়ে ওঠেন? দীর্ঘ চাকরির অভিজ্ঞতায়? ভালো পরীক্ষার ফলাফলে? অগণিত প্রশিক্ষণ সনদে? প্রযুক্তির চমকপ্রদ ব্যবহারে? নাকি এমন এক মানবিক ও পেশাগত সক্ষমতায়, যার প্রভাবে শিক্ষার্থী শুধু কিছু জানে না, বরং নতুন করে দেখতে, ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজেকে নির্মাণ করতে শেখে? প্রকৃতপক্ষে গুণী শিক্ষক কোনো পদবি নন, কোনো পুরস্কারও নন। এটি একটি অর্জিত পেশাগত চরিত্র।
Md. Rafiqul Islam Talukder
একজন শিক্ষক তখনই গুণী হয়ে ওঠেন, যখন তার বিষয়জ্ঞান শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে, তার নৈতিকতা শিক্ষার্থীর আচরণে প্রতিফলিত হয়, তার পেডাগজি শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করে এবং তার মানবিকতা শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদাকে নিরাপদ রাখে। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো পাঠ ভালোভাবে শেষ করেন; কিন্তু একজন গুণী শিক্ষক পাঠ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীর মনে একটি প্রশ্ন রেখে যান। সেই প্রশ্নই পরবর্তী শিক্ষার দরজা খুলে দেয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই পার্থক্যটি অনুধাবন করা এখন জরুরি। কারণ শিক্ষকতা কেবল একটি নির্ধারিত সিলেবাস সম্পন্ন করার পেশা নয়, এটি মানুষের সম্ভাবনা আবিষ্কার ও বিকাশের এক গভীর নৈতিক দায়িত্ব। প্রথম দৃশ্যটি কল্পনা করা যাক একটি সাধারণ সরকারি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। পেছনের বেঞ্চে বসা একটি ছেলে গণিতে বারবার ভুল করছে। শিক্ষক খাতা দেখে বিরক্ত হয়ে বলতে পারতেন, “তুমি তো কিছুই পারো না।” এমন একটি বাক্য শিশুটির কাছে হয়তো শুধু একটি মন্তব্য নয়, নিজের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক পরিচয় হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু শিক্ষক খাতাটি বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এই উত্তরটি কীভাবে পেয়েছ?” ছেলেটি ধীরে ধীরে তার চিন্তার ধাপ ব্যাখ্যা করল। শিক্ষক বুঝলেন, সে যোগ বিয়োগ জানে, কিন্তু সমস্যাটি পড়ার ভাষা বুঝতে পারছে না। শিক্ষক পদ্ধতি পরিবর্তন করলেন। বাস্তব বাজারের হিসাব দিয়ে সমস্যাটি বোঝালেন। কয়েকদিন পর ছেলেটি একই ধরনের সমস্যার উত্তর নিজে করতে পারল। এখানে শিক্ষক শুধু একটি অঙ্ক শেখাননি, তিনি একটি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন করেছেন। এই পার্থক্যই গুণী শিক্ষকতার প্রকৃত পরিচয়।
গুণী শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুলের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেন না, বরং ভুলের ভেতর থেকে শেখার পথ খুঁজে বের করেন। দ্বিতীয় দৃশ্যটি আরও পরিচিত। একটি কলেজের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক জলবায়ু পরিবর্তন পড়াচ্ছেন। তিনি চাইলে বইয়ের সংজ্ঞা লিখিয়ে বলতে পারতেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো মুখস্থ করো।” কিন্তু তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “গত দশ বছরে তোমাদের এলাকার গরম কি একই রকম আছে?” শিক্ষার্থীরা কথা বলা শুরু করল। কেউ বলল, আগে শীত বেশি অনুভূত হতো। কেউ বলল, বৃষ্টির সময় বদলে গেছে। কেউ বলল, তাদের গ্রামের পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক এবার বললেন, “তাহলে বইয়ের জলবায়ু পরিবর্তন আর তোমাদের জীবনের জলবায়ু পরিবর্তন কি একই বিষয়?” শ্রেণিকক্ষ মুহূর্তেই একটি অনুসন্ধানী গবেষণাগারে পরিণত হলো। শিক্ষার্থীরা স্থানীয় তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করল। কেউ তাপমাত্রার তথ্য খুঁজবে, কেউ বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন দেখবে, কেউ কৃষকের সঙ্গে কথা বলবে। এ শিক্ষক তথ্য পরিবেশন করেননি, তথ্য অনুসন্ধানের সক্ষমতা তৈরি করেছেন। এটাই গুণী শিক্ষকতার আরেকটি স্তম্ভ।
