সহযোগী অধ্যাপক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫: কারণ ও ফলাফল | Partition of Bengal 1905
📌 বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫: কারণ ও ফলাফল দেখুন
📌 এক ক্লিকে বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫: কারণ ও ফলাফল দেখুন
📌 বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫: কারণ ও ফলাফল বিস্তারিত পড়ুন
বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫: কারণ ও ফলাফল | Partition of Bengal 1905
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলাকে দুই ভাগ করলেও এর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির ঐক্য ভেঙে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করা। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে তীব্র গণআন্দোলন, জন্ম নেয় স্বদেশী আন্দোলন, আর শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় বঙ্গভঙ্গ রদ করতে। এসএসসি, এইচএসসি, বিসিএসসহ সব পরীক্ষায় এই টপিক থেকে প্রশ্ন আসে — তাই এখানে বঙ্গভঙ্গের পটভূমি, কারণ, ফলাফল, রদ — সবকিছু একসাথে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বঙ্গভঙ্গ কী? | What was the Partition of Bengal?
বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) বলতে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন কর্তৃক তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সিকে দুটি আলাদা প্রদেশে বিভক্ত করাকে বোঝায়। ১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই এই বিভক্তির ঘোষণা দেওয়া হয় এবং একই বছরের ১৬ অক্টোবর তা কার্যকর হয়। বিভক্তির ফলে সৃষ্টি হয় দুটি প্রদেশ — পশ্চিমবঙ্গ (রাজধানী কলকাতা) এবং পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী ঢাকা)।
বঙ্গভঙ্গের পটভূমি | Background of the Partition
বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বাস্তবতা আর ব্রিটিশদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সি ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এর আয়তন ছিল প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল — প্রায় ফ্রান্সের সমান — আর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ। এই বিশাল প্রদেশের মধ্যে ছিল বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা — এমনকি আসামও একসময় এর অংশ ছিল। পুরো ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা, যা এই প্রদেশেরই অন্তর্গত।
এত বড় একটি প্রদেশ একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে শাসন করা সত্যিই কঠিন ছিল। পূর্ববঙ্গের দূরবর্তী জেলাগুলোতে প্রশাসনিক নজরদারি পৌঁছাত না বললেই চলে। লর্ড কার্জন এই প্রশাসনিক অসুবিধাকেই বঙ্গভঙ্গের প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা ছিল — বাংলা তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। কার্জন এই ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদকে ভয় পেতেন। তাই অনেক ঐতিহাসিকের মতে, প্রশাসনিক যুক্তি ছিল নিছক অজুহাত; আসল লক্ষ্য ছিল বাঙালির ঐক্য ভেঙে দেওয়া।
বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা ও কার্যকর | Announcement and Implementation
তারিখ | ঘটনা |
১৯ জুলাই, ১৯০৫ | ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দেন |
১৬ অক্টোবর, ১৯০৫ | বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়; বাংলা দুটি প্রদেশে বিভক্ত |
১৬ অক্টোবর, ১৯০৫ | সারা বাংলায় শোক দিবস পালন, হরতাল |
ডিসেম্বর, ১৯০৬ | ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠন |
১২ ডিসেম্বর, ১৯১১ | দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা |
ঘোষণার পরপরই সারা বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ১৯০৩ সাল থেকেই বিভক্তির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল, আর ১৯০৫ সালে ঘোষণা আসার সাথে সাথে প্রতিবাদ আন্দোলন দানা বাঁধে।
নতুন দুটি প্রদেশ | The Two New Provinces
বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলা ভাগ হয়ে যে দুটি প্রদেশ হয়, সেগুলো হলো:
বিষয় | পশ্চিমবঙ্গ (Bengal) | পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) |
রাজধানী | কলকাতা (Calcutta) | ঢাকা (Dacca) |
অন্তর্ভুক্ত এলাকা | পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা | পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ), আসাম |
সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় | হিন্দু | মুসলিম |
জনসংখ্যা (প্রায়) | ৫ কোটি ৪০ লাখ | ৩ কোটি ১০ লাখ |
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিভাজন এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে পূর্ববঙ্গ ও আসামে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় আর পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয় — যা ব্রিটিশদের "ভাগ করো ও শাসন করো" (Divide and Rule) নীতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ | Causes of the Partition of Bengal
বঙ্গভঙ্গের কারণগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় — ঘোষিত কারণ (যা ব্রিটিশরা বলেছিল) এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য (যা ঐতিহাসিকরা বিশ্লেষণ করে বের করেছেন)। পরীক্ষায় এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ঘোষিত কারণ: প্রশাসনিক সুবিধা
লর্ড কার্জনের ভাষ্য অনুযায়ী:
১. বিশাল প্রদেশ শাসনে অসুবিধা: বাংলা প্রেসিডেন্সি আয়তন ও জনসংখ্যা — দুই দিক দিয়েই এত বড় ছিল যে একজন শাসকের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভব হচ্ছিল না। পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশাসনিক সেবা পৌঁছাত না।
২. পূর্ববঙ্গের উন্নয়ন: বিভক্তির ফলে পূর্বাঞ্চলে আলাদা প্রশাসন গড়ে উঠবে, ফলে সেখানকার শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়বে। কার্জন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
প্রকৃত উদ্দেশ্য: ভাগ করো ও শাসন করো
ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসা আসল কারণগুলো:
১. বাঙালি জাতীয়তাবাদ দুর্বল করা: বাংলা তখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। কলকাতার শিক্ষিত বাঙালিরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। প্রদেশ ভাগ করে এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে খণ্ডিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
২. হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি: এমনভাবে সীমানা টানা হয় যাতে দুই সম্প্রদায় আলাদা প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। উদ্দেশ্য ছিল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের বদলে বিভেদের বীজ বপন করা — ক্লাসিক "Divide and Rule" কৌশল।
৩. কলকাতার প্রভাব খর্ব করা: কলকাতা ছিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবী আন্দোলনের কেন্দ্র। বাংলা ভাগ হলে কলকাতার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যাবে বলে ব্রিটিশরা আশা করেছিল।
৪. মুসলমানদের সমর্থন আদায়: পূর্ববঙ্গে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ নতুন প্রদেশ গঠন করে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা ছিল। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহসহ অনেক মুসলিম নেতা প্রথমদিকে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিলেন, কারণ এতে মুসলমানদের শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন | Anti-Partition Movement
বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার সাথে সাথে সারা বাংলায় যে প্রতিবাদ ওঠে, তা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছিল।
শোক দিবস ও হরতাল: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, যেদিন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়, সেদিন সারা বাংলায় শোক দিবস পালন করা হয়। কলকাতায় হরতাল হয়, দোকানপাট বন্ধ থাকে, মানুষ উপোস করে প্রতিবাদ জানায়।
রাখীবন্ধন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে ওইদিন হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের হাতে রাখী বেঁধে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতীকী বার্তা দেয়। এই রাখীবন্ধন কর্মসূচি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। এই প্রেক্ষাপটেই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন "আমার সোনার বাংলা" গানটি, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়।
নেতৃত্ব: আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, যাকে "বাংলার মুকুটহীন রাজা" বলা হতো। তাঁর নেতৃত্বে সভা-সমিতি, পত্রপত্রিকায় প্রচারণা — সব মাধ্যমে প্রতিবাদ চলতে থাকে।
স্বদেশী আন্দোলন ও বয়কট | Swadeshi and Boycott Movements
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশী আন্দোলন (Swadeshi Movement, ১৯০৫–১৯০৮)। এর মূল কথা ছিল:
ব্রিটিশ পণ্য বয়কট: বিলেতি কাপড়, চিনি, লবণসহ সব ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। জায়গায় জায়গায় বিলেতি কাপড় পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়।
দেশি শিল্পের প্রসার: দেশীয় কলকারখানা, তাঁতশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। "স্বদেশী" অর্থাৎ নিজের দেশের তৈরি জিনিস ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
জাতীয় শিক্ষা: ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার আন্দোলন শুরু হয়।
এই আন্দোলন শুধু বাংলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি — মহারাষ্ট্রে বাল গঙ্গাধর তিলক, পাঞ্জাবে লালা লাজপত রায়ের নেতৃত্বে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। নরমপন্থী আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি ব্যর্থ হওয়ায় চরমপন্থী নেতৃত্বের উত্থান ঘটে — এটাই পরবর্তী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল | Effects of the Partition of Bengal
বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। নিচে প্রধান ফলাফলগুলো আলোচনা করা হলো:
১. স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম: বঙ্গভঙ্গের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে নতুন মাত্রা দেয়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও আত্মনির্ভরতার চেতনা ছড়িয়ে পড়ে।
২. হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি: ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য অনেকাংশে সফল হয় — বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ বাড়ে। কোথাও কোথাও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দেয়।
৩. মুসলিম লীগের গঠন (১৯০৬): বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
৪. ঢাকার উন্নতি: পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হওয়ায় ঢাকায় নতুন অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ঢাকার নগরায়ণ ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে — যা আজকের ঢাকার ভিত্তি।