গুণী শিক্ষক জানেন, শিক্ষার্থীর মাথায় জ্ঞান ঢেলে দেওয়া যায় না। তাকে এমন পরিবেশ দিতে হয় যেখানে সে নিজেই জ্ঞান নির্মাণের অংশীদার হতে পারে। তৃতীয় দৃশ্যটি একটি বড় শ্রেণিকক্ষের। প্রায় সত্তরজন শিক্ষার্থী। সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক। প্রযুক্তির কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। স্মার্ট বোর্ড নেই, পর্যাপ্ত উপকরণও নেই। একজন শিক্ষক হয়তো এই সীমাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে প্রচলিত বক্তৃতায় ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু গুণী শিক্ষক সীমাবদ্ধতাকে পেডাগজিক্যাল কৌশলে রূপান্তর করেন। তিনি বোর্ডে একটি প্রশ্ন লিখলেন, “একটি শহরে যদি হঠাৎ এক সপ্তাহ পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারা এবং কেন?” শিক্ষার্থীদের চারজনের দলে ভাগ করলেন। কেউ স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবল, কেউ অর্থনীতি নিয়ে, কেউ দরিদ্র মানুষের সমস্যা নিয়ে, কেউ পরিবেশ নিয়ে। পনেরো মিনিট পর শ্রেণিকক্ষে একাধিক ব্যাখ্যা। শিক্ষক কোনো একটি উত্তরকে চূড়ান্ত ঘোষণা করলেন না। তিনি বললেন, “তোমাদের যুক্তির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে শক্তিশালী? কী প্রমাণ দিয়ে তা সমর্থন করবে?” কোনো ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ছাড়াই সেখানে বিশ্লেষণ, যুক্তি, সহযোগিতা, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন হয়ে গেল। এখানেই প্রমাণিত হয়, গুণী শিক্ষকতার জন্য সবসময় ব্যয়বহুল উপকরণ প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শিক্ষণ সম্পর্কে সঠিক বিচারবোধ। বাংলাদেশের মতো সম্পদ সীমিত ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থায় এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ দৃশ্যটি হয়তো সবচেয়ে মানবিক। একজন ছাত্রী কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লাসে চুপচাপ। পরীক্ষার ফলও খারাপ হচ্ছে। শিক্ষক চাইলে বলতে পারতেন, “তুমি পড়াশোনায় মন দিচ্ছ না।” কিন্তু গুণী শিক্ষক তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন। একদিন ক্লাস শেষে বললেন, “তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?” ছাত্রী ধীরে ধীরে জানাল, পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারে নানা দায়িত্ব তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। শিক্ষক তার সমস্যার সব সমাধান করতে পারলেন না, কিন্তু তাকে বিচার না করে শুনলেন। পড়াশোনার জন্য ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন। কয়েক সপ্তাহ পর ছাত্রীটি আবার অংশ নিতে শুরু করল। এখানে শিক্ষক কোনো অধ্যায় শেখাননি। তিনি একজন শিক্ষার্থীকে অনুভব করিয়েছেন যে তার কথা শোনার মতো একজন মানুষ আছে। গুণী শিক্ষকতার এই মানবিক মাত্রাটি কোনো পরীক্ষার নম্বরে মাপা যায় না, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাহলে গুণী শিক্ষকতার মূল দর্শন কী? প্রথমত, শিক্ষক নিজেকে জ্ঞানের একমাত্র মালিক হিসেবে দেখবেন না। তিনি হবেন জ্ঞান অনুসন্ধানের সহযাত্রী।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীকে নিছক পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখবেন না। তাকে সম্ভাবনাময় মানুষ হিসেবে দেখবেন। তৃতীয়ত, শিক্ষকতা হবে প্রতিফলনশীল। অর্থাৎ শিক্ষক প্রতিটি পাঠের পরে নিজেকে প্রশ্ন করবেন, আমি কী পড়ালাম তার পাশাপাশি আমার শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিখল? কারা অংশ নিল? কারা পিছিয়ে থাকল? কোন প্রশ্ন তাদের ভাবিয়েছে? কোন জায়গায় আমার পদ্ধতি কাজ করেনি? এই আত্মজিজ্ঞাসা একজন শিক্ষককে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী ব্যক্তি থেকে অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণকারী পেশাজীবীতে পরিণত করে। চতুর্থত, গুণী শিক্ষক শিক্ষার্থীর কণ্ঠকে গুরুত্ব দেন। কারণ শ্রেণিকক্ষের নীরবতা সবসময় শেখার লক্ষণ নয়। অনেক সময় নীরবতা ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাবের সংকেত। গুণী শিক্ষক সেই নীরবতাও পড়তে পারেন। পঞ্চমত, তিনি শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্যকে সম্মান করেন। সবাই একই গতিতে শিখবে না, একইভাবে চিন্তা করবে না এবং একই ধরনের প্রতিভা প্রদর্শন করবে না। একজন শিক্ষক যদি কেবল দ্রুত শেখা শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে ক্লাস পরিচালনা করেন, তবে তিনি হয়তো শ্রেণির একটি অংশকে এগিয়ে নেবেন, কিন্তু বাকিদের অদৃশ্য করে ফেলবেন। গুণী শিক্ষক বরং প্রশ্ন করেন, “যে শিক্ষার্থী এখনো শিখতে পারছে না, তার শেখার দরজাটি কোথায়?” বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় এই প্রশ্ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমাদের শ্রেণিকক্ষে আর্থসামাজিক অবস্থা, ভাষাগত দক্ষতা, পারিবারিক সহায়তা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং পূর্ববর্তী শেখার অভিজ্ঞতায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ফলে একই পাঠ, একই সময় এবং একই পদ্ধতিতে সবার শেখা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গুণী শিক্ষক এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে নয়, শিক্ষণ পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।
গুণী শিক্ষকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিকতা। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের সততার কথা বলেন কিন্তু নিজে দায়িত্বে অবহেলা করেন, তবে তার বক্তৃতা মূল্যহীন হয়ে যায়। শিক্ষক যদি শৃঙ্খলার কথা বলেন কিন্তু শিক্ষার্থীর মতামতকে অপমান করেন, তবে শৃঙ্খলা ভয়ভিত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। শিক্ষক যদি মানবিকতার কথা বলেন কিন্তু দুর্বল শিক্ষার্থীকে অবজ্ঞা করেন, তবে মূল্যবোধের শিক্ষা কেবল মুখের শব্দ হয়ে থাকে। তাই গুণী শিক্ষক নিজের আচরণকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ হিসেবে বিবেচনা করেন। তার সময়নিষ্ঠা একটি শিক্ষা, তার ন্যায়পরায়ণতা একটি শিক্ষা, তার ক্ষমা চাওয়ার সক্ষমতা একটি শিক্ষা, তার নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসও একটি শিক্ষা। শিক্ষকতা তাই কেবল জ্ঞানীয় বিকাশ নয়, চরিত্র উন্নতকরণএর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় গুণী শিক্ষকতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা। পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ফলাফলকে যদি শিক্ষার একমাত্র আয়না বানানো হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর কৌতূহল, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা, নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা আড়ালে পড়ে যায়।