৫. চরমপন্থী রাজনীতির উত্থান: নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদন ব্যর্থ হওয়ায় বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায় ("লাল-বাল-পাল")-এর মতো চরমপন্থী নেতাদের প্রভাব বাড়ে।
৬. বাঙালি ঐক্যের প্রতীকী জাগরণ: উল্টোদিকে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ আন্দোলন (যেমন রাখীবন্ধন) বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন চেতনা জাগায়।
৭. ব্রিটিশ নীতির মুখোশ উন্মোচন: "প্রশাসনিক সুবিধা"র আড়ালে ভাগ করো ও শাসন করো নীতি জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, ফলে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদ ১৯১১ | Annulment of the Partition
টানা ছয় বছরের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দিল্লি দরবারে (Delhi Durbar) সম্রাট পঞ্চম জর্জের উপস্থিতিতে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। একই সাথে ঘোষণা করা হয়:
বাংলা আবার একত্রিত হবে
ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হবে
বিহার ও উড়িষ্যাকে আলাদা প্রদেশ করা হবে
বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এর ক্ষত শুকায়নি — এই ছয় বছরে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে যে চিড় ধরেছিল, তা আর পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের বীজ এই বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই নিহিত ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ | Key Personalities
ব্যক্তি | ভূমিকা |
লর্ড কার্জন | তৎকালীন ভাইসরয়; ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দেন |
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি | বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতা |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | রাখীবন্ধনের আহ্বান; "আমার সোনার বাংলা" রচনা |
নবাব সলিমুল্লাহ | ঢাকার নবাব; প্রথমে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন, পরে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনে নেতৃত্ব |
লর্ড হার্ডিঞ্জ | তৎকালীন ভাইসরয়; ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা |
বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায় | চরমপন্থী নেতা; স্বদেশী আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে দেন |
পরীক্ষার জন্য একনজরে | Quick Revision for Exams
বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা: ১৯ জুলাই, ১৯০৫ (লর্ড কার্জন)
বঙ্গভঙ্গ কার্যকর: ১৬ অক্টোবর, ১৯০৫
নতুন প্রদেশ দুটি: পশ্চিমবঙ্গ (রাজধানী কলকাতা) ও পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী ঢাকা)
ঘোষিত কারণ: প্রশাসনিক সুবিধা; প্রকৃত উদ্দেশ্য: ভাগ করো ও শাসন করো
১৬ অক্টোবর ১৯০৫ পালিত হয়: শোক দিবস
রাখীবন্ধনের আহ্বান দেন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বদেশী আন্দোলনের সময়কাল: ১৯০৫–১৯০৮
মুসলিম লীগ গঠন: ডিসেম্বর ১৯০৬, ঢাকা
বঙ্গভঙ্গ রদ: ১২ ডিসেম্বর, ১৯১১ (দিল্লি দরবার, লর্ড হার্ডিঞ্জ)
রদের সময় রাজধানী: কলকাতা থেকে দিল্লি স্থানান্তর
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন | FAQs
১. বঙ্গভঙ্গ কবে ঘোষণা করা হয়?
১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দেন।
২. বঙ্গভঙ্গ কবে কার্যকর হয়?
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়।
৩. বঙ্গভঙ্গের ঘোষিত কারণ কী ছিল?
প্রশাসনিক সুবিধা — কার্জনের দাবি ছিল, বিশাল বাংলা প্রেসিডেন্সি একজন শাসকের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভব হচ্ছে না।
৪. বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
বাঙালির ঐক্য ভেঙে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করা — অর্থাৎ "ভাগ করো ও শাসন করো" নীতি।
৫. বঙ্গভঙ্গের ফলে কোন দুটি প্রদেশ হয়?
পশ্চিমবঙ্গ (রাজধানী কলকাতা) এবং পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী ঢাকা)।
৬. স্বদেশী আন্দোলন কী?
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালে শুরু হওয়া আন্দোলন — ব্রিটিশ পণ্য বয়কট ও দেশি পণ্য ব্যবহারের ডাক দেওয়া হয়।
৭. রাখীবন্ধন কর্মসূচি কী ছিল?
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের হাতে রাখী বেঁধে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের বার্তা দেয়।
৮. মুসলিম লীগ কবে গঠিত হয়?
১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
৯. বঙ্গভঙ্গ কবে রদ হয়?
১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে লর্ড হার্ডিঞ্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন।
১০. বঙ্গভঙ্গ রদের সময় আর কী ঘোষণা করা হয়?
ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা দেওয়া হয়।
উপসংহার
বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশ শাসকদের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল — প্রশাসনিক সুবিধার মোড়কে যার আসল লক্ষ্য ছিল বাঙালির ঐক্য ধ্বংস করা। কিন্তু ইতিহাসের বিচিত্র পরিহাসে এই বিভাজনই জন্ম দিল স্বদেশী আন্দোলনের মতো শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী জাগরণের। ছয় বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও, এই ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রেখা টেনে দিয়েছিল, তার প্রভাব দীর্ঘদিন অনুভূত হয়েছে। পরীক্ষার জন্য তো বটেই, বাঙালি হিসেবে নিজেদের ইতিহাস জানার জন্যও বঙ্গভঙ্গের এই অধ্যায়টি প্রত্যেকের পড়া উচিত।
৩
৩ মন্তব্য