একজন গুণী শিক্ষক পরীক্ষার প্রস্তুতিকে অস্বীকার করবেন না; কিন্তু পরীক্ষাকে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্যও বানাবেন না। তিনি পরীক্ষার জ্ঞানকে জীবনের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করবেন। তিনি শিক্ষার্থীকে শুধু “সঠিক উত্তর” নয়, “কেন এটি সঠিক” এবং “এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি” এই প্রশ্নও করতে শেখাবেন। এ কারণেই গুণী শিক্ষকতার সঙ্গে অনুসন্ধান ভিত্তিক শিখন, সক্রিয় শিখন, সহযোগিতামুলক শিখন, একীভূত শিখন এবং প্রতিফলনমূলক অনুশীলন এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। গুণী শিক্ষক হতে হলে প্রতিদিন অসাধারণ কিছু করতেই হবে এমন নয়। বরং অসাধারণ শিক্ষকতা অনেক সময় সাধারণ কাজের অসাধারণ প্রয়োগ। প্রতিদিন একটি ভালো প্রশ্ন করা, একজন নীরব শিক্ষার্থীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, ভুল উত্তরকে অপমান না করা, স্থানীয় বাস্তবতা দিয়ে পাঠ বোঝানো, শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া, নিজের ক্লাস নিয়ে কয়েক মিনিট চিন্তা করা এবং একটি নতুন কৌশল পরীক্ষা করা। এসব ছোট অনুশীলন দীর্ঘ সময়ে শিক্ষকতার চরিত্র বদলে দিতে পারে। গুণী শিক্ষক প্রযুক্তির বিরোধী নন, আবার প্রযুক্তির মোহেও আবদ্ধ নন। তিনি জানেন, স্মার্ট বোর্ড শ্রেণিকক্ষকে স্মার্ট করে না। একটি স্মার্ট প্রশ্ন কখনো কখনো একটি বড় প্রযুক্তির চেয়েও শক্তিশালী। একটি পুরোনো কাগজ, একটি প্লাস্টিকের বোতল, একটি সংবাদপত্র, একটি স্থানীয় মানচিত্র, বাজারের একটি হিসাব কিংবা শিক্ষার্থীর নিজের জীবনের ঘটনা দিয়েও অসাধারণ শেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করা যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্প ব্যয়ের উপকরণ দিয়ে উচ্চমাত্রার চিন্তন তৈরি করার এই দক্ষতা বিশেষভাবে মূল্যবান। গুণী শিক্ষক তাই সম্পদের অপেক্ষা করেন না, সুযোগ সৃষ্টি করেন। তিনি সমস্যার তালিকা তৈরি করে থেমে থাকেন না, সম্ভাবনার জানালা খোঁজেন। এখানেই তার পেশাগত সৃজনশীলতা। শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেলেন, কত ঘণ্টা প্রশিক্ষণ হলো কিংবা কতটি সনদ বিতরণ করা হলো, তা দিয়ে শিক্ষকতার উৎকর্ষ নির্ধারণ করা যায় না। প্রশিক্ষণের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তার প্রভাব শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান হয়। একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণে সক্রিয় শিখন শিখলেন, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে ফিরে আবার দীর্ঘ বক্তৃতায় ফিরে গেলেন, তাহলে প্রশিক্ষণ কাগজে রয়ে গেল। তিনি যদি একটি নতুন কৌশল প্রয়োগ করেন, ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেন, শিক্ষার্থীর প্রতিক্রিয়া নেন এবং পরবর্তী ক্লাসে পরিবর্তন আনেন, তখনই প্রশিক্ষণ পেশাগত শিক্ষণে রূপান্তরিত হয়। তাই শিক্ষক উন্নয়নকে প্রশিক্ষণ থেকে অনুশীলন , অনুশীলন থেকে প্রতিফলন এবং প্রতিফলন থেকে উন্নয়ন এর ধারায় নিয়ে যেতে হবে। গুণী শিক্ষক কখনো নিজের শ্রেষ্ঠত্বের গল্পে আটকে থাকেন না। তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাও দেখতে পারেন। তিনি সহকর্মীর কাছ থেকে ফিডব্যাক নিতে পারেন। তিনি শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও শিখতে পারেন। তিনি বলতে পারেন, “আমি জানি না, আমরা একসঙ্গে খুঁজে দেখি।” এই বাক্য একজন শিক্ষকের মর্যাদা কমায় না; বরং তাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। কারণ সত্যিকার পেশাদারিত্ব সবকিছু জানার অভিনয়ে নয়, শেখার সাহসে। শেষ পর্যন্ত গুণী শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন কোনো সনদ, পদোন্নতি কিংবা পুরস্কার দিয়ে সম্ভব নয়। তার মূল্যায়ন হয় শিক্ষার্থীর জীবনে।
বহু বছর পর কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী যদি মনে করে, “আমার শিক্ষক আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন,” তবে সেটিই শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কেউ যদি বলে, “তিনি আমাকে মুখস্থ উত্তর দেননি, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন,” তবে সেটিই তার পেশাগত উত্তরাধিকার। কেউ যদি বলে, “আমি ভুল করলে তিনি আমাকে ছোট করেননি,” তবে সেটিই তার মানবিক সাফল্য। একজন শিক্ষক অবসরে যান, কিন্তু তার প্রভাব অবসর নেয় না। তার বলা একটি বাক্য, তার দেখানো একটি আচরণ, তার দেওয়া একটি সুযোগ কোনো শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্তে, পেশায়, পরিবারে কিংবা সমাজে বহু বছর পরে ফিরে আসতে পারে। তাই আমাদের এখন শিক্ষকতার হিসাব নতুন করে করতে হবে। কতজন শিক্ষক আছেন, তার পাশাপাশি কতজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর চিন্তার পরিসর বাড়াচ্ছেন, কতজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন, কতজন ভয়কে কৌতূহলে রূপান্তর করছেন, কতজন দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন এবং কতজন শিক্ষক প্রতিদিন নিজের শিক্ষকতাকে পুনর্বিবেচনা করছেন, সেই হিসাবও জরুরি। কারণ একটি বিদ্যালয় ভবন তৈরি করতে পারে, একটি পাঠ্যক্রম শিক্ষার কাঠামো দিতে পারে, একটি পরীক্ষা ফলাফল প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু একজন গুণী শিক্ষকই পারেন একটি মানুষের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে। আর এখানেই শেষ প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেক শিক্ষকের সামনে দাঁড়ায়। আগামীকাল যখন আমরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করব, তখন কি শুধু একটি অধ্যায় শেষ করব, নাকি একজন শিক্ষার্থীর মনে নতুন একটি জানালা খুলব? আমরা কি শুধু উত্তর দেব, নাকি প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করব? আমরা কি শুধু ভালো ফল চাইব, নাকি ভালো মানুষও তৈরি করব? কারণ একজন শিক্ষক তখনই গুণী হয়ে ওঠেন, যখন তার পাঠ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীর শেখা শেষ হয় না। বরং শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীর মনে যে প্রশ্নটি জেগে থাকে, যে সাহসটি জন্ম নেয়, যে কৌতূহলটি তাকে আবার বই খুলতে বাধ্য করে, যে মানবিকতা তাকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে শেখায়, সেখানেই গুণী শিক্ষকতার প্রকৃত বিজয়। শিক্ষক পড়িয়ে চলে যান, কিন্তু গুণী শিক্ষক চলে গিয়েও শিক্ষার্থীর ভেতরে পড়াতে থাকেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ।
মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার, দৈনিক শিক্ষাডটকম


৩
৩ মন্তব্য